শৈশবের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কি দীর্ঘায়ুর কোনো সম্পর্ক আছে
শৈশবের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের আয়ুর কি কোনো সম্পর্ক আছে? যেসব শিশু ছোটবেলায় বেশ বুদ্ধিমান বা চটপটে থাকে, তারা কি অন্যদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে? শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও, বিজ্ঞান কিন্তু ঠিক এই কথাই বলছে। চার লাখের বেশি মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের দীর্ঘায়ু হওয়ার সরাসরি ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এসব শিশুর শেষ বয়সে গিয়ে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অসুখে ভোগার আশঙ্কাও অনেক কম থাকে।
কিন্তু এমনটা কেন হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনস্তত্ত্ববিদ ও মস্তিষ্ক গবেষকদের বছরের পর বছর বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের একদল গবেষক এই রহস্যের সমাধানে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এই গবেষণার মূল ভিত্তি বুঝতে হলে আপনাকে ফিরে যেতে হবে একটু অতীতে। ১৯৩২ এবং ১৯৪৭ সালে স্কটল্যান্ডে স্কটিশ মেন্টাল সার্ভে নামে দুটি ঐতিহাসিক জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই জরিপগুলো রীতিমতো কিংবদন্তি হয়ে আছে। কারণ, ওই সময়ে স্কটল্যান্ডের প্রায় প্রত্যেক ১১ বছর বয়সী শিশুর বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করা হয়েছিল! সেই জরিপগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ বা পরবর্তী জীবনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করেই গবেষকেরা প্রথম এই অদ্ভুত সম্পর্কের খোঁজ পান। তাঁরা দেখেন, শৈশবে পরীক্ষায় যারা বেশি নম্বর পেয়েছিল, তারাই জীবনে বেশি দিন বেঁচেছে।
১৯৩২ এবং ১৯৪৭ সালে স্কটল্যান্ডে স্কটিশ মেন্টাল সার্ভে নামে দুটি ঐতিহাসিক জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই জরিপগুলো রীতিমতো কিংবদন্তি হয়ে আছে।
এই রহস্যের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছেন মনোবিজ্ঞান গবেষক ডেভিড হিল। তিনি বিষয়টিতে একটি দারুণ জেনেটিক ব্যাখ্যা যোগ করেছেন। এই কাজের জন্য তিনি চাইল্ডহুড ইন্টেলিজেন্স কনসোর্টিয়াম থেকে পাওয়া প্রায় ১২ হাজার শিশুর জিনগত তথ্য ব্যবহার করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই শিশুদের অনেকেই সেই আদি স্কটিশ জরিপে অংশ নেওয়া মানুষদের বংশধর।
এর পাশাপাশি তিনি ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্যও ব্যবহার করেছেন। যেহেতু বায়োব্যাংকের অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই এখনো জীবিত এবং তাঁদের চূড়ান্ত আয়ু জানা সম্ভব নয়, তাই ডেভিড হিল তাঁদের বাবা-মায়ের আয়ুকে দীর্ঘায়ুর জিনগত পরিমাপক হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি ছোটবেলার আইকিউ এবং মানুষের আয়ুর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট জিনগত যোগসূত্র খুঁজে পান। গবেষক ডেভিড হিল এই বিষয়ে বলেন, ‘উচ্চ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে জড়িত জিনের ভেরিয়েন্ট মূলত দীর্ঘায়ু হওয়ার ভেরিয়েন্টগুলোর মতোই।’ অর্থাৎ, যে জিনগুলো আপনাকে বুদ্ধিমান করে তুলছে, সেগুলোই আপনাকে বেশি দিন বাঁচতে সাহায্য করছে।
বায়োব্যাংকের অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই এখনো জীবিত এবং তাঁদের চূড়ান্ত আয়ু জানা সম্ভব নয়, তাই ডেভিড হিল তাঁদের বাবা-মায়ের আয়ুকে দীর্ঘায়ুর জিনগত পরিমাপক হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন।
বুদ্ধিমানরা কেন বেশি দিন বাঁচে
এই প্রক্রিয়ার পেছনের আসল কারণ কী? বিজ্ঞানীদের কাছে এর দুটি প্রধান তত্ত্ব আছে। প্রথম ব্যাখ্যাটি হলো পরিবেশগত। ছোটবেলায় যাদের জ্ঞানের ক্ষমতা ভালো থাকে, তারা সাধারণত উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি পায়। আর উচ্চশিক্ষা মানুষকে এমন এক পরিবেশে নিয়ে যায়, যেখানে ভালো স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার এবং উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ অনেক বেশি থাকে। ফলে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি দিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি জিনগত। বিজ্ঞানীদের মতে, যে জিনগুলো একটি শিশুর মস্তিষ্ককে প্রখর ও বুদ্ধিমান করে তোলে, সেই একই জিনগুলো তার শরীর এবং মস্তিষ্ককে ভেতর থেকে অনেক বেশি মজবুত করে গড়ে তোলে। ফলে তাদের শরীর বিভিন্ন রোগব্যাধি বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনেক ভালোভাবে লড়াই করতে পারে।
বুদ্ধিমান শিশুদের আরেকটি বড় গুণ হলো, তারা যেকোনো কিছু খুব দ্রুত শিখতে পারে। এর পেছনের কারণ কী? বিজ্ঞান বলছে, এই শিশুরা তাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যকার সংযোগ খুব সহজেই শক্তিশালী করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, যে জিনগুলো একটি শিশুর মস্তিষ্ককে প্রখর ও বুদ্ধিমান করে তোলে, সেই একই জিনগুলো তার শরীর এবং মস্তিষ্ককে ভেতর থেকে অনেক বেশি মজবুত করে গড়ে তোলে।
আপনি যখন নতুন কোনো কিছু শেখেন বা চর্চা করেন, তখন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত যোগাযোগ তৈরি হয়। নতুন শেখা জ্ঞান চর্চা করার সময় মস্তিষ্কের একটি স্নায়ুকোষ বেশি করে নিউরোট্রান্সমিটার নামে রাসায়নিক পদার্থ জমা করতে উদ্দীপ্ত হয়। একই সময়ে অন্য স্নায়ুকোষটি এই রাসায়নিক গ্রহণ করার জন্য আরও বেশি রিসেপ্টর তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ার ফলে স্নায়ুর সংকেতগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। আর সংকেত যত শক্তিশালী হবে, নতুন শেখা জ্ঞান মনে রাখা তত সহজ হবে।
ডেভিড হিল এবং তাঁর গবেষক দল এখন সেই নির্দিষ্ট জিনগুলোকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন, যেগুলো বুদ্ধিমত্তা ও দীর্ঘায়ুর জন্য সরাসরি দায়ী। এই গবেষণার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো, যাদের জিনে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি রয়েছে, ভবিষ্যতে তাদের সাহায্য করা। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞান আমাদের এমন কোনো উপায় বাতলে দেবে, যার মাধ্যমে মানুষের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সময়টা আরও বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।