স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখ জ্বলে? জানুন বাঁচার উপায়
অনেকের দিন শুরু হয় ফোনের অ্যালার্ম বন্ধ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। এরপর সারা দিন ল্যাপটপে কাজ কিংবা পড়াশোনা। আর কাজের ফাঁকে বা দিন শেষে একটু জিরিয়ে নেওয়ার নামে আমরা কী করি? আবার সেই ফোনের স্ক্রিনে আজাইরা স্ক্রলিং করি! ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও রিলসের চক্করে কখন যে ঘণ্টা পার হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না।
কিন্তু সমস্যাটা টের পাওয়া যায় কিছুক্ষণ পর। চোখ কচলাতে কচলাতে মনে হয়, চোখের ভেতর যেন কেউ একমুঠো বালু ছিটিয়ে দিয়েছে। চোখ জ্বলে, পানি পড়ে, মাথাটা ধরে আসে। আমরা সবাই কমবেশি এই যন্ত্রণার ভুক্তভোগী। বড়রা হয়তো মাঝেমধ্যে বলেন, প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকালে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু আমরা ভাবি, ধুর! এসব তো মুরুব্বিদের মান্ধাতা আমলের পরামর্শ।
কিন্তু বিজ্ঞান কী বলছে? সত্যিই কি এর কোনো ভিত্তি আছে? নাকি পুরোটাই কুসংস্কার? চলুন, আজ একটু বিজ্ঞান দিয়ে বিষয়টার ময়নাতদন্ত করা যাক।
স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫ বার চোখের পলক ফেলে। চোখের পলক ফেলাটা অনেকটা গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের মতো। এটা চোখকে ভিজিয়ে রাখে, পরিষ্কার রাখে।
কেন চোখ ব্যথা করে
আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, আমি তো জাস্ট তাকিয়ে আছি, কোনো ভারী কাজ তো করছি না। তাহলে চোখ ব্যথা করবে কেন? কিন্তু আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজি একটা মজার তথ্য দিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫ বার চোখের পলক ফেলে। চোখের পলক ফেলাটা অনেকটা গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের মতো। এটা চোখকে ভিজিয়ে রাখে, পরিষ্কার রাখে। কিন্তু যখন আমরা গভীর মনোযোগে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি—হোক সেটা পড়ার জন্য বা গেম খেলার জন্য—তখন আমাদের পলক ফেলার হার নেমে আসে প্রায় অর্ধেকে! অর্থাৎ, মিনিটে হয়তো ৫-৭ বার পলক ফেলছি।
ফলে কী হয়? চোখের ওপরের আস্তরণ শুকিয়ে যায়। শুরু হয় খচখচানি। ভারতের অরবিন্দ আই হসপিটালের গবেষক কিরণদীপ কৌর ২০২২ সালে প্রায় ৩০টি গবেষণাপত্র ঘেঁটে একটি রিভিউ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি এই সমস্যার নাম দিয়েছেন ডিজিটাল আই স্ট্রেইন।
শুধু পলক কম ফেলা নয়, আরও কিছু ভিলেন আছে এখানে। যেমন, স্ক্রিনের লেখা ও ব্যাকগ্রাউন্ডের কন্ট্রাস্ট। মানে আলো-ছায়ার পার্থক্য। স্ক্রিনের গ্লেয়ার বা তীব্র আলো। ভুল দূরত্বে বা ভুল কোণে বসে স্ক্রিন দেখা। ঘরের আলো কম থাকা। কুঁজো হয়ে বসার ভঙ্গি।
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কারণে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং মাথাব্যথা হতে পারে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন, এতে চোখের চিরস্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় কি না। তবে সাময়িক যে কষ্টটা হয়, সেটা একদম বাস্তব।
যখন আমরা গভীর মনোযোগে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি হোক সেটা পড়ার জন্য বা গেম খেলার জন্য, তখন আমাদের পলক ফেলার হার অর্ধেকে নেমে আসে! অর্থাৎ, মিনিটে হয়তো ৫-৭ বার পলক ফেলছি।
তাহলে উপায়? গবেষকেরা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি একটি চমৎকার এবং পরীক্ষিত সমাধানের কথা বলেন। এটাকে বলা হয় ২০-২০-২০ রুল। নিয়মটা খুব সহজ। প্রতি ২০ মিনিট পর পর কাজ থামান। অন্তত ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকান। তাকিয়ে থাকুন অন্তত ২০ সেকেন্ড।
কেন এই নিয়ম জরুরি? ২০ ফুট দূরে তাকালে আমাদের চোখের ফোকাসিং মাসল বা পেশিগুলো রিল্যাক্স করার সুযোগ পায়। আর ২০ সেকেন্ড সময়টা চোখের পলক ফেলার হার স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। এটা অনেকটা চোখের জন্য টিফিনের ছুটির মতো।
গবেষক কিরণদীপ কৌরের মতে, শুধু এই নিয়ম মানলেই হবে না, আরও কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। দিনে স্ক্রিন টাইম ৪ ঘণ্টার মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। জানি, এটা সবার জন্য প্রায় অসম্ভব, তবুও চেষ্টা করতে দোষ কী! অন্ধকার ঘরে ঘাপটি মেরে স্ক্রিন না দেখাই ভালো। ঘরের আলো যেন পর্যাপ্ত থাকে। যারা কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করেন, তাঁরা দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করার সময় চশমা ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
এখন সমস্যা হলো, কাজের বা গেমের মধ্যে ডুব দিলে ২০ মিনিট পর পর ব্রেক নেওয়ার কথা কার মনে থাকে? মনে থাকার কথাও না। এই সমস্যার সমাধানেও আছে প্রযুক্তি।
২০ ফুট দূরে তাকালে আমাদের চোখের ফোকাসিং মাসল বা পেশিগুলো রিল্যাক্স করার সুযোগ পায়। আর ২০ সেকেন্ড সময়টা চোখের পলক ফেলার হার স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
আপনার কম্পিউটারের জন্য একটা দারুণ সফটওয়্যার আছে, নাম স্ট্রেচলি। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং ওপেন সোর্স। উইন্ডোজ, ম্যাক বা লিনাক্স কম্পিউটারেও চলে। এই সফটওয়্যারটি আপনার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কাজ করবে। আপনি যেভাবে সেট করে দেবেন, ঠিক সেই সময় পর পর সে আপনাকে মনে করিয়ে দেবে—‘অনেক হয়েছে, এবার একটু জানালার দিকে তাকান!’
এর সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এর ফ্লেক্সিবিলিটি। আপনি কতক্ষণ পর পর ব্রেক চান এবং কতক্ষণের ব্রেক চান, সব নিজের মতো সেট করতে পারবেন। যারা কাজের চাপে দুনিয়া ভুলে যান, তাদের জন্য এটি মাস্ট-হ্যাভ টুল।
তাই এরপর কখনো চোখ জ্বালা করলে স্ক্রিনকে দোষ না দিয়ে নিজের অভ্যাসের দিকে মনোযোগ দিন। চোখ দুটি আপনার অমূল্য সম্পদ, এদের একটু বিশ্রাম দিন। ২০ মিনিট পর পর জানালার বাইরের আকাশ বা দূরের গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, পৃথিবীটা কিন্তু স্ক্রিনের চেয়েও সুন্দর!