বছরের অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। এই ছয় মাসে বিজ্ঞানবিশ্বের নানা শাখায় প্রকাশিত হয়েছে চমৎকার সব বই। মহাবিশ্বের রহস্য থেকে মানুষের চেতনা; সবই উঠে এসেছে সহজ-সরল বর্ণনায়। বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট-এর লিজ এলসের হাত ধরে ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সেরা ৪টি জনপ্রিয় বিজ্ঞান বইয়ের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো।
মাইকেল পোলানকে আধুনিক জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখকদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে ধরা হয়। এর আগে তিনি খাদ্যাভ্যাস ও উদ্ভিদ নিয়ে লিখে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু এবার তিনি হাত দিয়েছেন বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন এবং বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটিতে। সেটি হলো চেতনা।
এই বই লিখতে তাঁর প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছে। সেই দীর্ঘ গবেষণার ছাপ রয়েছে বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে। পোলান দর্শন, স্নায়ুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্প্রতিক গবেষণাকে একসঙ্গে মিলিয়ে মানুষের সচেতনতার প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন।
বইটির শুরুতেই তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন করেন—মানুষ কি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে পারে? মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরনের বৈদ্যুতিক সংকেত কীভাবে ব্যক্তিগত অনুভূতি, আনন্দ, দুঃখ, স্মৃতি কিংবা ভালোবাসার জন্ম দেয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন চেতনার বিখ্যাত কঠিন কিছু সমস্যা নিয়ে। তিনি বইয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব তুলে ধরেছেন। যেমন, গ্লোবাল ওয়ার্কস্পেস থিওরি, হাইয়ার অর্ডার থট থিওরি। তবে তিনি কেবল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেননি, বরং প্রতিটি তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাও আলোচনা করেছেন।
বইটিতে প্রাণীদের চেতনা, শিশুদের চেতনার বিকাশ, ঘুম, স্বপ্ন, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অ্যানেস্থেসিয়া, মেডিটেশন, সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য সচেতনতা নিয়েও বিশদ আলোচনা রয়েছে।
পোলানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ চাপিয়ে দেন না। বরং শেষ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করেন, পাঁচ বছর গবেষণা করার পরও তিনি এই বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি প্রশ্ন নিয়ে বইটি শেষ করেছেন। তাঁর মতে, চেতনা সম্ভবত বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি
একনজরে
আ ওয়ার্ল্ড অ্যাপিয়ার্স
লেখক: মাইকেল পোলান
প্রকাশক: পেঙ্গুইন প্রেস
পৃষ্ঠা: ৩২০
দাম: ৩২ ডলার
প্রথম প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সারাক্ষণের তথ্যপ্রবাহ আমাদের মস্তিষ্ককে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপে ফেলছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কি সত্যিই এই নতুন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানী হান্না ক্রিচলু। তাঁর মতে, মানুষের মস্তিষ্ক এখনও অসাধারণভাবে অভিযোজনক্ষম। লাখ লাখ বছরের পরিবর্তনের ফলে আমরা এমন কিছু মানসিক ক্ষমতা অর্জন করেছি, যা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও আমাদের এগিয়ে রাখবে।
বইটিতে তিনি বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, শেখার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক নমনীয়তা নিয়ে। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন একই ধরনের মানুষের সঙ্গে সব সময় থাকলে চিন্তার জগৎ সংকুচিত হয়ে যায়। ভিন্ন সংস্কৃতি, নতুন মানুষ, নতুন খাবার, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হওয়া মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে।
তিনি শারীরিক চলাফেরাকেও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখিয়েছেন। নিয়মিত হাঁটা, নতুন জায়গায় যাওয়া, মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা; এসব শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কেরও ব্যায়াম।
বইটির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিউরোপ্লাস্টিসিটি। অর্থাৎ নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মস্তিষ্ক নিজেকে কীভাবে বদলে ফেলে, তা নিয়ে। ভবিষ্যতে এআই যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে কল্পনাশক্তি, সহমর্মিতা এবং সৃজনশীলতা। এই বার্তাই পুরো বইয়ে তুলে ধরেছেন লেখক।
একনজরে
দ্য ২১ ফার্স্ট সেঞ্চুরি ব্রেইন
লেখক: হানা ক্রিচলু
প্রকাশক: ট্রান্সওয়ার্ল্ড ডিজিটাল
পৃষ্ঠা: ৪০০
দাম: ২২ ইউরো
প্রথম প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬
২৫০ পৃষ্ঠারও কম জায়গায় কণা পদার্থবিজ্ঞানী সারা আলম মালিক তুলে ধরেছেন মহাবিশ্বের সৃষ্টি, এর ভবিষ্যৎ এবং কোয়ান্টাম জগতের নানা হিসাব। এর ভেতরে তুলে ধরা হয়েছে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের ইতিহাস। লেখক বইটি শুরু করেছেন বিগ ব্যাং দিয়ে। তারপর ধাপে ধাপে দেখিয়েছেন, প্রথম মৌলগুলোর সৃষ্টি, নক্ষত্রের জন্ম, গ্যালাক্সির গঠন, কৃষ্ণগহ্বর, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, কোয়ান্টাম জগত, পৃথিবীর সৃষ্টি, জীবনের উৎপত্তি ও মানুষের আবির্ভাব।
তিনি শুধু মহাবিশ্বের ইতিহাসই বলেননি, ব্যাখ্যা করেছেন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে এসব জানতে শিখেছে। প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, আইনস্টাইন এবং আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার—সবকিছুই অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। মহাবিশ্ব কি অনন্তকাল প্রসারিত হবে, নাকি একসময় সব নক্ষত্র নিভে গিয়ে হিট ডেথ ঘটবে? নাকি অন্য কোনো পরিণতি অপেক্ষা করছে? পাঠক কোনো পূর্বজ্ঞান ছাড়াই বইটি পড়তে পারবেন। জটিল সমীকরণের বদলে লেখক গল্পের মতো করে মহাবিশ্বের বিবর্তন তুলে ধরেছেন।
একনজরে
আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব দ্য ইউনিভার্স
লেখক: সারা আলম মালিক
প্রকাশক: সাইমন অ্যান্ড শাটার
পৃষ্ঠা: ২৫৬
দাম: ২৮ ডলার
প্রথম প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের খবরে আমরা অনেকেই হতাশ। কিন্তু পরিবেশ সাংবাদিক ফ্রেড পিয়ার্স এই বইয়ে আশার আলো খুঁজেছেন প্রকৃতির পুনর্জন্মের ক্ষমতা এবং মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে। তার মতে, একটি ভালো অ্যানথ্রোপোসিন বা মানবযুগ গড়ার সুযোগ এখনো আছে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আশাবাদী হওয়া আজকাল খুব কঠিন। প্রতিদিনই কোথাও দাবানল, কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, কোথাও আবার জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবেশ সাংবাদিকতা করা ফ্রেড পিয়ার্স মনে করেন, সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।
এই বইয়ে তিনি জলবায়ু সংকটকে অস্বীকার করেননি। বরং দেখিয়েছেন, বাস্তব সমস্যাগুলো কতটা গুরুতর। তারপর তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন এখনও আশার কারণ আছে। তাঁর মতে, আশার ভিত্তি দুটি।
প্রথমত, প্রকৃতির নিজের পুনরুদ্ধারের অসাধারণ ক্ষমতা। বন উজাড় হলেও আবার বন জন্মায়। দূষিত নদী পরিষ্কার হতে পারে। বিলুপ্তির মুখে থাকা প্রাণীর সংখ্যাও সঠিক উদ্যোগে আবার বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, মানুষ। মানুষ শুধু নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারে বলেই নয়, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে বলেও তিনি আশাবাদী। বইজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন পুনরুদ্ধার, কৃষির পরিবর্তন, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশনীতি এবং স্থানীয় মানুষের সফল উদ্যোগের অসংখ্য উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
বইয়ের শেষ লাইনে লেখক লিখেছেন, তিনি বাজি ধরতে রাজি যে মানুষ একটি ভালো অ্যানথ্রোপোসিন যুগ গড়ে তুলতে পারবে। তবে নিজের বয়সের কথা উল্লেখ করে মজা করে বলেন, সেই বাজির টাকা নেওয়ার জন্য হয়তো তিনি তখন আর বেঁচে থাকবেন না।
এ কারণেই বইটি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আতঙ্ক নয়, বরং তথ্যভিত্তিক আশাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একনজরে
ডেস্পাইট ইট অল
লেখক: ফ্রেড পিয়ার্স
প্রকাশক: গ্রান্টা বুকস
দাম: ২১.৬৯ ডলার
প্রথম প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬