পর্যটনের নামে আমরা যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করছি!

সুন্দরবনে পর্যটকেরাছবি: মারুফ হাসান

বনভোজন শব্দটির সঙ্গে আমরা ছোটবেলা থেকে পরিচিত এবং জীবনের কোনো না কোনো পরীক্ষায় আমাদের সবার ‘বনভোজন’ রচনাটি পড়তে বা লিখতে হয়েছে। রচনাটিই যেন আমাদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বনে গিয়েছি, সেখানে রান্না করেছি, উচ্চস্বরে গান বাজিয়েছি কিংবা খেলাধুলা করেছি, ময়লা-আবর্জনা জঙ্গলে ফেলে আবার হৈ-হুল্লোড় করতে করতে বাড়ি ফিরেছি। এরপর দু-এক দিন ছুটিও নিয়েছি, কারণ এই একদিনের ধকল থেকে অসুস্থ হয়ে পড়া এবং সেরে উঠতে সময় লেগেছে।

এই সমস্যার দায় আমি সাধারণ মানুষকে দেব না। সমস্যাটি হলো, আমরা কখনো দেখিনি বা কারও কাছ থেকে শিখিনি যে, কীভাবে প্রকৃতির মাঝে তার ভাষা বুঝে প্রশান্তি নিতে হয় বা তার সৌন্দর্য কীভাবে উপভোগ করতে হয়। বরং আমরা শিখেছি, কীভাবে প্রকৃতির বুকে কংক্রিটের স্তূপ বানিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে হয়।

অনেকে জিজ্ঞেস করতে পারে, মানুষ কেন জঙ্গলের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাংলো তৈরি করে? কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরে কেন এসিসমৃদ্ধ হাউসবোট ভাসে? অথবা হাওরের হাউসবোটের ওপর কেন মিনি সুইমিংপুল থাকে? যে চিপস বা ঝালমুড়ি আমরা প্রতিদিনই বাসার কাছে পাই, সেগুলোই কেন আমাকে জঙ্গলে বা হাওরে ঘুরতে ঘুরতে খেতে হবে? কারণ, আমরা এমন এক আবহে বড় হয়েছি, যেখানে কখনো শেখানো হয় না যে প্রকৃতি একটি জীবন্ত সত্তা। এজন্যই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাওয়ার কথা শুনলে আমরা মুখ চেপে হাসি বা মানসম্মানের কথা চিন্তা করি। প্রাকৃতিক প্রশান্তির কথা চিন্তা করি না। প্রকৃতিরও নিজস্ব এক ভাষা আছে। কিন্তু সে ভাষা না বুঝে আমরা আমাদের ভাষায় প্রকৃতিকে সাজাতে চাই। তাই ফলাফল আশানুরূপ হয় না। কারণ প্রকৃতির গতিময়তা এক চলমান প্রক্রিয়া।

আরও পড়ুন
পরিবেশবান্ধব পর্যটন বা ইকোট্যুরিজম হলো এমন এক ধরনের ভ্রমণ ব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নেও অবদান রাখে।

বর্তমানে পর্যটন বাংলাদেশের জন্য এক চমৎকার সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এ দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সম্পদ লাভ করেছে। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে উপকূল, কক্সবাজার, প্রবাল ও সামুদ্রিক সম্পদে বেষ্টিত সেন্ট মার্টিন, দক্ষিণের খাল-বিল-বাঁওড়, উত্তরের নদী অববাহিকা, সিলেটের ঝরনা-ঝিরি-হাওর আর দেশজুড়ে থাকা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এদেশে সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। সৌন্দর্যের রূপবৈচিত্র্যে কেউ কারও চেয়ে কম নয়।

সুন্দরবন
প্রথম আলোর ফাইল ছবি

কিন্তু আমরা এ দেশের মানুষেরা ক্ষণিকের ব্যবসায়িক চিন্তা বা স্বল্প সময়ের আনন্দ লাভের জন্য এদের রক্ষা করার কথা কি একটুও ভাবছি? পরিবেশবান্ধব পর্যটন বা ইকোট্যুরিজম হলো এমন এক ধরনের ভ্রমণ ব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নেও অবদান রাখে। পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মূল উদ্দেশ্য প্রকৃতির ক্ষতি না করে পর্যটন পরিচালনা করা, যাতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর সুফল ভোগ করতে পারে।

এর মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বনভূমি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত হয়। এই পর্যটনের কয়েকটি প্রধান অংশ হলো, প্রকৃতি সংরক্ষণভিত্তিক পর্যটন। যেমন, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা পাহাড়-সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন। আর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন মানে যেখানে স্থানীয় মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প পরিচিতি পায়। আবার সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটনে স্থানীয় মানুষ সরাসরি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।

অতএব, পরিবেশবান্ধব পর্যটন টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) ও জীববৈচিত্র্য সনদের (CBD) বাস্তবায়নে একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আরও পড়ুন
জীববৈচিত্র্য সনদের (CBD) তিনটি মূল উদ্দেশ্য হলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, এর উপাদানগুলোর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জীবসম্পদের ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত সুবিধার ন্যায্য ও ন্যায়সংগত বণ্টন।

SDGs-এর প্রেক্ষাপটে ইকোট্যুরিজম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দারিদ্র্য হ্রাস (SDG 1) এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির (SDG 8) পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার (SDG 12), জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা (SDG 13), সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ (SDG 14) এবং স্থলভাগের জীববৈচিত্র্য রক্ষার (SDG 15) সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এই লক্ষ্যগুলো অর্জনে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

অন্যদিকে, জীববৈচিত্র্য সনদের (CBD) তিনটি মূল উদ্দেশ্য হলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, এর উপাদানগুলোর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জীবসম্পদের ব্যবহার থেকে প্রাপ্ত সুবিধার ন্যায্য ও ন্যায়সংগত বণ্টন।

পরিবেশবান্ধব পর্যটন এসব উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক, কারণ এটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ
ছবি: লেখক

ফলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শুধু বিনোদন নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব, যদি তা প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন সুন্দরবন, সিলেটের হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি, কক্সবাজার ও মহেশখালীর সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ এবং নদী অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ইকোট্যুরিজমের জন্য অপরিসীম সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এই প্রাকৃতিক এলাকাগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার, পানি ও মাটি দূষণ, প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি এবং অন্যান্য পরিবেশগত চাপ রোধ করা যায়।

আরও পড়ুন
পর্যটনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের গুণগত মান এতটাই নষ্ট হচ্ছে যে, ওই আবাসস্থলকে নির্ভর করে বেঁচে থাকা বন্যপ্রাণীরা স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে কথা বলা যায়।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা স্বল্পকালীন মুনাফা, ভোগবিলাস এবং সিন্ডিকেটগুলোর খপ্পরে পড়ে এক অসুস্থ পর্যটনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এতে প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র দূষক পদার্থ দ্বারা ক্রমাগত দূষিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ এই এলাকাগুলোতে বর্তমানে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এর আগে, বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতা অভিযানে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র থেকেও উদ্ধার হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্য। এগুলো আমাদের পর্যটনসহ পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত। বিশেষ করে জলাভূমিকেন্দ্রিক পর্যটন এলাকাগুলোতে এই দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে।

পাশাপাশি শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, মাটিদূষণ ও পানিদূষণ আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে এক নাজুক অবস্থার দিকে পতিত হচ্ছে।

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে ওই এলাকায় প্লাস্টিকসহ অন্যান্য দূষণের মাধ্যমে মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর মতো ক্ষতিকর পদার্থ অনুপ্রবেশ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। আর পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিপন্ন হচ্ছে। আমরা অনেক বিপন্ন প্রজাতিকে হারিয়ে ফেলছি।

পর্যটনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের গুণগত মান এতটাই নষ্ট হচ্ছে যে, ওই আবাসস্থলকে নির্ভর করে বেঁচে থাকা বন্যপ্রাণীরা স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে কথা বলা যায়। অতিরিক্ত পর্যটনের চাপে অনেক বন্যপ্রাণী ওই এলাকা ছেড়েছে বা বিপন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ছড়াগুলোর প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, এবং সেগুলোকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা বিরল প্রাণীরা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। মানুষের অসচেতনতায় প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসও বদলে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
পৃথিবীর অনেক দেশ, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও ইকোট্যুরিজমে সফলতা দেখিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো কোস্টারিকা।
ছুটির সময়ে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকেরা ভিড় করেছিলেন।
ছবি: প্রথম আলো

অনেকে ইচ্ছে করে বনের প্রাণীদের খাবার দেয়। ফলে তারা কৃত্রিম খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কিছু বিশেষ দিনে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় হয়। ফলে দূষণের মাত্রার পাশাপাশি জনভোগান্তিও বাড়ে। আর এই উচ্চচাপ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে উদাসীন থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় ও ঢাকাকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক প্রভাব এই পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার ফলে স্থানীয়রা এর সুফল থেকে অনেক দূরে থেকে যাচ্ছে। তাদের আর্থসামাজিক অবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবেশের ক্ষতির কারণে স্থানগুলো যেমন সৌন্দর্য হারাচ্ছে, তেমনি সিন্ডিকেট সৃষ্ট সমস্যায় পর্যটকরাও হারাচ্ছেন আগ্রহ।

পৃথিবীর অনেক দেশ, এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও ইকোট্যুরিজমে সফলতা দেখিয়েছে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো কোস্টারিকা। সেখানে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূমি সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান হিসেবে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। ভুটান ‘উচ্চ মূল্য, নিম্ন প্রভাব’ নীতির মাধ্যমে সীমিত পর্যটকের প্রবেশ নিশ্চিত করে এবং পর্যটন ফি বাবদ সংগৃহীত অর্থ বন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে ব্যবহার করে। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্টসংখ্যক পর্যটককে অনুমতি দেওয়া হয় এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয় গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। নরওয়ের ফিয়র্ডগুলোতে দূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক ফেরি ও কার্বনমুক্ত ভ্রমণ চালু করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কেনিয়ার মাসাইমারা অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বেশ কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা প্রকৃতি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত।

আরও পড়ুন
নেপালের অন্নপূর্ণা সংরক্ষণ এলাকা ইকোট্যুরিজমের আরেকটি সফল উদাহরণ। সেখানে ট্রেকিং পর্যটন থেকে পাওয়া অর্থ স্থানীয় জনগণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন শুধু প্রকৃতি রক্ষায় নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভারতের কেরালা রাজ্যে ‘Responsible Tourism’ কর্মসূচি স্থানীয় জনগণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে। পাশাপাশি তারা সংরক্ষিত এলাকাগুলো বিশেষভাবে সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া শ্রীলঙ্কার সিগিরিয়া ও ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে উঠেছে।

নেপালের অন্নপূর্ণা সংরক্ষণ এলাকা ইকোট্যুরিজমের আরেকটি সফল উদাহরণ। সেখানে ট্রেকিং পর্যটন থেকে পাওয়া অর্থ স্থানীয় জনগণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন শুধু প্রকৃতি রক্ষায় নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সবার আগে প্রয়োজন এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যে শুধু বর্তমান প্রজন্মের অধিকার তা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেররও অধিকার রয়েছে। তাই বর্তমান প্রজন্ম প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করার অধিকার রাখে না। এজন্য সঠিক পরিকল্পনামাফিক প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে জীববৈচিত্র্য ও এর আবাসস্থলের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। সাধারণ মানুষকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনে যুক্ত করতে হবে।

বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ জনগণ যেন এই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিকল্পনা থেকে সুফল পায়। স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথাও এখানে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় রাখতে হবে। মানুষকে পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর দিক এবং এর ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন সম্ভব নয়, এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষ যেন মানসিকভাবেও প্রশান্তি পায়, পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে দ্বীপটিকে টেকসই পর্যটনের জন্য রক্ষার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বনের হাজারো পাখির গান, বনের সবুজ, বন্যপ্রাণী, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভিন্নতা আর বিশুদ্ধ বাতাস যে মানুষের মনকে প্রশান্তির ছোঁয়া দিয়ে সজীব ও সতেজ করে তুলতে পারে, এই বিষয়গুলো মানুষকে উপলব্ধি করাতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় সাধারণ মানুষ যে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে পারে এবং নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এই বিষয়গুলোর ওপর নজর দিতে হবে বিশেষভাবে। সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে তারা যেন পরিবেশ বিনষ্টকারী না হয় এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে দূরে থাকে, এই বিষয়টি নজরদারির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে বহিরাগত ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য হ্রাস করা জরুরি।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ হয় এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অসংখ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন উপকূলে জেলেদের মাছ ধরার নৌকা
ফাইল ছবি

সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে দ্বীপটিকে টেকসই পর্যটনের জন্য রক্ষার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য ইকো-গাইডিং, পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প ও মৎস্যচাষের মতো বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনঃস্থাপন, কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে পর্যটন বাড়লেও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না হয়।

তুরস্ক ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতায় টেকসই বন ব্যবস্থাপনা, ইকোট্যুরিজম সম্প্রসারণ ও সবুজ অবকাঠামো উন্নয়ন বিষয়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুইডেন সরকারের সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র পরিকল্পনা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
কমিউনিটি-বেজড ট্যুরিজম (CBT) এবং হোম-স্টে ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যটকরা স্থানীয় জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, লোকসংগীত, উৎসব ও হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো পর্যটনকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে স্থানীয় জনগণ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। কিন্তু পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে। স্থানীয় জনগণকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করলে তারা বিকল্প আয়ের সুযোগ পাবে এবং প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরও দায়বদ্ধ হবে।

কমিউনিটি-বেজড ট্যুরিজম (CBT) এবং হোম-স্টে ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যটকরা স্থানীয় জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, লোকসংগীত, উৎসব ও হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট এবং পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের সময় পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারের পক্ষ থেকে নীতি ও আইন প্রণয়ন, পর্যটন প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে।

এভাবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন চালু করা সম্ভব। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা যাবে।

লেখক: বন্যপ্রাণী পরিবেশবিদ, গবেষক ও লেখক

আরও পড়ুন