মহাবিশ্বের মহাকাব্য
পাঠকের লেখা
আপনাকে যদি এই মুহূর্তে প্রশ্ন করা হয়, মহাবিশ্বটা ঠিক কত আগে সৃষ্টি হয়েছিল, তাহলে কী উত্তর দেবেন? যাঁরা জানেন, তাঁরা হয়তো উত্তর দেবেন, ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। তাহলে বলুন তো, এই মহাবিশ্বের বয়স যে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর, তা আমরা জানলাম কীভাবে? এই প্রশ্নে এসে হয়তো অনেকেই আটকে যাবেন। সত্যিই তো! মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল কবে, তা আমরা জানলাম কীভাবে?
পৃথিবীতে যে ডাইনোসর ছিল, তা তো আমরা সবাই জানি। এটাও নিশ্চয়ই অনেকে জানেন, ডাইনোসরের ফসিল বা জীবাশ্ম দেখেই আমরা ডাইনোসরের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তাহলে এখন এই প্রশ্নটা মাথায় আসা খুবই স্বাভাবিক, মহাবিশ্বেরও কি ফসিল আছে, যা থেকে আমরা মহাবিশ্ব সৃষ্টির সঠিক সময়টা জানতে পারলাম?
হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। হয়তো শুনে অবাক হচ্ছেন। মহাবিশ্বের ফসিল আছে; তবে সেটা হাড়-কঙ্কালে গড়া ফসিল নয়। মহাবিশ্বের ফসিল হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বা সিএমবি।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। মহাবিশ্বের প্রথম আলো হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন। ধারণা করা হয়, বিগ ব্যাংয়ের সময় সংঘটিত বিস্ফোরণে যে প্রচুর পরিমাণ আলো বিকিরণ হয়েছিল, তা আজও মহাবিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে। এই আলোর পরিমাণ খুব কম হলেও তা থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এভাবেই মানুষ প্রথম জানতে পারে, মহাবিশ্ব ঠিক কত আগে সৃষ্টি হয়েছিল।
মহাবিশ্বের ফসিল আছে; তবে সেটা হাড়-কঙ্কালে গড়া ফসিল নয়। মহাবিশ্বের ফসিল হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বা সিএমবি।
তবে এসব বিষয় কিন্তু এক দিনেই হুট করে আবিষ্কার হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এক ধারাবাহিক ইতিহাস। সিএমবি প্রথম আবিষ্কার করেন পদার্থবিদ আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন। নিউজার্সির হোলমডেলে ১৯৬৫ সালে হর্ন অ্যান্টেনার মাধ্যমে পাওয়া সংকেত থেকে পরে তাঁরা তা জানতে পারেন। এভাবে একে একে অসংখ্য বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের প্রথম আলো নিয়ে কাজ করেছেন। এভাবেই তিলে তিলে গড়ে ওঠা বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের বিকাশে অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের কাজের কথা তুলে ধরা হয়েছে মহাজাগতিক প্রথম আলো বইটিতে।
লেখক এই বইয়ে দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানের নতুন একটি আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীদের কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। তাঁদের সামনে কত চ্যালেঞ্জ থাকে! যাহোক, বইটি ঢাউস আকৃতির হলেও কেউ এটি পড়া শুরু করতে ভয় পাবেন না যেন। বইটিতে মোট ২০টি অধ্যায় আছে। প্রতিটি অধ্যায় সাজানো হয়েছে গল্পের মতো করে। বইটি পড়তে পড়তে পাঠক একদম পরিচিত হয়ে যাবেন বিজ্ঞানে অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে।
বইয়ে থাকা অধ্যায়গুলোর নামও বেশ চমৎকার। যেমন, একঘেয়ে ভুতুড়ে হিসহিস, একজন মানব কম্পিউটার, নক্ষত্রের হাত ও পায়ের ছাপ, মহাজাগতিক ফসিল, একটা হরর মুভি ও থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, কসমোলজির মহাবিতর্ক, মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কত, মহাবিস্ফোরণের আরও প্রমাণ, মহাকাশে প্রথম আলোর খোঁজে ইত্যাদি।
একনজরে
মহাজাগতিক প্রথম আলো: বিগ ব্যাং ও পটভূমি বিকিরণের খোঁজে
লেখক: আবুল বাসার
প্রচ্ছদ: মাহবুব রহমান
প্রকাশক: প্রথমা
পৃষ্ঠা: ২৪০
মুদ্রিত মূল্য: ৫০০ টাকা
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের মৌলিক একটি বই সহজ ভাষায় পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে লেখক এ জায়গায় বেশ সচেষ্ট।
বইয়ের একদম শেষ অধ্যায়ের শেষ লাইন—‘এভাবে শূন্য থেকে আবির্ভূত হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাবে মহাবিস্ফোরণের চিহ্ন।’ কিন্তু কীভাবে? জানতে হলে পড়তে হবে বইটি। পাঠক যাতে বই পড়ার সময় কোথাও বিভ্রান্ত না হন, সে জন্য প্রতিটি অধ্যায়ের শেষেই আছে তথ্যনির্দেশ। অধ্যায় শুরু করার আগে অধ্যায়ে থাকা কঠিন শব্দগুলো সম্পর্কেও সেখানে সংক্ষেপে জানানো হয়েছে। আর একেবারে সবার শেষে যোগ করা হয়েছে পরিভাষা।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের মৌলিক একটি বই সহজ ভাষায় পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে লেখক এ জায়গায় বেশ সচেষ্ট। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো। বইটি অনুবাদ বই নয়; একেবারেই মৌলিক। বইটি ২০২২ সালে প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন। বর্তমানে এটি অনলাইন ও অফলাইন বুকশপে পাওয়া যাচ্ছে।