অণুর ডান–বাম রহস্য সমাধান করে রসায়নে নোবেল
প্রকৃতিতে সবকিছু সব সময় পুরোপুরি সমান থাকে না। মাঝেমধ্যে সামান্য এদিক-ওদিক হয়। কিন্তু সেই ছোট্ট পার্থক্য বারবার বাড়তে থাকলে একসময় সেটিই হয়ে উঠতে পারে বড় কোনো পরিবর্তনের কারণ। অণুর জগতেও এমন ঘটনা ঘটে। একই রাসায়নিক পদার্থের দুটি অণু দেখতে হুবহু একই রকম হতে পারে। অথচ একটি হতে পারে অন্যটির আয়নার প্রতিবিম্ব। পার্থক্য শুধু এটুকুই। কিন্তু এই সামান্য পার্থক্যই মাঝেমধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি অণু কাজে লাগতে পারে ওষুধ তৈরিতে, অন্যটি হয়ে উঠতে পারে ক্ষতিকর।
এই রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০২৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান এবং জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোআই। তাঁদের গবেষণা দেখিয়েছে, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শুরুতে থাকা সামান্য অসমতাকে কীভাবে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া যায়। এমনকি একটি অণু কীভাবে নিজের মতো আরও অণু তৈরি হতে সাহায্য করতে পারে, সেটিও তাঁরা দেখিয়েছেন। রসায়নের জগতে আপাতদৃষ্টিতে ছোট এই ঘটনাগুলো কীভাবে বড় হয়ে ওঠে, তাঁদের কাজ আমাদের সেই রহস্য বুঝতে সাহায্য করেছে।
ওষুধ বানানোর সময় অণুর একটি রূপ হয়তো জাদুর মতো রোগ সারিয়ে দিল; কিন্তু প্রতিবিম্ব রূপটি কোনো কাজ তো করবেই না, উল্টো শরীরের চরম সর্বনাশ করে ফেলতে পারে!
দুই
একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি। নিজের দুই হাতের দিকে তাকান। ডান হাত ও বাঁ হাত দেখতে হুবহু একরকম। কিন্তু ডান হাতের তালুর ওপর বাঁ হাতের তালুটা ঠিকমতো বসানোর চেষ্টা করে দেখুন, কিছুতেই মিলবে না। এরা একে অপরের আয়নার প্রতিচ্ছবি হলেও, পুরোপুরি এক জিনিস নয়।
রসায়নের জগতেও এমন অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। কিছু অণু আছে, যাদের ঠিক ডান ও বাঁ হাতি রূপ থাকে। এরা দেখতে একই রকম হলেও আয়নার প্রতিবিম্বের মতো উল্টো। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলে কাইরাল অণু। আর এই যমজ রূপগুলোকে বলে এনানসিওমার।
সবচেয়ে বড় মুশকিল হলো, আমাদের শরীর এই যমজ অণুগুলোকে একভাবে দেখে না। ওষুধ বানানোর সময় অণুর একটি রূপ হয়তো জাদুর মতো রোগ সারিয়ে দিল; কিন্তু প্রতিবিম্ব রূপটি কোনো কাজ তো করবেই না, উল্টো শরীরের চরম সর্বনাশ করে ফেলতে পারে!
ষাট দশকের থ্যালিডোমাইড নামে ঘুমের ওষুধের কথাই ধরুন। এই ওষুধের একটা রূপ চমৎকার কাজ করত ঠিকই, কিন্তু এর প্রতিবিম্ব রূপটার কারণে হাজার হাজার শিশু মারাত্মক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল।
অণুর এই ডান ও বাঁ দিকের পার্থক্য যে শুধু ‘দেখতে কেমন’ তার মধ্যে আটকে নেই। বরং শরীরে এটা কতটা ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে, বিজ্ঞানীরা সেদিন খুব ভালোভাবেই তা টের পেয়েছিলেন।
কিছু অণু আছে, যাদের ঠিক ডান ও বাঁ হাতি রূপ থাকে। এরা দেখতে একই রকম হলেও আয়নার প্রতিবিম্বের মতো উল্টো। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলে কাইরাল অণু।
এরপর থেকেই রসায়নবিদদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, ল্যাবে কীভাবে এমন বিক্রিয়া ঘটানো যায়, যেখানে অণুর দুটি রূপ তৈরি না হয়ে শুধু আমাদের দরকারি রূপটাই তৈরি হবে! তবে কাজটা সহজ ছিল না।
এই গল্পের শুরু আরও অনেক আগে। ১৮৪০-এর দশকে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর টারটারিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ করছিলেন। সে সময় তিনি খেয়াল করলেন, এই অ্যাসিডের ক্রিস্টালগুলোর মধ্যে দুটো আলাদা রূপ আছে। সেগুলো ঠিক একটি অন্যটির প্রতিবিম্ব। পাস্তুর খুব সাবধানে চিমটার সাহায্যে এই দুই ধরনের স্ফটিক আলাদা করলেন। এরপর পানিতে গলিয়ে দেখলেন এক অদ্ভুত ব্যাপার! একটি দ্রবণ আলোকে ডান দিকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে। প্রথমটি আলোকে যতটা ডানদিকে বাঁকিয়ে দিচ্ছে, দ্বিতীয়টি ঠিক ততটাই বাঁকাচ্ছে বাঁ দিকে। কিন্তু দুটোকে একসঙ্গে মেশালে আলোর গতিপথ আর বদলাচ্ছে না। যেন একটি অন্যটির শক্তিকে বাতিল করে দিচ্ছে। এভাবেই বিজ্ঞানীরা প্রথম বুঝতে পারলেন, অণুগুলোরও মানুষের মতো ডান ও বাঁ হাতি রূপ বা কাইরালিটি আছে।
১৮৪০-এর দশকে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর টারটারিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ করছিলেন। সে সময় তিনি খেয়াল করলেন, এই অ্যাসিডের ক্রিস্টালগুলোর মধ্যে দুটো আলাদা রূপ আছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে আমাদের দেহের ভেতর। এই ডান-বাঁয়ের খেলায় প্রকৃতি যেন ইচ্ছে করেই একপক্ষ নিয়ে নিয়েছে। আমাদের শরীরের প্রোটিন যে অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি, তার সবগুলোই বাঁ-হাতি। আবার ডিএনএ বা আরএনএর ভেতরে যে শর্করার অণু থাকে, সেগুলোও শুধু একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপই ব্যবহার করে। সেটি ডান-হাতি। অণুগুলোর এই একপেশে স্বভাবকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হোমোকাইরালিটি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর শুরুতে যখন জীবনের প্রথম স্পন্দন তৈরি হচ্ছিল, তখন তো এই একপেশে আধিপত্য থাকার কথা নয়। তাহলে কোটি কোটি বছর আগে কীভাবে ডান বা বাঁ হাতি অণুর কোনো একটি অন্যটির চেয়ে সামান্য বেশি তৈরি হলো? আর সেই সামান্য পার্থক্যই–বা কীভাবে এত বিশাল হয়ে গেল যে, আজ পুরো জীবজগত কেবল একটিমাত্র রূপই ব্যবহার করছে? এই রহস্যের জট খুলতেই বিজ্ঞানীরা নেমে পড়লেন এক দীর্ঘ রাসায়নিক অনুসন্ধানে।
ডিএনএ বা আরএনএর ভেতরে যে শর্করার অণু থাকে, সেগুলোও শুধু একটি নির্দিষ্ট কাইরাল রূপই ব্যবহার করে। সেটি ডান-হাতি। অণুগুলোর এই স্বভাবকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হোমোকাইরালিটি।
তিন
ল্যাবে যখন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়, তখন সাধারণত অণুর দুটো রূপই সমানভাবে তৈরি হয়। অর্থাৎ, ৫০ শতাংশ ডান হাতি আর ৫০ শতাংশ বাঁ হাতি। কিন্তু রসায়নবিদরা যদি এমন কোনো অনুঘটক ব্যবহার করেন, যার নিজেরই ডান বা বাঁ হাতি হওয়ার ঝোঁক আছে, তখন বিক্রিয়ায় একটি রূপ বেশি তৈরি হতে পারে। এই ব্যাপারটাকে বলা হয় অপ্রতিসম বিক্রিয়া বা অ্যাসিমেট্রিকেল রিঅ্যাকশন। আর অনুঘটক হলো এমন একটি পদার্থ, যা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে সাহায্য করে, কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে স্থায়ীভাবে শেষ হয়ে যায় না। বিয়ের ঘটকের সঙ্গে অনুঘটকের অনেকটা মিল আছে। ঘটক পাত্রী দেখে বিয়ে দিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু নিজে বিয়ে করে না।
বিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন, ব্যাপারটা বুঝি পাটিগণিতের মতো সোজা। ধরুন, আপনি এমন একটি অনুঘটক ব্যবহার করলেন যার ৭৫ শতাংশ ডান-হাতি আর ২৫ শতাংশ বাঁ-হাতি। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, বিক্রিয়া শেষে যে উৎপাদ পাওয়া যাবে, সেখানেও ঠিক ৭৫ শতাংশ ডান-হাতি অণুই থাকবে। অর্থাৎ, সম্পর্কটা হবে একদম সরলরৈখিক। কিন্তু ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি কাগান দেখিয়ে দিলেন, প্রকৃতির নিয়ম এতটাও সহজ নয়।
আশির দশকে কাগান এক অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, অনুঘটকের ভেতরের ডান বা বাঁ হাতি অণুগুলো একা একা কাজ করে না, বরং একটি ধাতব পরমাণুকে ঘিরে সেগুলো জোট বাঁধে। এখন যদি আপনার অনুঘটকে ৭৫ শতাংশ ডান এবং ২৫ শতাংশ বাঁ হাতি অণু থাকে, তাহলে সেই ধাতব পরমাণুর সঙ্গে তিন রকম জুটি তৈরি হতে পারে—ডান-ডান, বাঁ-বাঁ এবং ডান-বাঁ।
আশির দশকে কাগান এক অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, অনুঘটকের ভেতরের ডান বা বাঁ হাতি অণুগুলো একা একা কাজ করে না, বরং একটি ধাতব পরমাণুকে ঘিরে সেগুলো জোট বাঁধে।
কাগান দেখলেন, এই তিন জুটির কাজ করার ক্ষমতা মোটেও এক নয়। ধরুন, ডান-ডান আর বাঁ-বাঁ জুটি খুব চমৎকার কাজ করছে, কিন্তু ডান-বাঁ জুটিটা ভীষণ অলস, প্রায় কাজই করছে না! ফলে কী হবে? যেহেতু ডান-ডান জুটি বেশি সক্রিয়, তাই বিক্রিয়া শেষে উৎপাদে ডান-হাতি অণুর পরিমাণ ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে হয়তো ৯০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে! অর্থাৎ, শুরুতে থাকা সামান্য পার্থক্যটা বিক্রিয়ার শেষে গিয়ে বিশাল ব্যবধান তৈরি করে ফেলছে। ১৯৮৬ সালে কাগান ঠিক এই ব্যাপারটাই প্রমাণ করে দেখান।
বিজ্ঞানের ভাষায় এবারের নোবেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘নন-লিনিয়ার ইফেক্ট’ বা অ-সরলরৈখিক প্রভাব। শব্দটা শুনতে খটমটে লাগলেও ব্যাপারটা কিন্তু ওই পাটিগণিতের হিসাব না মেলার মতোই সহজ। বাস্তব জীবনের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, কোনো ক্লাসের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার আগে একটা বিশেষ গাইডলাইন দেওয়া হলো। সরল হিসাবে আশা করা যায়, ওই ক্লাসের সাফল্যের হারও ৬০ শতাংশের আশপাশেই থাকবে। কিন্তু রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখা গেল, সাফল্যের হার ৯০ শতাংশ! কারণ, ওই ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু সংখ্যায় বেশি ছিল না, তারা বাকি ৪০ শতাংশের ওপর এমন প্রভাব ফেলেছে। সেটাই পুরো ক্লাসের সাফল্যের হার বদলে দিয়েছে।
রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও ঘটে ঠিক একই ঘটনা। অণুগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জোট বাঁধে বা বিক্রিয়া করে, সেটাই পালটে দেয় পুরো ফলাফল। কাগানের এই যুগান্তকারী কাজ রসায়নবিদদের বুঝিয়ে দিল, কাইরালিটি শুধু কোনো অণুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এক অণু অন্য অণুর সঙ্গে কীভাবে মিশছে, তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো বিক্রিয়ার ভবিষ্যৎ।
যেহেতু ডান-ডান জুটি বেশি সক্রিয়, তাই বিক্রিয়া শেষে উৎপাদে ডান-হাতি অণুর পরিমাণ ৭৫ শতাংশ ছাড়িয়ে হয়তো ৯০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে!
এই তথ্য কাজে লাগিয়ে সেগুলো বিক্রিয়াকে নিজেদের মতো করে সাজাতে পারে, যাতে একদম নিখুঁত ও বিশুদ্ধ এনানসিওমার পাওয়া যায়। এ কারণে কাগানের আবিষ্কার পরে নতুন নতুন অপ্রতিসম রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশা করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ওষুধ, সুগন্ধি, স্বাদ, কৃষি রাসায়নিক এবং নতুন উপাদান তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি নতুন ধরনের বস্তু তৈরির ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়।
কাগানের পর বিজ্ঞানীদের মাথায় আরও একটি কঠিন প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। কাগান তো দেখালেন, শুরুতে থাকা সামান্য পার্থক্য কীভাবে বিশাল হয়ে ওঠে। কিন্তু শুরুতে যদি কোনো পার্থক্যই না থাকে, তবুও কি কোনো অণু নিজেই নিজের সংখ্যা বহুগুণে বাড়াতে পারে?
রসায়নের দুনিয়ায় অটোক্যাটালাইসিস বা স্বয়ংক্রিয় অনুঘটকের ধারণা নতুন নয়। সহজভাবে বললে, কোনো বিক্রিয়ায় যে পদার্থটি তৈরি হচ্ছে, সেটি নিজেই যদি আবার নিজেকে তৈরির কাজটা বাড়িয়ে দেয়, তবে তাকে সয়ংক্রিয় অনুঘটক বা স্ব-অনুঘটক বলে।
একটা সহজ উদাহরণ আছে। ইথাইল অ্যাসিটেট ভাঙার একটি বিক্রিয়ায় অ্যাসিটিক অ্যাসিড অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরি হয়। অর্থাৎ একটা তৈরি হওয়া পদার্থ আবার নিজেকে তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
আরেকটু সহজভাবে বলি। ধরুন, আপনি একটি বুদ্ধিমান রোবট বানালেন। রোবটটা হুবহু তার নিজের মতোই আরেকটা রোবট বানাতে পারে। তাহলে এখন রোবট হলো দুটি। একটি আপনি বানিয়েছেন, অন্যটি রোবটটি নিজে বানিয়েছে। এবার ওই দুটি রোবট আবার দুটি রোবট বানাবে। তাহলে হবে চারটি রোবট। চারটি থেকে হবে আটটি…এভাবে রোবটের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।
কিন্তু কেনসো সোআইয়ের সামনে আরও কঠিন প্রশ্ন ছিল।
সহজভাবে বললে, কোনো বিক্রিয়ায় যে পদার্থটি তৈরি হচ্ছে, সেটি নিজেই যদি আবার নিজেকে তৈরির কাজটা বাড়িয়ে দেয়, তবে তাকে সয়ংক্রিয় অনুঘটক বা স্ব-অনুঘটক বলে।
চার
এই নন-লিনিয়ার ইফেক্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি দারুণ ব্যাপার খেয়াল করলেন জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের রসায়নবিদ কেনসো সোআই। তিনি দেখলেন, তাঁর বিক্রিয়ায় যে অনুঘটক ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিক্রিয়া শেষে যে উৎপাদ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের আণবিক কাঠামোর মধ্যে বেশ মিল আছে। তখন সোআইয়ের মাথায় এক অদ্ভুত বুদ্ধি এল। তিনি ভাবলেন, এমন কোনো বিক্রিয়া কি ডিজাইন করা সম্ভব, যেখানে বাইরে থেকে কোনো প্রভাবক দিতে হবে না, বরং বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অণুটি নিজেই নিজের প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে?
শুরু হলো দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এমন কয়েকটি বিক্রিয়ার কথা জানা থাকলেও, তার কোনোটিই কাইরাল বা অপ্রতিসম ছিল না। কিন্তু সোআই হাল ছাড়ার পাত্র নন। দিনের পর দিন পরীক্ষা চালানোর পর ১৯৯৫ সালে তিনি একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
সেখানে তিনি দেখান, তিনি একটি এনানসিওমারের মাত্র ২ শতাংশ বেশি পরিমাণ নিয়ে বিক্রিয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিক্রিয়াটি এতই স্বয়ংক্রিয় ছিল যে, সেটি নিজেই নিজের পক্ষে কাজ করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত সেই এনানসিওমারের পরিমাণ ৮৭ শতাংশে গিয়ে পৌঁছায়! অর্থাৎ, শুরুতে পার্থক্য ছিল যৎসামান্য। কিন্তু সেই সামান্য পার্থক্যই চক্রবৃদ্ধি হারে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়েছে। একেই বলা যায় সেলফ-রেইনফোর্সিং বা স্ব-শক্তিবর্ধক।
শুরু হলো দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এমন কয়েকটি বিক্রিয়ার কথা জানা থাকলেও, তার কোনোটিই কাইরাল বা অপ্রতিসম ছিল না। কিন্তু সোআই হাল ছাড়ার পাত্র নন।
সোআইয়ের লক্ষ্য ছিল আরও বড়। তিনি এমন একটি বিক্রিয়া খুঁজছিলেন, যা পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রাণের উৎপত্তির মতোই একদম শূন্য থেকে শুরু হবে। ২০০৩ সালে তিনি সেই অসাধ্য সাধন করলেন। ব্যাপারটা বুঝতে কয়েন টসের উদাহরণ দেওয়া যায়। আপনি একটি কয়েন ছুড়লে হেড বা টেল পড়ার সম্ভাবনা অর্ধেক অর্ধেক। শুরুতে পরপর দু-একবার হেড আসাটা নিতান্তই ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু প্রথমবার হেড আসার পর যদি কয়েনের ভেতরে এমন কোনো ম্যাজিক শুরু হয় যে, পরের বার হেড আসার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে? তাহলে কয়েকবার কয়েন টসের পর দেখা যাবে শুধু হেডই আসছে!
সোআইয়ের বিক্রিয়াটিও ঠিক এভাবেই কাজ করে। তিনি নন-কাইরাল দ্রবণ দিয়ে বিক্রিয়া শুরু করেন। বিক্রিয়ায় ডান ও বাঁ উভয় রূপই তৈরি হতে থাকে। কিন্তু নিতান্তই ভাগ্যের জোরে কোনো একটি রূপ সামান্য একটু বেশি তৈরি হয়ে যায়। এই অতি সামান্য আধিক্যই (০.০০০০৫ শতাংশ) পুরো বিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনবার নতুন উপাদান যোগ করার পর দেখা যায়, ওই নির্দিষ্ট এনানসিওমারটি পুরো বিক্রিয়া দখল করে নিয়েছে। আর তার পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ৯৯.৫ শতাংশ! অর্থাৎ শুরুতে যে পার্থক্য প্রায় চোখেই পড়ে না, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সেটিই হয়ে গেছে বিশাল বড়। একেই রসায়নের ইতিহাসে বিখ্যাত সোআই রিঅ্যাকশন বলা হয়।
সোআই নন-কাইরাল দ্রবণ দিয়ে বিক্রিয়া শুরু করেন। বিক্রিয়ায় ডান ও বাঁ উভয় রূপই তৈরি হতে থাকে। কিন্তু নিতান্তই ভাগ্যের জোরে কোনো একটি রূপ সামান্য একটু বেশি তৈরি হয়ে যায়।
এখানে আরও একটি মজার বিষয় আছে। সোআই যদি একই বিক্রিয়াটি আবার নতুন করে শুরু করেন, তাহলে আগেরবার যে রূপটি রাজত্ব করেছিল, এবারও যে সে-ই জিতবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই! মানে প্রথমবার ডান-হাতি রুপটি বেশি পাওয়া গেলে দ্বিতীয়বারও যে ডান-হাতি রূপ বেশি পাওয়া যাবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। পরের বার হয়তো বাঁ-হাতি এনানসিওমারটি পুরো বিক্রিয়া দখল করে নিতে পারে। কারণ, শুরুতে ভাগ্যের জোরে ঠিক কোন রূপটি সামান্য একটু বেশি তৈরি হবে, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। কিন্তু একবার যে রূপটি এই দৌড়ে চুল পরিমাণ এগিয়ে যায়, এই স্বয়ংক্রিয় অনুঘটক প্রক্রিয়া সেটাই বিজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয়। এভাবেই কোটি কোটি বছর আগে হয়তো প্রকৃতিও ভাগ্যের জোরে আমাদের জীবনের জন্য শুধু বাঁ-হাতি অণুগুলোই বেছে নিয়েছিল!
সোআই যদি একই বিক্রিয়াটি আবার নতুন করে শুরু করেন, তাহলে আগেরবার যে রূপটি রাজত্ব করেছিল, এবারও যে সে-ই জিতবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই!
পাঁচ
এবার চলুন টাইম মেশিনে চড়ে পৃথিবীর একদম শুরুর দিনগুলোতে ফিরে যাই। শুরুতে যদি ডান ও বাঁ-হাতি অ্যামিনো অ্যাসিড সমান সমান তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে কোটি কোটি বছর ধরে জীবজগত কেন শুধু একটি রূপই বেছে নিল? কেন আমাদের প্রোটিনগুলো শুধু বাঁ-হাতি, আর ডিএনএর শর্করাগুলো শুধুই ডান-হাতি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ১৯৫৩ সালে চার্লস ফ্র্যাংক একটি চমৎকার গাণিতিক মডেল প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, তিনটি শর্ত পূরণ হলে শুরুতে থাকা খুব সামান্য একটি পার্থক্য ধীরে ধীরে বিশাল আকার ধারণ করে পুরো রাজত্ব দখল করে নিতে পারে। প্রথমত, বিক্রিয়াটি অপ্রতিসম হতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিবিম্ব তৈরির হার বাড়িয়ে অন্যটি তৈরিতে বাধা দিতে হবে। তৃতীয়ত, তৈরি হওয়া পদার্থকে নিজের বিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে হবে।
চার্লস ফ্র্যাংকের মতে, তিনটি শর্ত পূরণ হলে শুরুতে থাকা খুব সামান্য একটি পার্থক্য ধীরে ধীরে বিশাল আকার ধারণ করে পুরো রাজত্ব দখল করে নিতে পারে।
কাগান এবং সোআইয়ের কাজ মূলত ফ্র্যাংকের এই তাত্ত্বিক মডেলই বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছে। এই দুই বিজ্ঞানীর কাজকে যদি আমরা একদম সহজ করে বলি, তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এ রকম—অঁরি কাগান দেখিয়েছেন, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শুরুতে যে সামান্য পার্থক্য বা অসমতা থাকে, তা সবসময় পাটিগণিতের সরল নিয়মে এগোয় না। অণুগুলোর পারস্পরিক মেলামেশার কারণে সেই সামান্য পার্থক্যই বিক্রিয়া শেষে অনেক বড় হয়ে ধরা দিতে পারে। অন্যদিকে, কেনসো সোআই আরেক ধাপ এগিয়ে দেখালেন, বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অণুটি যদি নিজেই নিজের অনুঘটক হয়ে যায়, তাহলে সেই সামান্য পার্থক্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে নিজেকে বাড়াতে থাকে।
সহজ কথায়, কাগান দেখালেন কীভাবে পার্থক্য বাড়ানো যায়, আর সোআই দেখালেন কীভাবে সেই পার্থক্য নিজেই নিজেকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। এই দুটো কাজকে একসঙ্গে মেলালেই বোঝা যায়, কেন তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নোবেল পুরস্কারের দাবিদার।
কেনসো সোআই আরেক ধাপ এগিয়ে দেখালেন, বিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অণুটি যদি নিজেই নিজের অনুঘটক হয়ে যায়, তাহলে সেই সামান্য পার্থক্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চক্রবৃদ্ধি হারে নিজেকে বাড়াতে থাকে।
ছয়
তাঁদের এই গবেষণা শুধু পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, তা বুঝতে সাহায্য করছে না, বরং কাগানের আবিষ্কৃত নন-লিনিয়ার ইফেক্ট এখন রসায়নবিদদের প্রতিদিনের কাজের অপরিহার্য হাতিয়ার। বিক্রিয়ার ফলাফল দেখেই বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারেন, ভেতরে অণুগুলো কীভাবে কাজ করছে। এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তাঁরা এখন এমন সব বিক্রিয়া ডিজাইন করছেন, যা দিয়ে একদম নিখুঁত ওষুধ তৈরি করা যায়। কোনো ওষুধের অণুর দুটি রূপ থাকলে বিজ্ঞানীরা এখন সহজেই শুধু দরকারি রূপটিই বিশুদ্ধভাবে তৈরি করতে পারেন। শুধু ওষুধ নয়; সুগন্ধি, স্বাদ বাড়ানোর উপাদান, কৃষিকাজের রাসায়নিক এবং নতুন ধরনের উপাদান তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁদের এই আবিষ্কার এক বিপ্লব ঘটিয়েছে।
তবে এখানে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। সোআইয়ের বিক্রিয়াটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি একটি কৃত্রিম বিক্রিয়া। এর মানে এই নয় যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঠিক এই রাসায়নিক বিক্রিয়াটির মাধ্যমেই প্রাণের শুরু হয়েছিল। জীবনের একেবারে শুরুতে ঠিক কী ঘটেছিল, তার ১০০ ভাগ নিশ্চিত উত্তর হয়তো আমরা কখনোই পাব না।
তবে সোআইয়ের কাজ সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের মধ্যে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে এক নতুন উন্মাদনা তৈরি করেছে। কারণ, তাঁর কাজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে, রসায়নের নিয়মের মধ্যেই নন-কাইরাল অণু থেকে হোমোকাইরালিটি অণু তৈরি হওয়া সম্ভব।
সোআইয়ের বিক্রিয়াটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি একটি কৃত্রিম বিক্রিয়া। এর মানে এই নয় যে, আজ থেকে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ঠিক এই রাসায়নিক বিক্রিয়াটির মাধ্যমেই প্রাণের শুরু হয়েছিল।
এ বারের নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাটি শুনলে যে কারও একটু ভয় লাগতে পারে—‘অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে অরৈখিক প্রভাব ও স্ব-অনুঘটন আবিষ্কারের জন্য তাঁরা নোবেল পেয়েছেন।’ শব্দগুলো বেশ খটমটে, তাই না? কিন্তু এর ভেতরের গল্পটা ভীষণ সুন্দর। প্রকৃতির অনেক অণুই আয়নার প্রতিবিম্বের মতো দুটো রূপে থাকতে পারে। কিন্তু জীবজগৎ তার মধ্যে শুধু একটিকেই বেছে নিয়েছে। এই একটিকে বেছে নেওয়ার ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা ছিল রসায়নের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি।
কাগান দেখালেন, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য ডান-বাঁয়ের পার্থক্যকে কীভাবে আরও বড় করা যায়। আর সোআই দেখালেন, সেই পার্থক্যকে কীভাবে এমন এক জাদুকরি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যেখানে তৈরি হওয়া অণু নিজেই আবার নিজেকে তৈরি করতে পারে। রসায়নের এই অপ্রতিসম রহস্য সমাধানের অসামান্য স্বীকৃতি হিসেবেই অঁরি কাগান ও কেনসো সোআই পেলেন এই পুরস্কার।
