ফুল ফোটার পেছনের বিজ্ঞান

পৃথিবীতে ফুলের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। ফুল ফোটে বলেই আমরা বেঁচে আছি। ফুল না হলে ফল হতো না, ফল না হলে হতো না বীজ। কী খেয়ে আমরা বাঁচতাম! সুন্দর সুন্দর ফুল নিয়ে আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা কত না সাহিত্য রচনা করেছেন। প্রিয়জনের জন্য একটি গোলাপের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার আর হতে পারে না! প্রাচীনকাল থেকেই ফুল আমাদের মুগ্ধ করে আসছে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর মুগ্ধতা হলো ফুল ফোটা। কী করে একটি গাছের ডগা বা পাতার কোলে একটি কুঁড়ি জন্ম নেয়, কুঁড়িগুলো বিকশিত হয়ে পাপড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে? ফুল ফোটার পেছনের বিজ্ঞান হলো জেনেটিকস, হরমোন ও পরিবেশগত কারণগুলোর একটি চমৎকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া।

ফুল ফোটার আণবিক প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরিবেশগত গুরুত্ব পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি প্রকৃতির এক জটিলতা ও সৌন্দর্যের বাস্তব প্রমাণ। এসব রহস্য উন্মোচন করা সাধারণ মানুষ, বিজ্ঞানী বা পরিবেশবিদদের জন্য বেশ কঠিন।

চেরি ফুল নিয়ে জাপানের লোকেরা রীতিমতো প্রতিবছর উৎসবে মাতে
ছবি: সুটকেস অ্যান্ড স্নিকার্স

ধরুন, আপনি একজন মালি, বিজ্ঞানী অথবা কেবলই ফুলের ভক্ত; যে-ই হোন না কেন, একটি ফুল দেখে ও তার সুগন্ধ নিয়ে আপনি চমৎকৃত হবেন না, তা হতেই পারে না। ফুল ফোটার পেছনের বিজ্ঞান বুঝতে পারলে এই অসাধারণ জীবগুলোর প্রতি আপনার উপলব্ধি আরও গভীর হবে, উদ্ভিদের প্রতি বিস্ময়ের শেষ থাকবে না।

চেরি ফুল নিয়ে জাপানের লোকেরা রীতিমতো প্রতিবছর উৎসবে মাতে। শীতে যে গাছে একটা পাতাও ছিল না, সে গাছে হঠাৎ বসন্ত আসতে না-আসতেই এত ফুল কোথা থেকে এল? গোলকধাঁধা ফুলটির কথা একবার ভাবুন তো। কদিন আগেও যেখান দিয়ে হেঁটে গিয়েছেন, সেখানে কোনো গাছ ছিল না, ফুল তো নয়ই। হঠাৎ সে পথে যেতে যেতে একদিন দেখলেন, একটা সবুজ মোটা লাঠির মতো ডাঁটির মাথায় ফুটবলের মতো গোল হয়ে একটা ফুল ফুটে রয়েছে। গাছ নেই, পাতা নেই—শুধু শত শত লাল কদম ফোয়ারার মতো ফুটে রয়েছে।

আরও পড়ুন
আমাদের দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আলু গাছ লাগিয়ে কৃত্রিম আলো জ্বেলে শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেখেছেন, আলু গাছে ফুল ফোটে ও ফল ধরে।

আবার কিছু ফুল শুধু রাতেই ফোটে, ভোর হতেই ঝরে যায়। তাই নিশাচর পতঙ্গ ছাড়া আপনার হয়তো সেসব ফুল দেখার সৌভাগ্য হয় না। কিছু ফুল দৈনিক সময়ের চক্র অনুসরণ করে ফোটে ও বন্ধ হয়। উদাহরণস্বরূপ, মর্নিং গ্লোরি ভোরে ফোটে ও সন্ধ্যায় বন্ধ হয়, সন্ধ্যামালতী সন্ধেবেলায় ফোটে, শিউলি ফোটে রাতে আবার ভোরে ঝরে যায়। আহা, কত না বিস্ময় লুকিয়ে আছে প্রস্ফুটিত একটা ফুলের ভেতর!

শিউলি ফুল রাতে ফোটে আবার ভোরে ঝরে যায়
ছবি: অ্যামাজন ডট ইন

গাছে ফুল কেন ফোটে, বিজ্ঞানীরা ত্রিশের দশক থেকে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণ মতে, দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সাড়া দিয়েই ফুল ফোটে। আমাদের দেশে শীতকালে দিনের সময় থাকে কম। এ জন্য আলুর ফুল ফোটে না। কিন্তু ইউরোপে মাঝেমধ্যে দিনের দৈর্ঘ্য বেশি থাকায় সেখানে আলুর ফুল ফোটে। আবার সেই ফুল থেকে ফল ও বীজও হয় এবং বীজ থেকে হয় আলুর চারা! আমাদের দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আলু গাছ লাগিয়ে কৃত্রিম আলো জ্বেলে শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেখেছেন, আলু গাছে ফুল ফোটে ও ফল ধরে। সেই ফল থেকে প্রকৃত আলু-বীজও উৎপন্ন হয়। সেসব বীজ মাটিতে লাগিয়ে আলুর চাষ করা যায়। কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন হলো, ফুল কেন ফোটে? এর পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান কারণ—হরমোন, জিন ও পরিবেশ।

আরও পড়ুন
সাধারণ মতে, দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সাড়া দিয়েই ফুল ফোটে। আমাদের দেশে শীতকালে দিনের সময় থাকে কম। এ জন্য আলুর ফুল ফোটে না।

একদল রুশ বিজ্ঞানী লক্ষ করেছেন, পাতা থেকে একটি রহস্যময় বস্তু বিটপ বা ডগায় যায়। সেই বস্তুর কারণেই সেখানে প্রথমে কুঁড়ির উদ্ভব হয়। সেই কুঁড়িই পরে ফুল হয়ে ফোটে। সেই রহস্যময় বস্তুটি হলো ফ্লোরিজেন হরমোন। কিন্তু কেন গাছের একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে ফুল ফোটে, যা একেক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়? বেশিরভাগ ফুল ফোটে ডালের আগায় বা পাতার কাছে। কিন্তু নাগলিঙ্গম ফুলের দিকে তাকিয়ে দেখুন, গাছের গুঁড়ির থেকে কেমন থোকা ধরে ফুল ফুটছে! বৈশাখের দিনে রমনা উদ্যানে গেলে এ দৃশ্য বিরল নয়। এ প্রসঙ্গে সুইডিশ ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক উভ নিলসন বলেছেন, ‘আমরা এর পেছনে দায়ী একটি জিন খুঁজে পেয়েছি, যার নাম এফটি। এই জিন পাতায় সক্রিয় হয় এবং এর কার্যকারিতা দিনের দৈর্ঘ্যের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। দিনের আলোর সংকেত পেলেই এই জিন উদ্দীপিত হয়ে ওঠে এবং তা পাতা থেকে ডগার শীর্ষে স্থানান্তরিত হয়।’

গাছের গুঁড়ির থেকে থোকা ধরে নাগলিঙ্গম ফুল ফোটে
ছবি: অ্যামাজন ডট ইন

কীভাবে এই জিন সক্রিয় হওয়ার পর কুঁড়ি গঠন করে, তা নিয়ে তাঁরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফুল ফোটার সময় ও প্রক্রিয়া জিনের একটি নেটওয়ার্কের সাহয্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। ফুল ফোটার সঙ্গে জড়িত মূল জিনগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ফ্লাওয়ারিং লোকাস টি জিন: এটি ফ্লোরিজেন প্রোটিন তৈরি করে, যা ফুল ফোটার জন্য অপরিহার্য।

কনস্ট্যান্স জিন: আলো ও আলোক-সময়ের প্রতিক্রিয়ায় এটি এফটিয়ের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে।

লিফি জিন: এটি ফুলের বিকাশের একটি প্রধান নিয়ন্ত্রক, যা উদ্ভিদের সাধারণ বৃদ্ধি থেকে ফুল ফোটার দিকে রূপান্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক উভ নিলসন বলেছেন, ‘আমরা এর পেছনে দায়ী একটি জিন খুঁজে পেয়েছি, যার নাম এফটি। এই জিন পাতায় সক্রিয় হয় এবং এর কার্যকারিতা দিনের দৈর্ঘ্যের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হয়।'

গবেষকেরা দেখেছেন, এসব জিন কিছু প্রোটিন উৎপাদনে সহায়তা করে। ভবিষ্যতে গাছের কোন অংশে কুঁড়ি বের হবে ও ফুল ফুটবে, সেই অংশে থাকা প্রোটিনগুলোর সঙ্গে জিন উৎপাদিত এসব প্রোটিনের যোগাযোগ ঘটে এবং সঠিক সময়ে সঠিক স্থানেই ফুলটি ফোটে। তবে বিজ্ঞানীরা এ-ও বলেছেন, ফুল ফোটার ক্ষেত্রে শুধু জিন বা প্রোটিন নয় দায়ী নয়, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও মাটির অবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। আমরা সবাই জানি, কদম ফুল ফোটে আষাঢ়ে, শিউলি ফোটে শরতে। কিন্তু বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন হেমন্তেও কোনো কোনো গাছে কদম ফুটছে। শরৎ বাদে হেমন্তেও ফুটছে শিউলি ফুল। ইউরোপে বসন্তকালে দিনের আলো বেশিক্ষণ থাকায় সেখানে ড্যাফোডিল ফোটে, কিন্তু গোলাপ ফোটার জন্য অপেক্ষা করতে হয় গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত।

ইউরোপে বসন্তকালে দিনের আলো বেশিক্ষণ থাকায় সেখানে ড্যাফোডিল ফোটে
ছবি: আর্ট মারিপল

ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থও ঠিক ভেবে পাননি, যে ড্যাফোডিলের রূপে তিনি এত মুগ্ধ, সেই ফুলগুলো ফোটার পেছনের রহস্যটা কী! আধুনিক অনেক জাতের ধানের এখন ফুল ফোটার জন্য কোনো মৌসুমের অপেক্ষা করা লাগে না। কিন্তু দেশি আমন ধানের ফুল ফোটে শরতে, ধান পাকে হেমন্তে। বছরের যে সময়েই সেসব জাতের ধান লাগানো হোক না কেন, তার ফুল শরতেই ফুটবে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, ফুল কখন ফুটবে, তা আসলে নির্ধারণ করে এপিটালা-১ নামে একটি জিন। এই জিন অন্য জিনদের আদেশ করে, তারা যেন ডগায় আর কোনো পাতা উৎপাদনের সংকেত না পাঠায়। তখন এই আদেশ পেয়ে সহস্রাধিক জিন পাতা উৎপাদন বন্ধ করে ফুলের প্রজননাঙ্গ গঠনের কাজে লেগে পড়ে।

আরও পড়ুন
আমরা সবাই জানি, কদম ফুল ফোটে আষাঢ়ে, শিউলি ফোটে শরতে। কিন্তু বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন হেমন্তেও কোনো কোনো গাছে কদম ফুটছে। শরৎ বাদে হেমন্তেও ফুটছে শিউলি ফুল।

ফুল ফোটার এসব জৈবিক ক্রিয়াকলাপ ছাড়াও রয়েছে আরেক ধরনের পদার্থবিজ্ঞান। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডের একদল পদার্থবিদ গবেষক তাঁদের এক গবেষণাপত্রে ফুল ফোটার ফিজিকস তুলে ধরেছেন। এশিয়াটিক লিলি ফুলের ওপর তাঁরা গবেষণা করেছেন। তাঁরা খেয়াল করেছেন, তরুণ কুঁড়ি থেকে একটি এশিয়াটিক লিলি ফুল ফুটতে প্রায় সাড়ে চার দিন সময় লাগে। এ সময়ে কুঁড়ি ধীরে ধীরে পানি শোষণ করে, বড় হয় এবং ফুল ফোটার জন্য তৈরি হয়। এই পানি বৃত্তি ও পাপড়ির গোড়ায় গিয়ে চাপ দেয়। এর প্রভাবে বৃত্তি ও পাপড়ি বাইরের দিকে মেলতে শুরু করে। সে সময় বৃত্তি ও পাপড়ির ওপরের প্রান্তে থাকা কোষগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলো বড় হতে শুরু করে এবং ছড়ানোর জায়গা খুঁজতে থাকে। এটিও ফুল ফোটার একটি কারণ হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।

তরুণ কুঁড়ি থেকে একটি এশিয়াটিক লিলি ফুল ফুটতে প্রায় সাড়ে চার দিন সময় লাগে
ছবি: ড্রিমটাইম ডট কম

আবার পানির প্রবাহ ও চাপ কমে গেলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ধানের ফুল ফোটার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে দেখা যায়। সকালে পানির চাপে মাত্র ঘণ্টা খানেকের জন্য ধানের ফুলের বড় তুষ ও ছোট তুষখণ্ড ফাঁকা হয়ে যায় এবং ভেতরের প্রজননাঙ্গগুলো তুষের বাইরে বেরিয়ে পড়ে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে পরাগায়ন সম্পন্ন হলেই তুষ আবার চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পানিপ্রবাহের চাপেই এ ঘটনা ঘটে।

আরও পড়ুন
তরুণ কুঁড়ি থেকে একটি এশিয়াটিক লিলি ফুল ফুটতে প্রায় সাড়ে চার দিন সময় লাগে। এ সময়ে কুঁড়ি ধীরে ধীরে পানি শোষণ করে, বড় হয় এবং ফুল ফোটার জন্য তৈরি হয়।

ফুল কখন ফোটে, তার ওপর নির্ভর করে ফুলের রং। সাধারণত সাদা ও সুগন্ধযুক্ত ফুলগুলো ফোটে রাতে, রঙিন ও গন্ধহীন ফুল ফোটে দিনে। এর পেছনেও রয়েছে বিজ্ঞান। কিন্তু গাছে ফুল ফোটার দরকার কী? না ফুটলে কী হবে? ফুল না ফুটলে ফল হবে না, ফল না হলে বীজ হবে না। বীজ না হলে ওসব গাছের বংশরক্ষা হবে না। মানুষের মতো গাছেরাও চায় তার বংশ বা সন্তান রেখে যেতে। ফল উৎপাদনের জন্য দরকার পরাগায়ন, যা করে মৌমাছির মতো অনেক পতঙ্গ। পতঙ্গরা আবার দুরকমের, নিশাচর ও দিবাচর। নিশাচর পতঙ্গরা রাতে কোথায় কোন ফুল ফুটে আছে, তা সাধারণত ভালো করে দেখতে পারে না। তাই ওদের ফুলে ফুলে বিচরণ তত সহজ হয় না। ফলে গাছেরা ঠিক করেছে, রাতে ওরা সাদা ফুল ফোটাবে, যাতে নিশাচর পতঙ্গরা দেখতে পায়।

ফল উৎপাদনের জন্য দরকার পরাগায়ন, যা করে মৌমাছির মতো অনেক পতঙ্গ
ছবি: শাটারস্টোক

আর সুগন্ধ দিয়ে সেসব ফুলের উপস্থিতি জানান দেয়, যাতে পতঙ্গরা বুঝতে পারে কোথায় ফুলগুলো আছে। দিনে এসব সমস্যা নেই, তাই সুগন্ধ দিয়ে পতঙ্গদের আকর্ষণ করতে হয় না। ফুলের রঙেই দিবাচর পতঙ্গরা আকর্ষিত হয় ও পরাগায়ন ঘটায়। তবে এখনো গবেষণার ফলাফলে পুরোপুরি স্পষ্ট নয় যে ঠিক কী কী কারণে ফুল ফোটে। এ সত্যিই এক জটিল ও রহস্যময় প্রক্রিয়া।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন