ভেজা চুলের কারণে কি ঠান্ডা লাগতে পারে

অনেকে বিশ্বাস করেন, শীতে অনেকসময় ধরে চুল ভেজা রাখলে সর্দি-কাশি হয়ফাইল ছবি

শীতের সকালে চুল না শুকিয়ে বাইরে বের হতে গেলেই বড়দের বকুনি শুনতে হয়। আমার দাদি আমার বড় বোনকে সব সময় বলতেন, ‘শীতের মধ্যে ভেজা চুলে বাইরে যেও না, ঠান্ডা লাগবে।’ শুধু আমার দাদি কথাটা বলতেন এমন না। সারা পৃথিবীতেই এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। মানুষ বিশ্বাস করে, শীতে শরীর ভিজে গেলে সর্দি-কাশি হয়। এমনকি এই অসুস্থতাকে আমরা নামই দিয়েছি ‘ঠান্ডা লাগা’।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই প্রচলিত ধারণাটি নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। যেকোনো ডাক্তার আপনাকে বলবেন, সাধারণ সর্দি ভাইরাসের কারণে হয়, কেবল ঠান্ডার জন্য নয়। তাহলে দাদির সেই কথাগুলো কি ভুল? যদি খুব জরুরি প্রয়োজনে চুল না শুকিয়েই ঠান্ডার মধ্যে বাইরে বের হতে হয়, তবে কি সত্যিই সর্দি-কাশি হবে?

গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানি ও আর্জেন্টিনায় শীতকালে মানুষের ঠান্ডা লাগার প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। আবার মালয়েশিয়া বা গাম্বিয়ার মতো উষ্ণ দেশগুলোতে দেখা যায়, বর্ষাকালে সর্দি-কাশি বেশি হচ্ছে। এসব দেখে মনে হতে পারে ঠান্ডা বা ভেজা আবহাওয়াই অসুস্থতার মূল কারণ। কিন্তু এর পেছনে অন্য একটি কারণও থাকতে পারে।

বৃষ্টির দিনে বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় আমরা কেউ বাইরে বের হতে চাই না। তখন দেখা যায় সবাই মিলে ঘরের ভেতরে বা বদ্ধ জায়গায় অনেকটা সময় কাটাই। জানালা-দরজাও বন্ধ থাকে। ফলে ঘরের ভেতরের বাতাসে জীবাণু বেড়ে যায়। তখন কেউ একজন হাঁচি বা কাশি দিলে সেই জীবাণু খুব সহজেই অন্যদের কাছে পৌঁছে যায়। বাইরে থাকার চেয়ে ঘরের ভেতরে মানুষের কাছাকাছি বেশি থাকা হয় বলেই জীবাণু দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ পায়।

আরও পড়ুন
বৃষ্টির দিনে বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঘরের জানালা-দরজাও বন্ধ থাকে। ফলে ঘরের ভেতরের বাতাসে জীবাণু বেড়ে যায়। তখন কেউ হাঁচি বা কাশি দিলে সেই জীবাণু খুব সহজেই অন্যদের কাছে পৌঁছে যায়।

তাহলে শরীর ভিজে গেলে বা ঠান্ডা লাগলে আসলে কী ঘটে? বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে এটি নিয়ে অদ্ভুত এক পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা কিছু মানুষের শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে পরীক্ষা করেছেন। তাঁদের ঠান্ডা লাগার রাইনোভাইরাসের সংস্পর্শে এনেছেন। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল বেশ গোলমেলে। কোনো গবেষণায় দেখা গেছে ঠান্ডা শরীর ভাইরাসের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কোনোটিতে দেখা গেছে ঠান্ডার সঙ্গে সর্দি হওয়ার তেমন সম্পর্ক নেই।

তবে অন্যভাবে করা একটি গবেষণায় বেশ মজার কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমাদের দাদি-নানিদের সেই পুরোনো কথার পেছনে হয়তো কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে। যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমন কোল্ড সেন্টারের পরিচালক রন এক্লেস একটি মজার পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, ঠান্ডা বা ভেজা আবহাওয়ায় কি সর্দি-কাশির ভাইরাস বেশি শক্তিশালী হয়? পরীক্ষার জন্য তিনি কিছু মানুষকে বেছে নেন।

রন এক্লেস তাঁর স্বেচ্ছাসেবকদের দুটি দলে ভাগ করেন। একদল মানুষকে ২০ মিনিটের জন্য ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে বলা হয়। আর অন্য দলটির জুতা-মোজা পরেই খালি বাটিতে পা রেখে বসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম কয়েক দিন দুই দলের মধ্যেই কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। কিন্তু চার-পাঁচ দিন পর দেখা গেল এক অদ্ভুত ঘটনা। যারা ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা অন্য দলের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন
চুল যখন শুকিয়ে যায় বা আমরা উষ্ণ ঘরে ফিরে আসি, তখন রক্তনালিগুলো আবার আগের মতো বড় হয়। শ্বেত রক্তকণিকাগুলোও আবার ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই শুরু করে।

কিন্তু ভেজা পা বা ভেজা চুলের সঙ্গে ঠান্ডা লাগার সম্পর্কটা আসলে কী? বিজ্ঞানীদের একটি ধারণা হলো, আমাদের শরীর যখন বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়, তখন নাক ও গলার রক্তনালিগুলো সরু হয়। এই রক্তনালিগুলোই আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্তকণিকা পৌঁছে দেয়। রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়ার কারণে নাক ও গলায় শ্বেত রক্তকণিকা কম পৌঁছায়।

ফলে কিছু সময়ের জন্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের লড়াই করার শক্তি কমে যায়। চুল যখন শুকিয়ে যায় বা আমরা উষ্ণ ঘরে ফিরে আসি, তখন রক্তনালিগুলো আবার আগের মতো বড় হয়। শ্বেত রক্তকণিকাগুলোও আবার ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই শুরু করে। কিন্তু ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যায়। ততক্ষণে ভাইরাসটি বংশবিস্তার করে ফেলে ও আমাদের শরীরে সর্দি-কাশির লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে।

তাই আমরা যখন বলি ঠান্ডা লেগেছে, তখন কিন্তু ঠান্ডা আবহাওয়া সরাসরি রোগ তৈরি করেনি। বরং সেটি আমাদের নাক বা গলায় আগে থেকেই থাকা কোনো ভাইরাসকে সক্রিয় করে দিয়েছে। তবে এই বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক আছে। কারণ রন এক্লেসের গবেষণায় কেবল মানুষের লক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কোনো মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়নি।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে, দাদির সেই পুরোনো উপদেশের পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। দাদি হয়তো ভাইরাস সম্পর্কে জানতেন না, কিন্তু তাঁর কথা ফলে যেত। ভেজা চুল সরাসরি সর্দি তৈরি না করলেও সর্দি হওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাই আপাতত পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার আগপর্যন্ত বাইরে যাওয়ার আগে চুলটা শুকিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

 

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: ইউনিভার্সিটি হসপিটাল, বিবিসি হেলথ ও মেয়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেম

আরও পড়ুন