কল্পবিজ্ঞানের জগৎটা সব সময় নতুন নতুন রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হয়। চলতি বছর জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছে এমন সব বই, যা টাইম ট্রাভেল থেকে শুরু করে মহাজাগতিক রাজনীতি এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। চলুন একনজরে দেখে নিই, জুন মাসের জনপ্রিয় ১৩টি সায়েন্স ফিকশন বই।
পুরস্কারজয়ী লেখক এম. জন হ্যারিসনের এই নতুন বইটি নিয়ে সায়েন্স ফিকশন দুনিয়ায় বেশ শোরগোল পড়ে গেছে। এক রহস্যময় মহাবিপর্যয়ের পর চেনা পৃথিবীটা বদলে গেছে পুরোপুরি। সমুদ্রের পানিতে রাজত্ব করছে অদ্ভুত সব নতুন প্রাণী। এই দুনিয়ায় ফিলিপ নামে এক লোক ইংলিশ চ্যানেলের জোয়ারের তীরে ভেসে আসা অদ্ভুত সব জিনিস কুড়িয়ে জীবন চালায়। একদিন সে পানি থেকে এমন এক জীবন্ত বস্তু খুঁজে পেল, যা প্রতি মুহূর্তে নিজের রূপ বদলাচ্ছে! এটি নিজের কাছে রাখা মানেই মহাবিপদ। চেনা বাস্তবতার সীমানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এক থমথমে রহস্যের গল্প জানতে চাইলে পড়তে পারেন এই বইটি।
টাইম ট্রাভেল বা সময়ভ্রমণের দারুণ এক রোমাঞ্চকর গল্প এটি। এই বইয়ের মূল সুর গড়ে উঠেছে এক বাবা আর ছেলের মধ্যকার ভালোবাসা নিয়ে। গল্পের নায়ক স্কট ট্রেডার একদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আচমকা সময় থেকে পিছলে যান! এক মুহূর্তে তিনি আছেন গাড়ির ভেতর, পরের মুহূর্তেই গাড়ি গায়েব। তিনি আবিষ্কার করলেন একটি দিন পার হয়ে গেছে। প্রতিদিন সকাল ঠিক ৭টা ৫২ মিনিটে তাঁর এই সময়-বিচ্যুতি ঘটতে থাকে এবং প্রতিবার এর সময়কাল দ্বিগুণ হতে থাকে। স্কট চোখের পলকে হারিয়ে যাচ্ছেন সপ্তাহে, বছরে, দশকে। আর তাঁর ছেলে লায়েল মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে হারিয়ে যাওয়া বাবাকে সময়ের চাকা থেকে টেনে ধরতে। ছেলে লায়েল কি পারবে সময়ের অতলে হারিয়ে যাওয়া বাবাকে ফিরিয়ে আনতে? সায়েন্স ফিকশনের মোড়কে এটি মূলত বাবা ও ছেলের ভালোবাসার এক অসাধারণ গল্প।
নেবুলা পুরস্কারজয়ী লেখক ইসাবেল জে. কিমের এই বইটির আইডিয়াটা বেশ অদ্ভুত। এই মহাবিশ্বে আপনি যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে অভিবাসী হয়ে চলে যাবেন, তখন আপনার একটি আসল বা বাস্তব রূপ নিজের দেশেই থেকে যাবে! চাইলে আপনি সেই আদিরূপের সঙ্গে যোগাযোগও রাখতে পারবেন। গল্পের প্রধান চরিত্র রোজ কাং মাত্র ১০ বছর বয়সে দেশ ছেড়ে নিউইয়র্কে চলে আসে এবং নিজের আদিরূপের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তার দাদার মৃত্যুর পর কোরিয়ায় থাকা তার সেই আদিরূপ তাকে হঠাৎ বার্তা পাঠায়—শেষকৃত্যের জন্য তাকে বাড়ি ফিরতেই হবে! শেষ অবধি কী ঘটেছিল, তা জানতে হলে পড়তে পারেন অসাধারণ এই বইটি।
কল্পবিজ্ঞান জগতের অন্যতম ব্যস্ত লেখক আদ্রিয়ান চাইকভস্কি এবার নিয়ে এসেছেন বেশ মজার এক ডিস্টোপিয়ান গল্প। সৌরবিদ্যুতে চলা এক ভবিষ্যৎ পৃথিবী, যেখানে মানুষ চরম বিলাসিতায় বাস করে। আর মানুষের অজান্তেই পর্দার আড়ালে থেকে এই সবুজ শহরগুলোকে সচল রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কিছু উন্নত প্রাণী। এদের নাম লিটল হেল্পার্স। তাদের প্রথম নিয়ম হলো, মানুষকে বিরক্ত করা যাবে না। এই গল্পে আমরা দেখব স্কচ নামে এক ফ্রিল্যান্স র্যাকুন ডিটেকটিভকে, যাকে এক পলাতক ইঁদুর বিজ্ঞানীকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! এই বইয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ ও প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তার এক দারুণ মিশেল দেখা যায়।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও যে মিষ্টি একটি প্রেমের গল্প তৈরি হতে পারে, তা-ই দেখিয়েছেন এমিলি প্যাক্সম্যান। ভবিষ্যতের এক ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে বোনকে বাঁচাতে কায়লা নামে এক মেয়ে পাড়ি জমায় সল্ট স্প্রিং আইল্যান্ডে, যেখানে এখনো একটি হাসপাতাল টিকে আছে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা পাওয়াটা সহজ নয়। নিরুপায় হয়ে কায়লা এক উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদ সিডের সঙ্গে চুক্তি করে—বোনের চিকিৎসার বিনিময়ে সে তাকে বিয়ে করবে। এক ছাদের নিচে থাকার এই সাজানো সংসারেই কি তবে সত্যি সত্যি ভালোবাসা উঁকি দেবে? জানতে হলে পড়তে পারেন মজার এই বইটি।
ফিলিপ কে. ডিক পুরস্কারজয়ী মেগ এলিসনের এই উপন্যাসের প্লটটা বেশ রোমাঞ্চকর। আমেরিকার কিছু কট্টরপন্থী ধনকুবের সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেবেন। এর জন্য তাঁরা আমেরিকার আদি প্রতিষ্ঠাতা বা ফাউন্ডিং ফাদারদের ক্লোন তৈরি করে গোপন এক দ্বীপে বড় করতে থাকেন, যাতে তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে আমেরিকাকে সেই পুরোনো গৌরবে ফিরিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু ঝামেলা বাধে যখন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ক্লোনটি একটি গোপন টয়লেটে কুড়িয়ে পায় আধুনিক এক স্মার্টফোন! এরপরই যুবকদের দল নিজেদের জীবন নিজেদের মতো করে গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ভবিষ্যতের এক বিধ্বস্ত কোরিয়ার গল্প এটি। সেখানকার মানুষ বাস্তব জীবনের চরম হতাশা থেকে বাঁচতে বুঁদ হয়ে থাকে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির ভেতর। কিন্তু হাইস্কুলের মেয়ে সুপ ক্লাসের বন্ধুদের কাছে বুলিংয়ের শিকার হয়। কারণ তার কাছে এই ভিআর জগতে ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। তার জীবনের একমাত্র আশা, তাদের স্কুলে মিউজিক ভিডিও শুট করতে আসা কে-পপ তারকা ইচাইয়ের সঙ্গে দেখা করা। শেষ পর্যন্ত তার আশা কি পূরণ হয়েছিল? জানতে হলে পড়তে পারেন এই বইটি।
স্কুলশিক্ষিকা ইয়ংয়া সারা জীবন সমাজের তৈরি করে দেওয়া সব নিয়ম মেনে চলেছেন, কিন্তু মনে মনে তিনি এই জীবনকে তীব্র ঘৃণা করেন। একদিন তিনি নিজেকে বদলাতে চার সপ্তাহের এক বিশেষ আবেগ-নিয়ন্ত্রণ কোর্সে ভর্তি হন। কোর্স শেষ হতেই তিনি তাঁর ভেতরের আসল, বাঁধনহারা রূপটিকে পৃথিবীর সামনে মেলে ধরেন। চারপাশের সব প্রত্যাশার শেকল ভেঙে ফেলার পর তাঁর জীবনটা কেমন হয়, তা নিয়েই এই মনস্তাত্ত্বিক গল্প।
প্রত্যন্ত এক পাহাড়ি চূড়ায় নারীদের এক ছোট সমাজ টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এমনই একসময়ে সেই এলাকার সব নারী অলৌকিকভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়েন! সেখানে মিলা নামে এক নারী জন্ম দেন এক ফুটফুটে ছেলে সন্তান। এই ছেলেটিই সেই পুরো সমাজের একমাত্র পুরুষ। এই ঘটনা নারীদের সেই সাজানো আদর্শকে কেমন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, তা নিয়েই এগিয়েছে এই ফিকশন।
সাই নামে এক হেল্পার রোবটের গল্প এটি। তার মালিকের ৩৫ বছর বয়সী খামখেয়ালি ছেলে গ্রেসনের মন ভালো করার দায়িত্ব পড়ে সাইয়ের ওপর। কাজটা রোবটটির মোটেও পছন্দ ছিল না। কিন্তু গল্প মোড় নেয় তখন, যখন গ্রেসন জানতে পারে তার সিইও বোন তাদের পারিবারিক ব্যবসাটা এক বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। এরপরই রোবট ও মানুষ মিলে শুরু করে করপোরেট দখলদারত্ব ঠেকানোর এক পাগলাটে অভিযান!
১৯৭৭ সালের এক পৃথিবীর গল্প এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ অভিযান শুরু করে। এক পরিত্যক্ত চাঁদ-ঘাঁটিতে আটকে থাকা মিচ যখন এলিয়েন সভ্যতার দূত হিসেবে ফিরে আসা পুরোনো প্রেমিকের দেখা পায়, তখন পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। এরপরের কাহিনি জানতে হলে পড়তে পারেন মজার এই বইটি।
ভবিষ্যতের এক মহাকাব্যিক স্পেস অপেরা। মানুষ এখন মহাজাগতিক প্রাণীদের দাসে পরিণত হয়েছে। ফিন এবং তার সঙ্গীদের শৃঙ্খল ভাঙার লড়াই নিয়ে লেখা এই বইটি মহাকাশ অভিযানের ভক্তদের জন্য এক দারুণ উপহার।
২০০ বছর পর হিমায়িত অবস্থা থেকে জেগে ওঠা এক বিজ্ঞানী ও তাঁর স্ত্রীর ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। মাইটোক্যানসার নামে এক বিশ্বব্যাপী হুমকির মোকাবিলায় তাঁদের সংগ্রামই এই থ্রিলারের মূল উপজীব্য।