নোবেল পেতে কেমন লাগে

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর কী হয়?ছবি: দ্য সায়েন্টিস্ট

পর্ব ১

বিজ্ঞানের আবিষ্কার হোক, অর্থনীতির নতুন তত্ত্ব হোক কিংবা মানুষের জীবন বদলে দেওয়া কোনো যুগান্তকারী গবেষণা—নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তটি একজন গবেষকের জীবনে নিঃসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পর কী হয়? বদলে যায় কি গবেষণার বিষয়? মানুষের প্রত্যাশা কি বাড়ে? খ্যাতি আর স্বীকৃতি কি গবেষণার কাজে সাহায্য করে, নাকি তৈরি করে নতুন কোনো চাপ? সবচেয়ে মজার প্রশ্ন—নোবেল পাওয়ার পর নিজের কাজটাকেই কি আগের মতো করে দেখা যায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব সংবাদমাধ্যম হার্ভার্ড গেজেট। নোবেল জয়ীদের কথায় উঠে এসেছে গবেষণার আনন্দ, সাফল্যের অপ্রত্যাশিত প্রভাব, নতুন দায়িত্ব এবং কখনো কখনো বেশ মজার কিছু অভিজ্ঞতাও। নোবেল পুরস্কার তাঁদের জীবন কতটা বদলেছে—সেই গল্প তাঁদের মুখ থেকেই শোনা যাক।

এই পর্বে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন, মার্কিন জীববিজ্ঞানী গ্যারি রুভকুন এবং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

আরও পড়ুন
চাকরির বাজারে নামতে ইচ্ছুক অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্লেসমেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনও করছিলাম। বাজারে তখন আমার সাহায্যপ্রার্থী ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিল।

ক্লডিয়া গোল্ডিন

মার্কিন অর্থনীতিবিদ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

২০২৩ সালে নোবেলজয়ী (অর্থনীতি)

নারী ও পুরুষের কর্মজীবন, মজুরি আর সুযোগের পার্থক্য কেন তৈরি হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসের পাতা ঘেঁটেছেন অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন। অতীতের শ্রমবাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, নারীদের কর্মজীবনে পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে এবং আজও কেন কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে তিনি এককভাবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর গবেষণা, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এর প্রভাব এবং নারী-পুরুষের কর্মজীবন নিয়ে তাঁর ভাবনা—এসব নিয়েই তিনি কথা বলেছেন।

২০২৩ সালে নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ক্লডিয়া গোল্ডিন
ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট

নোবেল পাওয়ার পরপরই আমার জীবন যেভাবে বদলে গিয়েছিল, কিছুদিন পর সেই পরিবর্তনটা আর ঠিক সেভাবে ছিল না। প্রথম দিকে এমন সব বিষয় নিয়ে আমাকে ভাবতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণত আমাকে ভাবতেই হয় না। যেমন, লম্বা গাউন, পায়ের মোজা আর হাই হিল জুতা। আমাকে একটি বক্তব্য লিখতে হয়েছিল। নোবেল ভোজসভার জন্যও একটি বক্তৃতা লিখতে হয়েছিল। একটি পোশাকও কিনতে হয়েছিল। সব মিলিয়ে এমন আরও একশ একটার মতো বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়েছে।

সে সময় আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম। চাকরির বাজারে নামতে ইচ্ছুক অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের প্লেসমেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনও করছিলাম। বাজারে তখন আমার সাহায্যপ্রার্থী ৩০ জন শিক্ষার্থী ছিল। ফলে হঠাৎ করে আমার ওপর কাজের চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন
প্রথম দিকে এমন সব বিষয় নিয়ে আমাকে ভাবতে হয়েছে, যেগুলো নিয়ে সাধারণত আমাকে ভাবতেই হয় না। যেমন, লম্বা গাউন, পায়ের মোজা আর হাই হিল জুতা। আমাকে একটি বক্তব্য লিখতে হয়েছিল।

আমার করণীয় কাজের তালিকাটা ছিল অসম্ভব লম্বা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এখন যখন সেই কয়েক মাসের কথা মনে করি, আমার ভীষণ আনন্দ হয়। খুব খুশি মনে সেই দিনগুলোর কথা ভাবি।

নোবেল পাওয়ার আরেকটি ফল ছিল ই-মেইলের বন্যা। পুরস্কার ঘোষণার পর প্রথম তিন দিনে এবং তার পরের কয়েক সপ্তাহে আমি প্রায় ১,৬০০টি ই-মেইল পেয়েছিলাম। আমি প্রতিটি ই-মেইলই পড়েছি। অনেকগুলো ছিল বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের অভিনন্দনবার্তা। আবার এমন অনেক মানুষও যোগাযোগ করেছিলেন, যারা আমাকে পরামর্শ দেওয়ার কাজ করতে বলেছিলেন বা বক্তৃতা দেওয়ার জন্য টাকা দিতে চেয়েছিলেন।

আমার এক সহকর্মী পরামর্শ দিলেন, এসব অনুরোধ সামলানোর জন্য আমি যেন একজন এজেন্ট রাখি। আমি বললাম, ‘আমি কখনো টাকার বিনিময়ে পরামর্শ দিইনি। এখন সেটা বদলানোরও কোনো ইচ্ছা আমার নেই।’ তাই আমি কোনো এজেন্ট নিইনি। তবে একটা জিনিস শিখেছিলাম—খুব সুন্দর করে ‘না’  বলতে। মানুষকে কীভাবে—‘দয়া করে আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিন’—কথাটা ভদ্রভাবে বলতে হয়, সেটাও শিখে গিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন
নোবেল পাওয়ার আরেকটি ফল ছিল ই-মেইলের বন্যা। পুরস্কার ঘোষণার পর প্রথম তিন দিনে এবং তার পরের কয়েক সপ্তাহে আমি প্রায় ১,৬০০টি ই-মেইল পেয়েছিলাম। আমি প্রতিটি ই-মেইলই পড়েছি।

তবে তিনটি বড় অনুরোধে আমি ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম। কারণ এগুলো আমার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমটি ছিল ‘ওয়েট, ওয়েট, ওয়েট... ডোন্ট টেল মি!’ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া। দ্বিতীয়টি ছিল বোস্টন রেড সক্স এবং নিউইয়র্ক ইয়াংকির একটি বেসবল খেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বল ছোড়া। এর জন্য আমি টানা ছয় সপ্তাহ অনুশীলন করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত বলটি একেবারে ঠিক জায়গায় গিয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ স্ট্রাইক হয়েছিল। এ নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত।

তৃতীয়টি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেশাদার নারী বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের সংগঠন ডব্লিউএনবিপিয়ের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে পরামর্শ দেওয়া। পরে তাদের চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনায় আমি অবৈতনিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছি। ফলাফল ছিল অসাধারণ। খেলোয়াড়দের বেতন প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছিল।

মার্কিন অর্থনীতিবিদ এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লডিয়া গোল্ডিন
ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

নোবেল পাওয়ার পর আমি এখন বেশ ভালো গাড়ি চালাতে পারি। এখন আর অন্য গাড়িকে ওভারটেক করে সামনে চলে যেতে পারি না। আমি এতই পরিচিত হয়ে গেছি যে আগে যেসব কাজ করতাম, এখন সেগুলো আর করা সম্ভব নয়।

নোবেল পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থ আমি অর্থনীতিতে গবেষণার জন্য হার্ভার্ডের একটি গবেষণা তহবিলে দান করেছি। এর সঙ্গে অন্য কয়েকটি পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থও ছিল। সব টাকা একসঙ্গে রেখে আমি অর্থনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জন্য একটি তহবিল তৈরি করেছি।

আরও পড়ুন
দ্বিতীয়টি ছিল বোস্টন রেড সক্স এবং নিউইয়র্ক ইয়াংকির একটি বেসবল খেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বল ছোড়া। এর জন্য আমি টানা ছয় সপ্তাহ অনুশীলন করেছিলাম।

আমার মনে হয় না, নোবেল পাওয়ার কারণে আমার পেশাগত জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন এসেছে। আমি এখনো আগের মতোই পড়াই। এখনো শিক্ষার্থী ও অন্যদের পরামর্শ দিই। এখনো গবেষণা করি। সেমিনার ও কর্মশালা পরিচালনা করি। এখনো ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চে একটি গবেষক দলের নেতৃত্ব দিই। তবে নোবেল পাওয়ার ফলে এখন আমার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস বেশি কাজ করে যে, মানুষ যা শুনতে ও পড়তে চায়, এমন কিছু বলার যোগ্যতা আমার আছে। এই অনুভূতিটা অবশ্যই ভালো লাগার মতো। আমার পরবর্তী বইয়ের প্রকাশক চাইলে বইটির প্রচ্ছদে নোবেল পুরস্কারের লোগো ব্যবহার করতে পারবেন। হয়তো তাতে আরও বেশি মানুষ বইটির দিকে নজর দেবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অন্য জায়গায়। অর্থনীতি ও সমাজে নারীদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া আমার কাছে যেমন গভীরভাবে অর্থবহ ছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষের কাছেও এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই মানুষদের মধ্যে ছিলেন নারী ও পুরুষ, তরুণ ও বয়স্ক—সব ধরনের মানুষ। এই পুরস্কার অনেক মানুষকে অনুভব করিয়েছে যে তাদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ। অন্য অনেককে দিয়েছে নিজেদের কাজ নিয়ে গর্ব করার সুযোগ। আমার কাছে নোবেল পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এটাই। এ কারণেই এই পুরস্কার আমার জন্য এত আনন্দের, এত গুরুত্বপূর্ণ এবং এত অর্থবহ হয়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন
তবে নোবেল পাওয়ার ফলে এখন আমার মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস বেশি কাজ করে যে, মানুষ যা শুনতে ও পড়তে চায়, এমন কিছু বলার যোগ্যতা আমার আছে। এই অনুভূতিটা অবশ্যই ভালো লাগার মতো।

গ্যারি বি. রুভকুন

মার্কিন জীববিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক

২০২৪ সালে নোবেলজয়ী (চিকিৎসাবিজ্ঞান)

কোষের ভেতরে জিন কীভাবে কাজ করে এবং শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন গ্যারি রুভকুন। ছোট একটি কৃমি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি ও ভিক্টর অ্যামব্রোস আবিষ্কার করেন মাইক্রোআরএনএ—অতি ক্ষুদ্র এক ধরনের আরএনএ, যা জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানে নতুন এক দিগন্ত খুলে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে মানুষের নানা জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে ভিক্টর অ্যামব্রোসের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর গবেষণা, বিজ্ঞানচর্চা এবং জীবনে এই পুরস্কারের প্রভাব নিয়েই তিনি কথা বলেছেন।

২০২৪ সালে নোবেলজয়ী মার্কিন জীববিজ্ঞানী গ্যারি বি. রুভকুন
ছবি: দ্য হার্ভার্ড ক্রিমসন

আমি বলব, নোবেল পুরস্কার জেতার পর আমার জীবন কিছুটা বদলেছে, তবে সেটা নাটকীয়ভাবে নয়। যাঁরাই নোবেল পান, এর আগে তাঁরা আরও অনেক পুরস্কার পান। তাই পুরস্কার পাওয়াটা আমার কাছে একেবারে নতুন কিছু ছিল না। তবে একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছিল। সাধারণ মানুষের কাছে নোবেল পুরস্কার নিয়ে আগ্রহটা যে এত বেশি, সেটা আগে বুঝতেই পারিনি। ব্যাপারটা বুঝতে হলে একটা কথা মনে রাখতে হবে। মানবজাতির মাত্র এক শতাংশ মানুষ নোবেল পুরস্কার নিয়ে সত্যিই মাথা ঘামায়। তবে বোস্টনে নোবেল পাওয়ার বিষয়টি বেশ ভালোই আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আরও পড়ুন
আমি বলব, নোবেল পুরস্কার জেতার পর আমার জীবন কিছুটা বদলেছে, তবে সেটা নাটকীয়ভাবে নয়। যাঁরাই নোবেল পান, এর আগে তাঁরা আরও অনেক পুরস্কার পান।

আমি কাজের জন্য গ্রিন লাইন ট্রেনে যাতায়াত করি। সেখানে মানুষ আমাকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে কথা বলতে শুরু করত। অবশ্য আমি যে ম্যাট ডেমনের মতো বিখ্যাত হয়ে গেছি—সেটা বলছি না (হাসি)। তবে রাস্তায় হেঁটে গেলে মিলি-ম্যাট ডেমন গোছের সেলিব্রিটি হওয়ার অনুভূতি পাওয়া যায়।

অন্য অনেক নোবেলজয়ীর মতো আমিও পুরস্কার ঘোষণার পর প্রচুর অনুরোধ পেয়েছিলাম। বেশির ভাগ অনুরোধ আমি খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। কারণ সেগুলোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল খ্যাতি পাওয়া। তবে একটি অনুরোধ বেশ মজার ছিল। সেটি এসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড বয় স্কাউটসের কাছ থেকে। আমি সান ফ্রান্সিসকো এলাকায় বয় স্কাউট ছিলাম এবং ঈগল স্কাউট পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম। স্কাউটিংয়ের মাধ্যমেই আমি পাহাড়ের সঙ্গে পরিচিত হই। ১৩ বছর বয়সে স্কাউটদের সঙ্গে থাকতেই আমি ভ্যাকুয়াম টিউবের রেডিও সম্পর্কে জানতে পারি। এক অর্থে সেটাই ছিল জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন মডিউল সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।

যাই হোক, নিউ ইংল্যান্ডের সব ঈগল স্কাউটকে নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমি আনন্দের সঙ্গেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি।

আরও পড়ুন
অন্য অনেক নোবেলজয়ীর মতো আমিও পুরস্কার ঘোষণার পর প্রচুর অনুরোধ পেয়েছিলাম। বেশির ভাগ অনুরোধ আমি খুব একটা গুরুত্ব দিইনি। কারণ সেগুলোর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল খ্যাতি পাওয়া।

আরেকটি মজার অনুরোধ এসেছিল ভ্যাটিকানের পন্টিফিক্যাল একাডেমি অব সায়েন্সেস থেকে। এর সঙ্গে নোবেল পুরস্কারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমার এক বন্ধু মারিয়া জুবার একজন গ্রহবিজ্ঞানী। তাঁর সঙ্গে আমি ২৫ বছর ধরে কাজ করছি। তিনিই আমাকে সেখানে গিয়ে একটি সেমিনার দিতে আমন্ত্রণ জানান। নোবেল পুরস্কার না পেলে হয়তো তারা আমাকে আমন্ত্রণই জানাত না। সেখানে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল। আর আমি পোপের সঙ্গে হাত মেলানোর সুযোগও পেলাম। ব্যাপারটা বেশ দারুণ ছিল।

মার্কিন জীববিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক গ্যারি বি. রুভকুন
ছবি: উইকিপিডিয়া

নোবেল জেতার পরের অনেক স্মৃতিই আমার কাছে খুব প্রিয়। ভোর চারটায় একজন লোকের ফোনে ঘুম ভাঙল। তাঁর গলায় সুইডিশ টান। তখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, ব্যাপারটা সত্যি। সত্যিই আমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি। তারপর হঠাৎ করে একদল সাংবাদিক আমার বাড়িতে এসে হাজির। ভাগ্যক্রমে, সেদিন আমার মেয়ে বাড়িতেই ছিল। সে চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আমার পুরো পরিবারের জন্য ব্যাপারটা ভীষণ আনন্দের ছিল। ফোন আসার সময় আমার স্ত্রী, মেয়ে এবং আমাদের কুকুর—সবাই বাড়িতে ছিল। পুরো ঘটনাটাই আমাদের সবার জন্য দারুণ মজার হয়ে উঠেছিল।

আরও পড়ুন
ভোর চারটায় একজন লোকের ফোনে ঘুম ভাঙল। তাঁর গলায় সুইডিশ টান। তখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, ব্যাপারটা সত্যি। সত্যিই আমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বন্ধুরা আমাকে ফোন করে অভিনন্দন জানাতে শুরু করল। তারা খবরটি দেখেই ফোন করেছিল। এরপর রাস্তাঘাটেও মানুষের কাছ থেকে অভিনন্দন পেতে শুরু করলাম। আমরা নিউটনে ৩০ বছর ধরে বাস করছি। এখানকার মানুষ আমাকে চেনে। মূলত কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হওয়ার সময়ই তারা আমাকে দেখেছে।

আরেকটি মজার স্মৃতি স্টকহোমের। একদিন একটু অবসর পেয়েছিলাম। তখন আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে একটি ছোট্ট, সাদামাটা রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম। সেখানে প্রায় ২৫ বছর বয়সী একদল তরুণ এসেছিল। তারা এসেছিল বন্ধুর বিয়ের আগে ব্যাচেলর পার্টি করতে। তারা আমাদের কাছে এসে হ্যালো বলল। এরপর তারা যত বেশি পানীয় খেতে লাগল, ততই আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ফিরে আসতে লাগল। প্রায় ২০ মিনিট পরপর একজন না একজন এসে আবার কথা বলত। শেষ পর্যন্ত তাদের একজন আমাকে বলল, তার অনাগত ছেলের জন্য আমি যেন একটি সুপারিশপত্র লিখে দিই। আমি পেন্সিল দিয়ে তার জন্য একটি সুপারিশপত্র লিখেছিলাম। এমন ঘটনা তো বানিয়ে বললেও বিশ্বাস হবে না!

আরও পড়ুন
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বন্ধুরা আমাকে ফোন করে অভিনন্দন জানাতে শুরু করল। তারা খবরটি দেখেই ফোন করেছিল। এরপর রাস্তাঘাটেও মানুষের কাছ থেকে অভিনন্দন পেতে শুরু করলাম।

অমর্ত্য সেন

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

১৯৯৮ সালে নোবেলজয়ী (অর্থনীতি)

দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে অর্থনীতির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে দেখেছেন অমর্ত্য সেন। মানুষের হাতে কত সম্পদ আছে, শুধু তা–ই নয়—সে মানুষটি আসলে কী করতে পারছে, কেমন জীবনযাপন করতে পারছে, সেটাও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর গবেষণা কল্যাণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের কারণ এবং মানুষের সক্ষমতা নিয়ে অর্থনীতির চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর গবেষণা, হার্ভার্ডে কাজ এবং অর্থনীতির জগতে তাঁর চিন্তার প্রভাব কীভাবে বদলেছে—সেসব নিয়েই তিনি কথা বলেছেন।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

আমি বলতে পারি না যে নোবেল পুরস্কার আমার জীবনকে খুব বেশি বদলে দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে নোবেল পাওয়ার পর আমার গবেষণার দিন নতুন কোনো দিকে ঘুরিয়ে দেয়নি। আমার পেশাগত জীবনেও এর বিশাল কোনো প্রভাব পড়েনি।

আমি নোবেল পুরস্কারকে বিজ্ঞানে, সাহিত্যে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে মানুষের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনেকগুলোর মধ্যে একটি পুরস্কার হিসেবে দেখি। নোবেল পাওয়ার পরও আমি সেই বিষয়গুলো নিয়েই কাজ করে গেছি, যেগুলো আমাকে সব সময় ভাবিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্যের অর্থনীতি এবং মানুষের উন্নয়ন।

আরও পড়ুন
নোবেল পাওয়ার পর বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে আমাকে এবং আমার কাজকে ঘিরে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। অনেক মানুষই সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন।

নোবেল পাওয়ার একটি ইতিবাচক দিক ছিল, সারা বিশ্বে দরিদ্র মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি আরও বেশি মানুষের নজরে আসে। এ নিয়ে আগ্রহও বাড়ে। এর নেতিবাচক কোনো দিকের কথা অবশ্য আমার মনে পড়ছে না। তবে একটা কথা বলবো যে নোবেল পাওয়ার পর নানা ধরনের উদ্‌যাপন আর সামাজিক দায়িত্ব পালনে আপনার প্রচুর সময় নষ্ট হতে পারে। এখানে অনেক সামাজিক বাধ্যবাধকতা থাকে, যা আপনাকে কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

নোবেল পাওয়ার পর বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে আমাকে এবং আমার কাজকে ঘিরে অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। অনেক মানুষই সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন।

অমর্ত্য সেন
ছবি: দ্য হার্ভার্ড গেজেট

দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করবে—এমন একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান শুরু করার ইচ্ছা আমার অনেক দিন ধরেই ছিল। নোবেল পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থ আমাকে ভারতে প্রতীচী ট্রাস্ট শুরু করার সুযোগ করে দেয়। ভারতের শান্তিনিকেতনে আমার পূর্বপুরুষের বাড়ির নাম ছিল প্রতীচী। সেই নামেই ট্রাস্টটির নাম রাখা হয়েছে। এই ট্রাস্টের কাজ হলো ছোট শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া। নোবেল পুরস্কারের অর্থ আমাকে সেইসব কাজে কিছু সম্পদ ব্যয় করার সুযোগ করে দিয়েছে। সেগুলো আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: হার্ভার্ড গেজেট

আরও পড়ুন