নোবেলজয়ী ওমর ইয়াঘির যুগান্তকারী উদ্ভাবন শুকনো বাতাস থেকে পানি
বাসায় পানির কল ছাড়লেই অনর্গল পানি পড়তে থাকে, তাই এর পেছনের প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের খুব একটা ভাবতে হয় না। কিন্তু হুট করে যেদিন পানি আসে না, সেদিন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই পানির অভাব কাকে বলে। বাংলাদেশে পানির অভাব হয় না বললেই চলে। শহরগুলোতে মাঝেমধ্যে এই বিপদ দেখা যায়। তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী মূলত ছোট দ্বীপদেশগুলো। কোনো দুর্ঘটনা, ঝড় বা খরায় এসব দ্বীপে হঠাৎ করেই পানির উৎস উধাও হয়ে যেতে পারে। এমনকি পানি পরিশোধনাগার নষ্ট হলে বা বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটলেও দেখা দেয় তীব্র পানিসংকট।
পানি যেন সহজে পাওয়া যায়, এ জন্য একটি নতুন সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন ২০২৫ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি। তিনি এমন এক নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা শুষ্ক বাতাস থেকেও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারে। এই যন্ত্র ব্যবহার করে প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক হাজার লিটার পর্যন্ত পানি আলাদা করা সম্ভব।
ইয়াঘির এই আবিষ্কার রেটিকুলার কেমিস্ট্রি নামে রসায়নের এক বিশেষ শাখার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই পদ্ধতিতে পদার্থের অণুস্তরে নকশার পরিবর্তন করে এমন উপাদান তৈরি করা হয়, যা বাতাসের আর্দ্রতাকে শুষে নিয়ে পানি হিসেবে জমা করতে পারে। এমনকি মরুভূমি বা অত্যন্ত শুষ্ক পরিবেশেও এই প্রযুক্তি কার্যকর।
বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি এমন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যা শুষ্ক বাতাস থেকেও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারে। এই যন্ত্র ব্যবহার করে প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক হাজার লিটার পর্যন্ত পানি আলাদা করা সম্ভব।
ইয়াঘির প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাটোকো জানিয়েছে, তাদের তৈরি ইউনিটগুলোর আকার প্রায় ২০ ফুটের একটি শিপিং কনটেইনারের মতো। এগুলো চালাতে খুব নিম্নমাত্রার তাপশক্তির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, প্রচলিত বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভেঙে পড়লে বা ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যন্ত্রটি ব্যবহার করা যায়। ফলে খরা বা ঘূর্ণিঝড়ে কেন্দ্রীয় সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে এই ইউনিট বসিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নিরাপদ পানি সংগ্রহ করা সম্ভব।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে গ্রেনাডা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড় ও দীর্ঘ খরার ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালে হারিকেন বেরিলের আঘাতে গ্রেনাডার বিভিন্ন দ্বীপে হাজারো মানুষ পানিহীন হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে কারিয়াকু ও পেতিত মার্তিনিক দ্বীপে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ঝড়ের পর সেখানে এখনো শুষ্ক মৌসুমে মূল ভূখণ্ড থেকে পানি আমদানি করতে হয়।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তা ড্যাভন বেকার জানিয়েছেন, ইয়াঘির প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। অর্থাৎ এটি প্রচলিত বিদ্যুৎ বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে ঝড়ের পর যখন পাইপলাইন, বিদ্যুতের লাইন বা পানি শোধনাগার নষ্ট হয়ে যায়, তখনো এই যন্ত্র চালু রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে পানি আমদানির উচ্চ খরচ, কার্বন নিঃসরণ এবং দূষণের ঝুঁকিও কমে যায়।
ইয়াঘি মনে করেন, এটি লবণাক্ত সমুদ্রের পানি শোধনের তুলনায় পরিবেশবান্ধব বিকল্প। কারণ, সমুদ্রের পানি শোধনের পর অতিরিক্ত লবণাক্ত ব্রাইন আবার সাগরে ফেলা হলে তা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
২০২৪ সালে হারিকেন বেরিলের আঘাতে গ্রেনাডার বিভিন্ন দ্বীপে হাজারো মানুষ পানিহীন হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে কারিয়াকু ও পেতিত মার্তিনিক দ্বীপে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবী এখন একধরনের বৈশ্বিক পানি দেউলিয়াত্বের যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ এমন দেশে বাস করে, যেগুলো পানি-নিরাপত্তাহীন বা মারাত্মক পানিসংকটে ভুগছে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। আর ৪ বিলিয়ন মানুষ বছরে অন্তত এক মাস তীব্র পানিসংকটে পড়ে।
ইয়াঘির ব্যক্তিগত জীবনও এই আবিষ্কারের পেছনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। জর্ডানের এক শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা ইয়াঘি স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, তাঁদের এলাকায় সরকারি পানি আসত সপ্তাহে বা দুই সপ্তাহে একবার। খবর ছড়িয়ে পড়ত, ‘পানি আসছে’! আর সবাই দৌড়ে হাতের কাছে যত পাত্র আছে, তা ভরে নেওয়ার চেষ্টা করত। কারণ কখন পানি বন্ধ হয়ে যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
নোবেল পুরস্কার গ্রহণের ভাষণে তিনি তাঁর কাজকে বর্ণনা করেছেন ‘বস্তুকে নতুন করে কল্পনা করার বিজ্ঞান’ হিসেবে। তাঁর আহ্বান, ‘বিজ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বৈশ্বিক প্রতিভাকে স্বাগত জানাতে হবে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সম্মিলিত সাহস দেখাতে হবে।’ শুকনো বাতাস থেকে পানি তুলে আনার এই প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইয়ে নতুন পথ দেখাবে। বিশেষ করে ঝড়, খরা ও জলবায়ু বিপর্যয়ে আক্রান্ত ছোট দ্বীপদেশগুলোর জন্য এটি হতে পারে বড় আশীর্বাদ।