মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে

মস্তিষ্কের আলাদা অংশগুলো মিলে কীভাবে একটি একক মন তৈরি করে?ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে দারুণ সব তথ্য দিয়েছে। আমরা জানি, মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা অংশ মনোযোগ, স্মৃতি, ভাষা বা চিন্তাভাবনার মতো আলাদা কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা এতদিন এই নির্দিষ্ট অংশগুলো নিয়ে আলাদাভাবেই গবেষণা করেছেন। কিন্তু একটা বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা, মস্তিষ্কের এই আলাদা অংশগুলো মিলে কীভাবে একটি একক মন তৈরি করে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নটর ডেমের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যারন বার্বে বলছেন, ‘মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোনো নেটওয়ার্ক কী কাজ করে, তা স্নায়ুবিজ্ঞান সফলভাবে বের করেছে। কিন্তু এই আলাদা নেটওয়ার্কগুলো মিলে কীভাবে একটা একক এবং সুসংগঠিত মন তৈরি করে, তা ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞান এখনো বেশ পিছিয়ে।’

আরও পড়ুন
মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা অংশ মনোযোগ, স্মৃতি, ভাষা বা চিন্তাভাবনার মতো আলাদা কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।

সাধারণ বুদ্ধিমত্তা কী

মনোবিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই জানেন, মনোযোগ, স্মৃতি বা ভাষার মতো বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এগুলো মিলে তৈরি করে আমাদের সাধারণ বুদ্ধিমত্তা। এই বুদ্ধিমত্তার জোরেই আমরা পড়াশোনা, পেশাজীবন বা দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার সমাধান করি। কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা কতটা দ্রুত শিখতে পারি বা মানিয়ে নিতে পারি, তা ঠিক করে দেয় এই বুদ্ধিমত্তা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন, আমাদের বুদ্ধিমত্তার মূলে নিশ্চয়ই একটা একতা আছে। কিন্তু কেন এই একতা তৈরি হয়, তার কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এত দিন ছিল না।

মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও প্যারাইটাল কর্টেক্স
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

অধ্যাপক অ্যারন বার্বে বললেন, ‘বুদ্ধিমত্তার সমস্যাটা মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে থাকার বিষয় নয়। এতদিন বিজ্ঞানীরা শুধু খুঁজতেন বুদ্ধিমত্তার উৎপত্তিস্থল কোথায়! বিশেষ করে ফ্রন্টাল বা প্যারাইটাল কর্টেক্সে তারা উত্তর খুঁজতেন। কিন্তু আসল প্রশ্নটা ‘কোথায়’ নয়, আসল প্রশ্ন হলো ‘কীভাবে’! কীভাবে মস্তিষ্কের এই ছড়ানো-ছিটানো নেটওয়ার্কগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং মিলেমিশে তথ্য প্রসেস করে?’

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বার্বে এবং তাঁর দলের প্রধান গবেষক র‍্যামজি উইলকক্স নেটওয়ার্ক নিউরোসায়েন্স থিওরি নামে একটি তত্ত্বের পরীক্ষা শুরু করেন। সম্প্রতি তাঁদের এই গবেষণাপত্রটি বিখ্যাত নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁরা হিউম্যান কানেকটোম প্রজেক্টের ৮৩১ জন এবং ইনসাইট স্টাডি প্রজেক্টের ১৪৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের ধরন নিয়ে বিশাল এক গবেষণা চালান।

আরও পড়ুন
বুদ্ধিমত্তার জোরেই আমরা পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার সমাধান করি। কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা কতটা দ্রুত শিখতে পারি বা মানিয়ে নিতে পারি, তা ঠিক করে দেয় এই বুদ্ধিমত্তা।

গবেষকেরা বলছেন, সাধারণ বুদ্ধিমত্তা কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা বা কৌশল নয়। এটি নির্ভর করে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারে তার ওপর। এই গবেষণায় ৪টি দারুণ বিষয় উঠে এসেছে।

১. দলগত কাজ: বুদ্ধিমত্তা মস্তিষ্কের কোনো এক জায়গায় আটকে নেই। এটি অনেকগুলো নেটওয়ার্কের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে কাজের ভাগবাঁটোয়ারা করে দেয় এবং প্রয়োজনের সময় সেগুলো এক করে, বুদ্ধিমত্তা তার ওপরই নির্ভর করে।

২. যোগাযোগের শর্টকাট: এই ছড়ানো-ছিটানো কাজগুলো সামলাতে মস্তিষ্কের ভেতরে যোগাযোগের একটা দারুণ ব্যবস্থা থাকতে হয়। মস্তিষ্কের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোকে যুক্ত করার জন্য এর ভেতরে অসংখ্য শর্টকাট পথ থাকে। এই পথগুলো দিয়ে নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে খুব দ্রুত তথ্যের আদান-প্রদান হয়।

মস্তিষ্কের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোকে যুক্ত করার জন্য এর ভেতরে অসংখ্য শর্টকাট পথ থাকে
ছবি: গেটি ইমেজ

৩. নিয়ন্ত্রক: তথ্যগুলো মস্তিষ্কের কোন দিক দিয়ে কীভাবে যাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু হাব থাকে। এরা অনেকটা অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো কাজ করে। কোনো একটা সমস্যা সমাধান করতে বা নতুন কিছু শিখতে ঠিক কোন নেটওয়ার্কগুলোকে কাজে লাগাতে হবে, এরা সেই সিদ্ধান্ত নেয়।

৪. নিখুঁত ভারসাম্য: সাধারণ বুদ্ধিমত্তা তখনই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যখন মস্তিষ্কের কাছাকাছি অঞ্চলগুলো নিজেদের মধ্যে খুব ভালো যোগাযোগ রাখে। আবার একই সঙ্গে খুব কম সময়ে দূরের অঞ্চলগুলোর সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন
বুদ্ধিমত্তা মস্তিষ্কের কোনো এক জায়গায় আটকে নেই। এটি অনেকগুলো নেটওয়ার্কের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে কাজের ভাগবাঁটোয়ারা করে দেয়।

এই গবেষণার ফলাফল শুধু মানুষের জন্যই নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুনিয়াতেও দারুণ প্রভাব ফেলবে। অনেক এআই সিস্টেম নির্দিষ্ট কোনো কাজে ভীষণ দক্ষ হলেও, নতুন বা ভিন্ন কোনো পরিস্থিতিতে তারা মানুষের মতো খাপ খাওয়াতে পারে না। মানুষের বুদ্ধিমত্তার মূল পরিচয়ই হলো এই নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি। আর এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের এই অনন্য গঠনের জন্যই।

মানুষের মতো এআই তৈরি করতে এটির গঠনও মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল নেটওয়ার্কভিত্তিক হতে হবে
ছবি: হ্যারিসবার্গ ইউনিভার্সিটি

মানুষের সাধারণ বুদ্ধিমত্তা যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট মেকানিজম থেকে না এসে পুরো মস্তিষ্কের সিস্টেম থেকে আসে, তবে এআইয়ের ক্ষেত্রেও কেবল নির্দিষ্ট ডেটা বাড়িয়ে লাভ হবে না। বরং মানুষের মতো আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স তৈরি করতে হলে এআইয়ের গঠনও মানুষের মস্তিষ্কের মতো সুসংগঠিত এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক হতে হবে।

আমাদের শৈশবে কীভাবে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেন তা কমতে থাকে, কিংবা মস্তিষ্কে আঘাত লাগলে কেন আমাদের স্মৃতিশক্তি এলোমেলো হয়ে যায়, তার সবকিছুরই উত্তর লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কের এই দুর্দান্ত নেটওয়ার্ক সিস্টেমের ভেতরে!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চ

সূত্র: নেচার কমিউনিকেশনস জার্নাল ও ফিউচারিটি ডটকম

আরও পড়ুন