সাক্ষাৎকার
ফান্ডের জন্য আবেদন লেখার সময় এল নোবেল জয়ের খবর
ইতালির বেরগামো শহরে একটি বিজ্ঞান উৎসবে গিয়েছিলেন ফ্রান্সিস হালজেন। কাজপাগল মানুষ, তাই ছুটির দিনেও হোটেল রুমে বসে বসে গবেষণার ফান্ডের জন্য একটা প্রপোজাল লিখছিলেন। এমন সময় বেজে উঠল ফোন। স্ক্রিনে সুইডেনের কোড নম্বর! বাকিটা তো ইতিহাস। চলুন, নোবেল প্রাইজের ওয়েবসাইটের প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনের কথোপকথন শোনা যাক। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন কাজী আকাশ।
অ্যাডাম স্মিথ: হ্যালো। আমি কি ফ্রান্সিস হালজেনের সঙ্গে কথা বলছি?
ফ্রান্সিস হালজেন: হ্যাঁ, বলছি।
অ্যাডাম স্মিথ: হ্যালো। আমার নাম অ্যাডাম স্মিথ।
ফ্রান্সিস হালজেন: আপনার ভাগ্য ভালো যে আমাকে ফোনে পেয়েছেন! আমি ফোনটা ধরেছি কারণ স্ক্রিনে সুইডেনের কোড দেখতে পাচ্ছিলাম। আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আমারও ভাগ্য ভালো যে আপনি সুইডেনের প্রিফিক্সটা চিনেছেন! প্রথমেই একটু জানতে চাই, খবরটা আপনি কীভাবে পেলেন? মানে, আপনি নোবেল পেয়েছেন, এটা কখন জানতে পারলেন?
ফ্রান্সিস হালজেন: জানেন নিশ্চয়ই, আমি এখন সফরে আছি। উইকেন্ডে বেরগামো শহরের একটা বিজ্ঞান উৎসবে এসেছিলাম। একটু আগে হোটেলের রুমে বসে ফান্ডের জন্য একটা আবেদন লিখছিলাম। কিছুদিন আগে একটা মিটিংয়ে আমি মজা করে বলেছিলাম, এই প্রপোজালটা যেন ফান্ড পেতে সাহায্য করে!
অ্যাডাম স্মিথ: আশা করি আপনি ফান্ডটা পাবেন! তবে আমার ভয় হচ্ছে, নোবেল পাওয়ার পর আপনি এই প্রপোজালটা শেষ করার সময় পাবেন কি না!
ফ্রান্সিস হালজেন: হ্যাঁ, আমারও সেটাই মনে হচ্ছে! তবে জানেনই তো, আইসকিউব প্রজেক্টের মতোই আমার চারপাশে দারুণ সব মেধাবী সহকর্মী আছেন। ওরাই আমাকে সব বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এবারও আমি ঠিকই ম্যানেজ করে নেব।
একটু আগে হোটেলের রুমে বসে ফান্ডের জন্য একটা আবেদন লিখছিলাম। কিছুদিন আগে একটা মিটিংয়ে আমি মজা করে বলেছিলাম, এই প্রপোজালটা যেন ফান্ড পেতে সাহায্য করে!
অ্যাডাম স্মিথ: আচ্ছা, আমরা যদি দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ বরফের নিচে থাকা আপনাদের ওই বিশাল ও অদ্ভুত সুন্দর আইসকিউব প্রজেক্টের কথা ভাবি, আপনি এবং আপনার সহকর্মীরা নিশ্চয়ই এই অর্জন নিয়ে ভীষণ গর্বিত!
ফ্রান্সিস হালজেন: তা তো বটেই! তবে সত্যি বলতে, এই প্রজেক্ট নিয়ে আমি গর্বিত হওয়ার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি। প্রজেক্টের একদম শুরুর দিকে ভেনিস শহরের এক কনফারেন্সে আমি বলেছিলাম, এই ডিটেক্টরটা কাজ করবে কি না, তা পুরোপুরি ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তখন আমি লিস্ট করে বলেছিলাম, আমাদের সামনে কতগুলো বাধা আছে। আমরা সব বাধা পার করেছি দেখেই আজ আমি এখানে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, বরফের ভেতরে আলো কীভাবে কাজ করবে, সেটা আমরা জানতাম না। আর আমাদের ডিটেক্টরটা মূলত আলো ধরেই কাজ করে।
এরপরই আমরা সেই অভাবনীয় আবিষ্কারটা করে ফেললাম! দেখলাম, যে নীল আলোটা আমরা ধরছি, সেটা বরফের ভেতর দিয়ে শত শত মিটার অনায়াসে পার হয়ে যেতে পারে। এটা কেউ আশাই করেনি। গরম পানি দিয়ে বরফে গর্ত করার কাজটা সফল হবে কি না, ব্যাকগ্রাউন্ডের নয়েজ আমরা সামলাতে পারব কি না—এসব চিন্তার চেয়েও নীল আলোর এই ব্যাপারটা প্রজেক্টটাকে সফল করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। এর পুরোটাই ছিল আমাদের ভাগ্য। এখন হয়তো ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়। অ্যান্টার্কটিকার এই প্রাচীন বরফ ৫০ হাজার বছর আগের। এটা খুব বিশুদ্ধ। সে কারণেই এত স্বচ্ছ। কিন্তু শুরুতে তো এর কোনো নিশ্চয়তা আমাদের কাছে ছিল না।
প্রজেক্টের একদম শুরুর দিকে ভেনিস শহরের এক কনফারেন্সে আমি বলেছিলাম, এই ডিটেক্টরটা কাজ করবে কি না, তা পুরোপুরি ঈশ্বরের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
অ্যাডাম স্মিথ: তবে ভাগ্য তো সাহসীদেরই সহায় হয়! আপনার ক্ষেত্রেও সব হিসাব একেবারে খাপে খাপে মিলে গেছে।
ফ্রান্সিস হালজেন: ওই যে বললাম, প্রতিটা পদক্ষেপে আমি গর্বিত হওয়ার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি। এখন এর মাধ্যমেই নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের সূচনা হলো।
অ্যাডাম স্মিথ: আমি জানি এটা একদম শুরুর দিক, তবে এই নিউট্রিনোগুলো আসলে আমাদের কী দেখতে সাহায্য করবে?
ফ্রান্সিস হালজেন: আমরা নিজেরাই প্রথম যে উৎসটা শনাক্ত করতে পেরেছিলাম, সেটা একটা সক্রিয় গ্যালাক্সি। সেই গ্যালাক্সির ডেটা আমাদের বলে, গ্যালাক্সির একদম কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাকহোলের খুব কাছাকাছি জায়গা থেকে এই নিউট্রিনোগুলো তৈরি হয়।
অ্যাডাম স্মিথ: হুমম।
ফ্রান্সিস হালজেন: যেহেতু এটা একটা অ্যাকটিভ গ্যালাক্সি, তাই এর কেন্দ্রে একটা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল আছে। এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রটা প্লাজমা দিয়ে ঘেরা থাকে, যেটা নিউট্রিনো তৈরির মূল লক্ষ্যবস্তু। এমন একটা জায়গা থেকে আলো কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারে না। রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে হয়তো অনেক কষ্টে সেটা নিয়ে গবেষণা করা যায়। কিন্তু আমরা প্রথমবারের মতোই এমন একটা উৎসের খোঁজ পেলাম, যেখান থেকে সম্ভবত শুধু নিউট্রিনোই বেরিয়ে আসতে পারে।
এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রটা প্লাজমা দিয়ে ঘেরা থাকে, যেটা নিউট্রিনো তৈরির মূল লক্ষ্যবস্তু। এমন একটা জায়গা থেকে আলো কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারে না।
অ্যাডাম স্মিথ: এটা তো সত্যি অভাবনীয়!
ফ্রান্সিস হালজেন: নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আমরা যতটা আশা করেছিলাম, এটা তার মাত্র একটা উদাহরণ। আজ সংবাদ সম্মেলনে একজন বলছিলেন, এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, আমরা এর জন্য ফান্ড পেয়েছিলাম! এমন একটা অদ্ভুত ধারণাকে ফান্ড দেওয়ার জন্য ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অবশ্যই বড় একটা কৃতিত্ব প্রাপ্য।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনি যে পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, সেই উইসকনসিনের কথাও বলতে হয়। তারা তো আপনাকে দারুণভাবে সাপোর্ট করেছে।
ফ্রান্সিস হালজেন: হ্যাঁ, অসাধারণভাবে। দুটো দিক থেকে। উইসকনসিন এমন একটা জায়গা, যেখানে সবসময়ই প্রথা ভাঙা পদার্থবিজ্ঞান ও অদ্ভুত সব আইডিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। প্রজেক্টের একদম শুরুতেই আমরা তাদের সাপোর্ট পেয়েছিলাম। অথচ তখন বাকিরা ভাবত, আইডিয়াটা শুনতে খুব কিউট, কিন্তু এটা কোনোদিন কাজ করবে না! আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং প্রশাসন আমাদের পাশে ছিল।
আমরা আরও একটা কারণে ভাগ্যবান ছিলাম। উইসকনসিন ইউনিভার্সিটির দূরদর্শিতা ছিল, তাই তারা এমন একটা ল্যাব তৈরি করেছিল, যেখানে আমাদের এই প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল আকৃতির ও অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি বানানো সম্ভব হয়েছিল। ল্যাবটার নাম ‘ফিজিক্যাল সায়েন্সেস ল্যাবরেটরি’। এটা এক ধরনের অলাভজনক হাই-টেক ল্যাব। সেখানকার মেধাবী টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়াররা দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই সেন্সরগুলো বসানোর জন্য গরম পানি দিয়ে বরফে গর্ত করার যে অত্যাধুনিক যন্ত্রটা আমাদের খুব দরকার ছিল, সেটা ওই ল্যাবেই ডিজাইন করে বানানো হয়। বছরের পর বছর ধরে বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটিই এমন ল্যাব বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু উইসকনসিন তাদের এই সক্ষমতা ধরে রেখেছিল। এ কারণেই সেখানে বসে আইসকিউব প্রজেক্টটা সফল করা সম্ভব হয়েছে।
উইসকনসিন এমন একটা জায়গা, যেখানে সবসময়ই প্রথা ভাঙা পদার্থবিজ্ঞান ও অদ্ভুত সব আইডিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। প্রজেক্টের একদম শুরুতেই আমরা তাদের সাপোর্ট পেয়েছিলাম।
অ্যাডাম স্মিথ: শেষ করার আগে আমি একটু এই নতুন যুগ নিয়ে বলতে চাই। নিউট্রিনো ব্যবহার করে আপনারা মহাবিশ্বের একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারবেন, হয়তো সময়ের শুরুর দিকের রহস্য জানতে পারবেন। তার মানে, আমাদের সামনে আবিষ্কারের জন্য আরও বিশাল একটা জগৎ পড়ে আছে, তাই না?
ফ্রান্সিস হালজেন: একদম ঠিক। এই তো একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, আজ থেকে ৫০ বছর পর একজন নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাজ কেমন হবে? সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো উপায় নেই। এমনকি আজ থেকে এক বছর পর কী হবে, আমি সেটার উত্তর দিতেও রাজি নই! দেখুন, গত ১৫ বছর ধরে আমরা ডেটা নিচ্ছি এবং ক্রমাগত নতুন নতুন আবিষ্কার করে চলেছি। আমার একটাই চাওয়া, এই ধারা যেন চলতেই থাকে। আমি জানি, এটা চলবে।
অ্যাডাম স্মিথ: আশা করি, সারা বিশ্বের তরুণরা এটা দেখে বলবে—হ্যাঁ, এই ফিল্ডটাই আমার জন্য!
ফ্রান্সিস হালজেন: আমিও সেটাই আশা করি।
অ্যাডাম স্মিথ: আপনার সঙ্গে কথা বলে দারুণ লাগল। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
ফ্রান্সিস হালজেন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ। বিদায়।