পুষ্টিগুণে ভরপুর কয়েকটি দেশি ফল
ফল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ফল কোনটি? আসলে নির্দিষ্ট একটি ফলকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর বলা একটু কঠিনই বটে। কারণ, প্রতিটি ফলেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা।
প্রতিদিন একটি আপেল খেলে ডাক্তারের দরকার হয় না—প্রবাদটি নিশ্চয়ই শুনেছেন। চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফল অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু এবং সহজলভ্য খাদ্য। তাই দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় ফল থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি রকমের ফল পাওয়া যায়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যে কোনটা রেখে কোনটা খাবেন, তা নিয়ে ভাবা স্বাভাবিক।
তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বিভিন্ন রঙের ফল খাওয়া। কারণ, ফলের রং অনুযায়ী এর পুষ্টিগুণও ভিন্ন হয়। লাল, হলুদ, সবুজ বা বেগুনি; প্রতিটি রঙের ফল আমাদের শরীরে আলাদা আলাদা ধরনের উপকারী উপাদান সরবরাহ করে। আজকের এই লেখা পুষ্টিগুণে ভরপুর কয়েকটি স্বাস্থ্যকর ফল নিয়ে। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কোন কোন ফল এই তালিকায় স্থান পেল।
চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফল অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু এবং সহজলভ্য খাদ্য। তাই দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় ফল থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১. আপেল
আপেল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলগুলোর একটি এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় ফাইবার রয়েছে আপেলে। ফাইবারগুলোর মধ্যে পেকটিন, হেমিসেলুলোজ ও সেলুলোজ অন্যতম। এই ফাইবারগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, হজমশক্তি ভালো রাখে এবং অন্ত্র ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। আপেল ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। পাশাপাশি এতে থাকে পলিফেনল। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং নানা রোগের বিরুদ্ধে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
নিয়মিত আপেল খেলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ঝুঁকি কমতে পারে। তবে আপেলের বেশিরভাগ পলিফেনল থাকে খোসার ঠিক নিচের অংশে। তাই সর্বোচ্চ উপকার পেতে খোসাসহ আপেল খাওয়াই ভালো।
২. ব্লুবেরি
ব্লুবেরি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক গুণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এতে থাকে প্রচুর অ্যান্থোসায়ানিন, যা মূলত একটি উদ্ভিজ্জ রঞ্জক ও ফ্ল্যাভোনয়েড। এই অ্যান্থোসায়ানিনই ব্লুবেরির নীলচে-বেগুনি রঙের জন্য দায়ী। এই উপাদানটি শরীরের কোষে ক্ষতি করতে পারে এমন ফ্রি র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্থোসায়ানিনসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, কিছু ক্যানসার এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি কমতে পারে। প্রায় ৪ লাখ অংশগ্রহণকারী নিয়ে করা একটি বড় গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন মাত্র ১৭ গ্রাম অ্যান্থোসায়ানিনসমৃদ্ধ বেরি খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অ্যান্থোসায়ানিনসমৃদ্ধ অন্যান্য বেরিজাতীয় ফলের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকবেরি, বিলবেরি, এল্ডারবেরি, চেরি ও চোকবেরি।
আপেল ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস। পাশাপাশি এতে থাকে পলিফেনল। এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং নানা রোগের বিরুদ্ধে শরীরকে সুরক্ষা দেয়।
৩. কলা
কলা শুধু পটাশিয়ামের চাহিদা মেটাতেই বেশি উপকারী, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। পটাশিয়ামের দৈনিক চাহিদার প্রায় ৭ শতাংশ পূরণ করার পাশাপাশি কলায় আরও থাকে ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন সি এবং ম্যাগনেসিয়াম। এ ছাড়া কলায় পলিফেনল ও ফাইটোস্টেরলের মতো বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কলায় আরও আছে প্রিবায়োটিক ফাইবার, যা অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। সবুজ বা আধা পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ এবং পেকটিন নামে ফাইবার বেশি থাকে। এতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে পাকা কলা সহজে হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেটের ভালো উৎস। তাই যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁদের ব্যায়ামের আগে দ্রুত শক্তি পেতে পাকা কলা চমৎকার বিকল্প হতে পারে।
৪. কমলা
কমলা ভিটামিন সি-এর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মাঝারি আকারের কমলা আমাদের দৈনিক ভিটামিন সি-এর চাহিদার প্রায় ৯১ শতাংশ পূরণ করতে পারে। এ ছাড়া কমলায় রয়েছে পটাশিয়াম, ফলেট, থায়ামিন বা ভিটামিন বি-১, ফাইবার এবং উদ্ভিজ্জ পলিফেনল, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, আস্ত কমলা খেলে শরীরের প্রদাহ, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা কমতে পারে।
শতভাগ কমলার রসে অনেক ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকলেও এতে সাধারণত খাদ্য-আঁশ বা ফাইবার কম থাকে। শাঁসযুক্ত রসেও আঁশের পরিমাণ খুব বেশি বাড়ে না। তাই সম্ভব হলে রসের বদলে আস্ত কমলাই বেশি খাওয়ার চেষ্টা করুন। আর যদি রস খেতেই হয়, তবে প্রতিবারে এক কাপ বা প্রায় ২৩৫ মিলিলিটারের মধ্যে পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখাই ভালো।
সবুজ বা আধা পাকা কলায় রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ এবং পেকটিন নামে ফাইবার বেশি থাকে। এতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে। অন্যদিকে পাকা কলা সহজে হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেটের ভালো উৎস।
৫. ড্রাগন ফল
ড্রাগন ফল পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি ফল। এতে আছে প্রচুর আঁশ, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ভিটামিন সি ও ই। এ ছাড়া এটি লাইকোপিন ও বিটা-ক্যারোটিনের মতো ক্যারোটিনয়েডের চমৎকার উৎস। এগুলো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতিতে শত শত বছর ধরে ড্রাগন ফলকে স্বাস্থ্যরক্ষাকারী ফল হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি পশ্চিমা দেশগুলোতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
৬. আম
ফলের রাজা আম। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। আম পটাশিয়াম, ফলেট, ফাইবার এবং ভিটামিন এ, সি, বি-৬, ই ও কে-এর চমৎকার উৎস। এ ছাড়া আমে প্রচুর উদ্ভিজ্জ পলিফেনল থাকে, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে। বিশেষ করে আমে ম্যাঞ্জিফেরিন নামে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক হতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, আলঝেইমারস, পারকিনসনস ও কয়েক ধরনের ক্যানসার থেকে রক্ষা পেতে আমের এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশ কার্যকর। এ ছাড়া আমে থাকা আঁশ নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে এবং পরিপাকতন্ত্র সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
আম পটাশিয়াম, ফলেট, ফাইবার এবং ভিটামিন এ, সি, বি-৬, ই ও কে-এর চমৎকার উৎস। এ ছাড়া আমে প্রচুর উদ্ভিজ্জ পলিফেনল থাকে, যার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক গুণ রয়েছে।
৭. অ্যাভোকাডো
অন্যান্য ফলের তুলনায় অ্যাভোকাডো একটু ভিন্নধর্মী। এতে প্রাকৃতিক চিনি কম, কিন্তু স্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি। অ্যাভোকাডোতে প্রধানত ওলেইক অ্যাসিড নামে একধরনের মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। এতে আরও আছে পটাশিয়াম, আঁশ, ভিটামিন বি-৬, ফলেট, ভিটামিন ই ও কে। লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামে দুই ধরনের ক্যারোটিনয়েড অ্যাভোকাডোতে পাওয়া যায় এটা চোখের জন্য বেশ উপকারী। ২০২০ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ৫ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন একটি করে অ্যাভোকাডো খেয়েছেন, তাঁদের কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং রক্তে লুটেইনের মাত্রা বেড়েছে।
ওজনের হিসাবে অ্যাভোকাডো অন্যান্য ফলের তুলনায় একটু বেশি ক্যালরিযুক্ত। তবে গবেষণা বলছে, এতে থাকা উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যকর চর্বি ও ফাইবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে। তাই অ্যাভোকাডো ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
৮. আনারস
আনারস অন্যতম জনপ্রিয় এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল। প্রতি ১৬৫ গ্রাম আনারস আমাদের ভিটামিন সি-এর দৈনিক চাহিদার প্রায় ৮৮ ভাগ এবং ম্যাঙ্গানিজের প্রায় ৭০ ভাগ পূরণ করে। আনারস ম্যাঙ্গানিজের বিপাকক্রিয়া ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। আনারসে বিভিন্ন পলিফেনলিক যৌগও রয়েছে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক বৈশিষ্ট্য আছে। এ ছাড়া আনারসে ব্রোমেলাইন নামে একটি এনজাইম থাকে, যা মাংস নরম করতে ব্যবহৃত হয়। অনেকেই মনে করেন, আনারসের এই এনজাইম হজমে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো চলমান।
২০২০ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ৫ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন একটি করে অ্যাভোকাডো খেয়েছেন, তাঁদের কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং রক্তে লুটেইনের মাত্রা বেড়েছে।
৯. স্ট্রবেরি
স্ট্রবেরি অনেকেরই প্রিয় ফল। স্বাদে চমৎকার ও অত্যন্ত পুষ্টিকর এই ফলটি ভিটামিন সি, ফলেট এবং ম্যাঙ্গানিজের ভালো উৎস। স্ট্রবেরিতে প্রচুর উদ্ভিজ্জ পলিফেনল রয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক অ্যাসিড, লিগন্যান ও ট্যানিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্ট্রবেরিতে পাওয়া যায়। স্ট্রবেরিতে অ্যান্থোসায়ানিন, এলাজিট্যানিন ও প্রো-অ্যান্থোসায়ানিডিনের পরিমাণ বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্ট্রবেরির গ্লাইসেমিক সূচক কম। অর্থাৎ এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়িয়ে দেয় না, যা শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
১০. জলপাই
জলপাই ভিটামিন ই, কপার এবং ওলেইক অ্যাসিডের চমৎকার উৎস। ওলেইক অ্যাসিড একধরনের মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। জলপাইতে ওলিউরোপেইন, হাইড্রক্সিটাইরোসোল ও কুয়েরসেটিনের মতো উদ্ভিজ্জ পলিফেনল আছে। এই যৌগগুলো প্রদাহনাশক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। জলপাই ও জলপাইয়ের তেল মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট বা ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কগনিটিভ ডিক্লাইন, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে।