বেশি রাত জাগলে হৃদ্যন্ত্র কি ঝুঁকিতে থাকে
কিছু মানুষের ভোরের পরিবেশ খুব পছন্দ। ঘুম ভাঙার পরপরই তাঁরা কাজের শক্তি পান, মনও থাকে সতেজ। আবার কারও রাত পছন্দ। তাঁরা মনে করেন, রাতে বেশি কাজ করা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশিত একের পর এক গবেষণা বলছে, যাঁদের রাত জাগার স্বভাব আছে, তাঁদের হৃদ্যন্ত্র অন্যদের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
এই ধারণাকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে আরেকটি বড় গবেষণা। গবেষণাটি চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি জার্নাল অব আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত হয়। যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে এই গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণার জন্য ৩৯ থেকে ৭৪ বছর বয়সী ৩ লাখ ২২ হাজারেরও বেশি মানুষকে প্রায় ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল, একজন মানুষ সকালমুখী নাকি রাতমুখী, তার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক কী।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা কখন ঘুমাতে যান এবং কখন ওঠেন, সেই তথ্য জানান। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়—সকালে ওঠেন এমন মানুষ, মাঝামাঝি সময়ের মানুষ এবং রাতজাগা মানুষ। এরপর আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্ধারিত ‘লাইফস এসেনশিয়াল ৮’ স্কোর ব্যবহার করে তাঁদের হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করে। এই স্কোর ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হয়। ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, রক্তে শর্করার মাত্রা, শরীরের ওজন, রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ঘুমের মানের ওপর নির্ভর করে স্কোর দেওয়া হয়। স্কোর যত বেশি, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য তত ভালো বলে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, রাতজাগা মানুষের জীবনযাপনের ধরন অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম স্বাস্থ্যকর। মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় তাদের মধ্যে নিকোটিন গ্রহণের হার বেশি ও ঘুমের মান খারাপ।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় যারা পুরোপুরি রাত জাগে, তাদের হৃদ্যন্ত্রের স্কোর খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা ৭৯ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রায় ১৪ বছরের পর্যবেক্ষণকালে তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকিও ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে যারা পুরোপুরি সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার ঝুঁকি মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় কিছুটা কম দেখা গেছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, রাতজাগা মানুষদের বেশি ঝুঁকির পেছনে আসলে কী দায়ী? এটা কি তাদের জীবনযাপনের ফল, নাকি শরীরের ভেতরের কোনো জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে?
গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাতজাগা মানুষের জীবনযাপনের ধরন অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম স্বাস্থ্যকর। মাঝামাঝি ধরনের মানুষের তুলনায় তাদের মধ্যে নিকোটিন গ্রহণের হার বেশি, ঘুমের মান খারাপ, শারীরিক পরিশ্রম কম এবং খাদ্যাভ্যাসও দুর্বল। বিপরীতে সকালের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা কম এবং খাবারের মান ভালো।
গবেষকেরা যখন এই জীবনযাপনসংক্রান্ত পার্থক্যগুলো হিসাবের মধ্যে আনেন, তখন দেখা যায় রাতজাগা মানুষের বাড়তি ঝুঁকির প্রায় ৭৫ শতাংশই এসব অভ্যাসের কারণে তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে ধূমপানের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। এরপর রয়েছে ঘুম, রক্তে শর্করার উচ্চমাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের ওজনসংক্রান্ত সমস্যা।
গবেষণার প্রধান লেখক সিনা কিয়ানার্সি বলেন, ‘হৃদ্যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বড় ঝুঁকিগুলোর বেশির ভাগই পরিবর্তনযোগ্য। তাই যাঁরা নিজেকে রাতজাগা বলে মনে করেন, তাঁদের এসব মৌলিক বিষয় নিয়ে আরও বেশি সচেতন হওয়া জরুরি।’
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ক্রোনোটাইপের সঙ্গে শত শত জিন জড়িত, যেগুলো শরীরের ২৪ ঘণ্টার সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণ করে।
এর আগের গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, রাতজাগা মানুষরা প্রায়ই সামাজিক জেটল্যাগে ভোগেন। অর্থাৎ তাঁদের শরীরের ভেতরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে প্রতিদিনের কাজকর্মের সময়সূচির মিল থাকে না। ফলে গভীর রাতে খাবার খাওয়া, সকালে নাশতা বাদ দেওয়া, অনিয়মিত ঘুম এবং ক্যাফেইন বা নিকোটিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মতো অভ্যাস তৈরি হয়। এসব অভ্যাস শরীরের ওজন বাড়ায়, রক্তে শর্করার মাত্রা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি করে এবং ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এতে শেষ পর্যন্ত হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তবে রাতজাগা কেবল অভ্যাসের ব্যাপার নয়। এর পেছনে জিনগত কারণও আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ক্রোনোটাইপের সঙ্গে শত শত জিন জড়িত, যেগুলো শরীরের ২৪ ঘণ্টার সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণ করে। রাতজাগা মানুষদের ক্ষেত্রে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন তুলনামূলক দেরিতে বাড়ে এবং সকালে শরীরকে জাগিয়ে তোলার হরমোন কর্টিসলও দেরিতে সক্রিয় হয়।
ফলে শরীরের স্বাভাবিক দিন-রাতের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ, প্রদাহ ও রক্তনালির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। গবেষণায় আরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, নারীদের রাত জাগার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে গবেষকেরা পরিষ্কার করে বলেছেন, রাত জাগলেই কেউ নিশ্চিতভাবে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হবেন না। জীবনযাপনের অভ্যাস ঠিক রাখা, ভালো ও নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।