বই পড়ে লাভ কী
পৃথিবীর সেরা অভ্যাস ও সুন্দরতম নেশা হলো বই পড়া৷ তাই বই পড়ুন। এতে মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হয়ে উঠবে, মানসিক শান্তি ফিরে পাবেন।
‘আমাদের বই পড়তে হবে, কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই,’ বিখ্যাত লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন এ কথা। এই সত্য কি শুধুই সাহিত্যচর্চার জন্য, বিজ্ঞানচর্চার জন্যও নয় কি? বিজ্ঞান হোক, কিংবা অর্থনীতি, দর্শন বা সাহিত্য—সব রকম সুকুমারবৃত্তির চর্চার শুরুটা হয় বই পড়া থেকে।
কিন্তু বই পড়া মানে কি শুধুই জ্ঞান লাভ? আমাদের শরীর ও মনের জন্য আসলেই কি বই পড়া উপকারী, নাকি স্রেফ সময় নষ্ট? এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরাই-বা কী বলছেন? বই যদি উপকারীই হয়, সেটা কোন বই? হার্ড কপি নাকি ডিভাইসে থাকা সফট কপি পড়া বেশি ভালো? নাকি গল্পের ঢঙে পড়ে শোনানো অডিও বুক বেশি ভালো?
বই পড়া যে উপকারী, তা বৈজ্ঞানিকভাবেই সত্য। ঠিক কতটা উপকারী, এ নিয়ে সারা বিশ্বেই চলে নানা গবেষণা। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী একটি গবেষণা চালান। পাঠাভ্যাস মানুষের মস্তিষ্কে ঠিক কী কী প্রভাব ফেলে, তাঁরা সেটি দেখতে চান। তাঁরা পাঠরত অবস্থায় বেশ কিছু পাঠকের মস্তিষ্ক এমআরআইয়ের সাহায্যে স্ক্যান করেন। খেয়াল করেন, বই পড়ার সময় পাঠকের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বেড়ে যাচ্ছে। পাঠক যত বেশি বইয়ের গভীরে ঢুকছেন, মস্তিষ্কের তত বেশি এলাকা সক্রিয় হয়ে উঠছে।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী একটি গবেষণা চালান। তাঁরা খেয়াল করেন, বই পড়ার সময় পাঠকের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বেড়ে যাচ্ছে।
দেখা যায়, পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কের সোমাটোসেন্সরি এবং মোটর কর্টেক্স অংশকে সক্রিয় করে তুলছে। অথচ মস্তিষ্কের এই দুই অঞ্চল মানুষের নড়াচড়া ও ব্যথার অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে! এই গবেষণা বিজ্ঞানীদের নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করে। তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন, বই পড়া কেন এই দুই অংশের ওপর এত গভীর ছাপ রাখছে। শেষে তাঁরা উপসংহারে আসেন, গল্প বা উপন্যাস পড়ার সময় পাঠক নিজে গল্পের মূল চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যান।
তাঁর অবচেতন মন নিজেকেই গল্পের মূল চরিত্র ভাবতে শুরু করে। তাই চরিত্রের জীবনের উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনার অনুভূতিগুলো পাঠক নিজেও অনুভব করার চেষ্টা করেন। ফলে সক্রিয় হয়ে ওঠে সোমাটোসেন্সরি এবং মোটর কর্টেক্স।
মানসিক চাপ বা গভীর ডিপ্রেশনে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য বই পড়া টনিক হিসেবে কাজ করে। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির একটি দল আরেকটি গবেষণা চালায়। তাঁরা দেখেন, মাত্র ছয় মিনিট কোনো বইয়ে নিমগ্ন থাকলে পাঠকের হৃৎস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, রক্তচাপ কমে এবং শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়। সময়টা বাড়িয়ে প্রতিদিন ৩০ মিনিটের মতো বই পড়লে মানসিক চাপ কমে ম্যাজিকের মতো। তবে বই শুধু হার্ডকপি হতে হবে, তেমনটা নয়। ই-বুক বা অডিও বুকেও একই রকম ফলাফল পাওয়া যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বই পড়ায় মনোযোগ। বইয়ে মনোযোগ যত বেশি, মানসিক চাপ তত দ্রুত প্রশমিত হয়।
গবেষকেরা দেখেন, মাত্র ছয় মিনিট কোনো বইয়ে নিমগ্ন থাকলে পাঠকের হৃৎস্পন্দন ধীর হয়ে আসে, রক্তচাপ কমে এবং শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়।
২
বই পড়া শিশুদের জন্যও দারুণ উপকারী। এমনকি যে শিশু পড়তে শেখেনি, তার জন্যও। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা একটি পরীক্ষা চালান। তাঁরা দেখান, নিয়মিত পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কের গঠন বদলে দিতে পারে, তৈরি করতে পারে নতুন স্নায়বিক সংযোগ। এতে মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে। ফলে মস্তিষ্ক আরও সূক্ষ্মভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখে। শিশুদের বই পড়ে শোনালে, তাদের শ্রবণশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটে দ্রুত।
সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এতে আপনার যেমন মানসিক চাপ কমবে, তেমনি সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার বন্ধনও দৃঢ় হবে। এ বিষয়ে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ২০২০ সালে একটি গবেষণা চালায়।
কিছু অভিভাবক ৬ থেকে ১৮ মাস বয়সী সন্তানদের প্রতিদিন বই পড়ে শোনাতেন। গবেষণায় দেখা যায়, সেসব মা-বাবার মানসিক চাপের মাত্রা অনেক কম। তাঁরা সন্তানদের চাহিদার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন এবং সন্তানদের প্রতি তাঁদের স্নেহশীলতা অন্যদের চেয়ে বেশি। তাই সন্তানদের বই পড়ে শোনানোর কাজটা আজ থেকেই শুরু করতে পারেন। এতে আপনার মেজাজ ভালো থাকবে এবং ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাবে। খোদ মনোবিদেরাই বলছেন এ কথা।
কিছু অভিভাবক ৬ থেকে ১৮ মাস বয়সী সন্তানদের প্রতিদিন বই পড়ে শোনাতেন। গবেষণায় দেখা যায়, সেসব মা-বাবার মানসিক চাপের মাত্রা অনেক কম।
৩
আধুনিক যুগে বই পড়ার চেয়ে মানুষ ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বইয়ের যেকোনো তথ্য এখন মিলছে স্মার্টফোনেই। চাইলে গুগলে সার্চ দিয়ে মুহূর্তেই জেনে নিতে পারেন যেকোনো কিছু। বইয়ের কাহিনি ধার করে নাটক, সিনেমা বা সিরিজ তৈরির চল শুরু হয়েছে বহু আগেই। এখনো হচ্ছে। এ ছাড়া সময় কাটানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া তো আছেই। তাই বলে কি বইয়ের বিকল্প হয়ে উঠছে এসব মাধ্যম?
গবেষকেরা বলছেন, মাল্টিমিডিয়া কিংবা চলচ্চিত্র কখনোই বইয়ের বিকল্প নয়। তাঁদের সুরেই সুর মেলাচ্ছেন লেখক-সাহিত্যিকেরা। মার্কিন লেখক ও চিত্রশিল্পী টোমি ডি-পাওলা বলেছেন, ‘পাঠাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আপনি পড়ুয়া হলে যেকোনো বিষয়ের সবকিছু জানতে পারবেন। তেমনি সব বিষয়ের যেকোনো কিছু আপনার পক্ষে জানা সম্ভব।’
ইউটিউবের একটা ভিডিও হয়তো আপনাকে যেকোনো বিষয়ের খুব সামান্য অংশ জানতে সাহায্য করবে। অথচ সেই একই বিষয়ের রয়েছে বিশাল তথ্যভান্ডার। এই ভান্ডারের পুরোটা এক ডজন ভিডিওতেও ইউটিউব একসঙ্গে দেখিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু গোটা ভান্ডারের সব তথ্য আপনি একটা বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে পেয়ে যাবেন। সুতরাং বইয়ের বিকল্প মাল্টিমিডিয়া এখনো হতে পারেনি৷ ভবিষ্যতেও হবে—এমন কথা জোর দিয়ে বলতে পারছেন না প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও।
বিজ্ঞানের বইয়ের কথাই ধরা যাক। একটা বই লিখতে একজন বিজ্ঞান লেখক কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশক সময় নেন। এর মধ্যে তিনি নিখুঁত একটা পরিকল্পনা করেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন, দিনের পর দিন চলে সেগুলোর বিশ্লেষণ। তারপর সবকিছু একদম আদর্শ বইয়ের উপযোগী হলে লেখক বইটি প্রকাশ করেন। মাত্র কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার ভিডিওতে এমন একটা বইয়ের সব জ্ঞান পুরোপুরি তুলে ধরা অসম্ভব। এসব ভিডিওতে বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক পরম্পরাও বজায় রাখা কঠিন। তাই ভিডিও থেকে অর্জিত জ্ঞান অনেক সময় ভাসা ভাসা ধারণা দিতে পারে৷ বিজ্ঞানের অতল সমুদ্রের সন্ধান পাওয়া কেবল বইয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।
মার্কিন লেখক ও চিত্রশিল্পী টোমি ডি-পাওলা বলেছেন, ‘পাঠাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আপনি পড়ুয়া হলে যেকোনো বিষয়ের সবকিছু জানতে পারবেন।'
৪
বই কেন পাঠকের মনে সৃজনশীলতার বীজ বুনে দেয়, কল্পনাশক্তি বাড়ায়? গবেষণা বলছে, বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল লোব সক্রিয় হয়। মস্তিষ্কের এই অংশ চোখে দেখা দৃশ্য বিশ্লেষণের কাজ করে। গল্প-উপন্যাস পড়ার সময় অক্সিপিটাল লোব ভীষণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। পথের পাঁচালী উপন্যাসের কথাই ধরুন। এই উপন্যাস পড়ে কে নিজেকে দুরন্ত বালক হিসেবে কল্পনা করেননি! গ্রামের ছেলেমেয়েদের কথা বাদ দিন, যারা ইট-পাথরের শহরে বড় হয়েছে, তারাও সহজেই অপুর জীবনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে। একেবারে আপাদমস্তক নাগরিক জীবনে বেড়ে ওঠা মানুষও পথের পাঁচালী উপন্যাসে বর্ণিত পথের দুধারের প্রকৃতি, অজপাড়াগাঁ, বিরু রায়ের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর রোমহর্ষক বর্ণনা, অপু-দুর্গার আম কুড়ানোর সুখ—সব ছবির মতো মানসপটে এঁকে ফেলেন।
সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে মাস্টারপিস এক সিনেমা বানান। কিন্তু যাঁরা বইটি পড়েছেন, আবার সিনেমাটাও দেখেছেন, তাঁরাই উপলব্ধি করতে পারেন, বই থেকে পাওয়া কল্পনাশক্তি কতটা প্রখর। বই পড়ার সময় পাঠকের মানসপটে সেই কাহিনির একটা বিমূর্ত ছবি তৈরি হয়। অক্সিপিটাল লোব সেই বিমূর্ত ধারণাকে একটা দৃশ্যকল্পে রূপ দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপালাচিয়ান স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং অ্যাঞ্জেলো স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০০৭ সালে একটি যৌথ গবেষণা চালায় একদল স্নাতক শিক্ষার্থীর ওপর। এই শিক্ষার্থীদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগের শিক্ষার্থীরা শুধু আনন্দ লাভের জন্য বই পড়েন, অন্যরা বই পড়েন অ্যাকাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে। গবেষকেরা দেখেন, প্রথম ধাপের শিক্ষার্থীরা বেশি সৃজনশীল৷ শিক্ষকদের ওপর তাঁরা আস্থা রাখেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলোও করেন খুব নিষ্ঠার সঙ্গে।
গ্রামের ছেলেমেয়েদের কথা বাদ দিন, যারা ইট-পাথরের শহরে বড় হয়েছে, তারাও সহজেই অপুর জীবনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে।
৫
পৃথিবী এখন রকেটের গতিতে চলছে। এখানে এক ফোঁটা সময়ও অতি মূল্যবান। কর্মক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি৷ কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে গেলে স্মৃতিশক্তি ধারালো হওয়াটা জরুরি। বিশেষ করে শর্ট টাইম মেমরি বা স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি। বই স্মৃতিশক্তি ক্ষুরধার করতে সাহায্য করে। গল্প-উপন্যাস, এমনকি নন-ফিকশন বইও এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে।
বই পড়ার সময় আপনাকে কিছু পরম্পরা মেনে চলতে হয় ৷ বইয়ের কাহিনি যে ধারায় এগোয়, পাঠকের মনও সেই ধারায় এগোয়। ফলে আপনার মস্তিষ্কের মেমরি সেল বা স্মৃতি কোষগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে৷ বই পাঠকের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি—দুধরনের স্মৃতিকোষেই অনুরণন তোলে। তাই পাঠাভ্যাস হতে পারে স্মৃতিশক্তিকে ক্ষুরধার করার বড় হাতিয়ার।
বই পড়ার সময় আপনাকে কিছু পরম্পরা মেনে চলতে হয় ৷ বইয়ের কাহিনি যে ধারায় এগোয়, পাঠকের মনও সেই ধারায় এগোয়।
৬
কাজ কিংবা সৃজনশীলতার চর্চা—সব জায়গাতেই একাগ্রতা জরুরি। হয়তো নিবিষ্ট মনে আপনি কাজ করছেন, তখনই ফোনকলের টুংটাং শব্দে আপনার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটল। এই বিঘ্ন ঘটার ব্যাপারটাকে অনেকেই পাত্তা দেন না। কিন্তু গবেষণা বলছে, মনোযোগে একবার বিঘ্ন ঘটলে, সেটা ফিরে পেতে গড়ে ২৩ মিনিট সময় লাগে। আপনি যদি লেখক হন, কিংবা শিল্পী বা গবেষক—বারবার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলে কী ঘটবে, ভাবতে পারেন! প্রযুক্তিপণ্য এভাবেই মানুষের মনোযোগ নষ্ট করছে। শুধু তাৎক্ষণিক মনোযোগ নয়, এভাবে বারবার কাজে বিঘ্ন ঘটলে ভবিষ্যতের কাজেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবহারকারী দিনকে দিন অমনোযোগী হয়ে ওঠেন।
২০১৫ সালে কানাডার একদল গবেষক একটি গবেষণা করেন। তাঁরা দেখেন, ২০০০ সালে মানুষের মনোযোগের গড় স্থায়িত্ব ছিল ১২ সেকেন্ড। ২০১৫ সালে কমে তা ৮ সেকেন্ডে নেমে আসে। সেই গবেষণায় বিভিন্ন বয়সের মানুষকে যুক্ত করা হয়। দেখা যায়, ১৮-২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশই স্মার্টফোনে আসক্ত। হাতে কাজ না থাকলে তাঁরা ফোনের দিকে হাত বাড়ান। তাঁদের কাজে মনোযোগ কম। এঁরা বইও কম পড়েন।
অন্যদিকে ৬৫ বছরের বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ ব্যক্তি ফোনে আসক্ত। এঁদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা বেশি, তাঁরা কাজেও মনোযোগ দিতে পারেন বেশ ভালোভাবে। এ ধরনের আরেকটি গবেষণা চালানো হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। যেসব শিশুর হাতে ডিজিটাল ডিভাইস থাকে না, তারা বই পড়ে এবং সহজেই বইয়ের বিষয়বস্তু বুঝতে পারে। পড়াশোনা বা অন্য কাজে তারা মনোযোগও বেশি দেয়।
মোদ্দা কথা, বাধাহীনভাবে বই পড়লে পাঠকের মনোযোগ ও একাগ্রতার পেশির ব্যায়াম হয়। পাঠক যত বেশি বইয়ে মগ্ন থাকেন, তত বেশি তাঁর মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৮-২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশই স্মার্টফোনে আসক্ত। হাতে কাজ না থাকলে তাঁরা ফোনের দিকে হাত বাড়ান। তাঁদের কাজে মনোযোগ কম।
৭
বই শব্দচয়ন এবং লিখনশৈলীর একটি বড় সংকলন। অঙ্গভঙ্গি, শারীরিক ভাষা এবং সংলাপের মাধ্যমে কীভাবে চিন্তা ও আবেগ প্রকাশ করতে হয়—বই পড়ে তা আয়ত্ত করা সম্ভব। মানুষের লেখার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের প্যারাইটাল লোব। মস্তিষ্কের এই অংশও বই পড়ার সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। মস্তিষ্ক পঠিত বইগুলোর ভাষাশৈলী জমা করে রাখে। জমা হওয়া এই ভাষাগত দক্ষতা ভবিষ্যতে কাজে লাগায়, বিশেষ করে লেখা ও কথা বলার সময়।
একই সঙ্গে পাঠাভ্যাস আপনার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়। পাঠক যে সমাজে বড় হচ্ছেন, সেই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই লালন করেন। কিন্তু পাঠাভ্যাস সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে আরও গভীর দর্শন ও চিন্তাধারা আয়ত্ত করতে শেখায়। সমাজের ছকবাঁধা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আরও অনেক দূর প্রসারিত হয় পাঠকের মনোজগৎ। ফলে নিজের চেনাজানা গণ্ডির বাইরের লোকেদের সঙ্গেও পাঠকের মেলামেশা করা সহজ হয়। পাঠক নতুন কোনো বই পড়ার পর, তার বিষয়বস্তু নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে ভালোবাসেন। সেই আলোচনার সঙ্গীও যদি পড়ুয়া হন, তাহলে খুব সহজেই তাঁদের মধ্যে একটা মধুর বন্ধন তৈরি হয়। অর্থাৎ, বই পাঠকের নতুন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এই লেখার শুরুতেই বলেছি, পাঠাভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে ভীষণ কার্যকর। ডিজিটাল দুনিয়া আপনাকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় আবদ্ধ করে ফেলে। মানুষ বন্ধু ও পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এ সময়ে। ফলে বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা বহু আগেই মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। এর থেকে মুক্তির সবচেয়ে বড় উপায় বই পড়া।
অনেক বইয়ে পাঠক তাঁর নিজের মতোই বিষণ্ণ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চরিত্রের দেখা পান। পাঠক সহজেই সেই চরিত্রের দুঃখ-কষ্ট ও সীমাবদ্ধতাগুলো নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। ফলে বইয়ের ওই চরিত্র দ্রুতই তাঁর বন্ধু হয়ে ওঠে। পাঠকের একাকিত্ব, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা তখন অনেকটাই লাঘব হয়। পাঠক তখন একই ধরনের বই পড়ছেন, এমন পাঠকের সঙ্গে সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। নিজেদের দুঃখগুলো ভাগ করে বিষণ্ণতার বোঝা হালকা করে তুলতে পারেন সহজেই। তাই পড়ুয়া গ্রুপ ও বুক ক্লাবগুলো হয়ে উঠতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
পাঠক যে সমাজে বড় হচ্ছেন, সেই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই লালন করেন। কিন্তু পাঠাভ্যাস সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে আরও গভীর দর্শন ও চিন্তাধারা আয়ত্ত করতে শেখায়।
৮
এই ডিজিটাল যুগে মানুষের সব ধরনের অভ্যাস বদলে যাচ্ছে। বদল হচ্ছে বই পড়ার অভ্যাসেও। যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা বলছে, মার্কিনিরা চল্লিশ বছর আগের চেয়ে বর্তমানে অনেক কম বই পড়েন। তাঁদের বর্তমান জনসংখ্যার মাত্র ৩১ শতাংশ বছরে অন্তত একটি বই পড়েন। চল্লিশ বছরে আগের চেয়ে এই হার ১০ শতাংশ কমেছে। সারা বিশ্বে এই সংখ্যাটা আরও বেশি। আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে সেটা আরও ভয়াবহ। তাই বলে কি এর জন্য আপনি ডিজিটাল দুনিয়াকে দোষারোপ করবেন?
দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মেলাতে মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়—শারীরিক ও মানসিক দুধরনের পরিশ্রমই। সারা দিন কাজে ক্লান্ত ব্যক্তিটি যদি সোশ্যাল মিডিয়া, স্ট্রিমিং অ্যাপ এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্য কনটেন্টে বিনোদনের খোঁজ করেন, তাঁকে আপনি দোষ দিতে পারেন না। তা ছাড়া অনলাইনেও এখন বই পড়ার সুযোগ কম নয়। কিন্তু সেখান থেকে সুবিধা বেশি পাওয়া যায় না। সোশ্যাল মিডিয়া আজকাল লেখালেখির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু একজন পাঠক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫৫ সেকেন্ড ব্যয় করেন অনলাইনে পড়ার ক্ষেত্রে। এতটুকু পাঠাভ্যাস মন ও মস্তিষ্কের জন্য কোনো কাজে আসে না। তাই পড়ার সময় বাড়ান। অনলাইনের বাইরে অফলাইনেও পড়ার অভ্যাস করুন নতুন করে। কারণ, মানসিক উপকারের পাশাপাশি বই পড়া বিনোদনও দিতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া আজকাল লেখালেখির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু একজন পাঠক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫৫ সেকেন্ড ব্যয় করেন অনলাইনে পড়ার ক্ষেত্রে।
বই পড়ার পর তার রেশ থাকে বেশ কিছুক্ষণ। এ সময় মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয় বিশেষ কিছু সময়ে। ব্যক্তি যখন কোনো কিছু ঘটার জন্য ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করে, তখন ডোপামিন নিঃসৃত হয়। ডোপামিন মন ও মস্তিষ্ককে উৎফুল্ল রাখে। কোনো গল্প বা উপন্যাস পড়ার সময়, পরে কী ঘটবে তার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন পাঠক। তখন নিঃসৃত ডোপামিন আপনাকে বিনোদিত করে। বই পড়া হয়ে ওঠে নেশার মতো।
নেশা ক্ষতিকর। কিন্তু বই পড়ার নেশা তা নয়। বরং এটি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে শেখার ও উন্নতি করার সুযোগ করে দেয়। ধাঁধা সমাধান, সুডোকু মেলানো কিংবা দাবা খেলা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। পাঠাভ্যাসও একইভাবে মস্তিষ্কের উপকার করে৷ পৃথিবীর সেরা অভ্যাস ও সুন্দরতম নেশা হলো বই পড়া৷ তাই বই পড়ুন। এতে মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হয়ে উঠবে, মানসিক শান্তি ফিরে পাবেন।