কাঠ আগুনে পুড়ে ছাই হয়, কিন্তু লোহার হাঁড়ি পোড়ে না কেন

আগুনের ওপরে থাকা লোহার হাঁড়ি পুড়ে যায় না কেন?ছবি: আর্টিস্ট জিএনডি ফটোগ্রাফি / গেটি ইমেজ

শীতের রাতে ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে আছেন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। সেই আগুনের ওপর একটি লোহার বা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে গরম স্যুপ রান্না হচ্ছে। আগুনের লেলিহান শিখার দিকে তাকিয়ে কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, নিচের কাঠের টুকরোগুলো তো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঠিক তার ওপরে থাকা লোহার হাঁড়িটা কেন পুড়ছে না?

কিছু জিনিস আগুনে খুব সহজে পোড়ে, আর কিছু জিনিস একেবারেই পোড়ে না। এর পেছনের আসল কারণটি লুকিয়ে আছে ওই বস্তুর রাসায়নিক বন্ধনের ভেতর। চলুন, আজ এই মজার বিজ্ঞানের রহস্যটি জেনে নিই!

আগুনের বেঁচে থাকার তিন শর্ত

কাঠ কেন পোড়ে, তা জানার আগে বুঝতে হবে—আগুন আসলে কী।

আগুন জ্বলার জন্য প্রধানত তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। অক্সিজেন, এটি আমাদের চারপাশের বাতাসেই থাকে। তাপ, দিয়াশলাইয়ের ঘর্ষণ বা বজ্রপাতের মতো কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায়। আর জ্বালানি মানে যা আসলে পোড়ে।

আগুন জ্বলার জন্য মূলত তিন জিনিস লাগে- তাপ, জ্বালানি ও অক্সিজেন
ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের রসায়নবিদ কার্ল ব্রোজেকের মতে, জ্বালানি বলতে সাধারণত জৈব পদার্থকে বোঝায়। সহজ কথায়, যেসব জিনিস কার্বন এবং হাইড্রোজেনের বন্ধন দিয়ে তৈরি (মাঝেমধ্যে এর সঙ্গে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন বা ফসফরাসও থাকে), সেগুলোই আগুনে সহজে পোড়ে।

আরও পড়ুন
আগুন জ্বলার জন্য প্রধানত তিনটি জিনিসের প্রয়োজন। অক্সিজেন, এটি আমাদের চারপাশের বাতাসেই থাকে। তাপ, দিয়াশলাইয়ের ঘর্ষণ বা বজ্রপাতের মতো কোনো উৎস থেকে পাওয়া যায়। আর জ্বালানি।

কাঠ কেন এত সহজে পোড়ে

আগুন এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া, যা অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে প্রচুর শক্তি মুক্ত করে। কাঠ বা কাগজের মতো যেসব জিনিস সহজে আগুন ধরে, সেগুলো মূলত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এই সেলুলোজ হলো কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের একটি দুর্বল বন্ধন।

কাঠ মূলত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। তাই সহজে আগুনে পুড়ে যায়
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

প্রকৃতির নিয়মই হলো, সব জিনিস স্থির বা স্থিতিশীল হতে চায়। কাঠে আগুন লাগলে এর দুর্বল সেলুলোজ ভেঙে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং জলীয় বাষ্প তৈরি করে। এগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল অণু। এই দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তিশালী অবস্থায় যাওয়ার সময় কাঠ থেকে প্রচুর শক্তি বেরিয়ে আসে। এই মুক্ত হওয়া শক্তি বাতাসের পরমাণুগুলোর ইলেকট্রনকে উত্তেজিত করে তোলে, যা থেকে আলোর সৃষ্টি হয়। আর এই আলোকেই আমরা আগুনের শিখা হিসেবে দেখি!

আরও পড়ুন
কাঠ বা কাগজের মতো যেসব জিনিস সহজে আগুন ধরে, সেগুলো মূলত সেলুলোজ দিয়ে তৈরি। এই সেলুলোজ হলো কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের একটি দুর্বল বন্ধন।

লোহার হাঁড়িতে আগুণ ধরে না কেন

এবার আসা যাক লোহার হাঁড়ির কথায়। কাঠ ও ধাতুর মধ্যে মূল পার্থক্য হলো, আগুন লাগলে তারা সেই শক্তি বা তাপকে কীভাবে গ্রহণ করে।

ধাতুর রাসায়নিক বন্ধনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়, তাই এদের সহজে ভাঙা যায় না। কাঠের যেহেতু এত শক্তিশালী বন্ধন নেই, তাই সে আগুনের তাপ বা শক্তিটা নিজের ভেতর ধরে রাখতে পারে না। শক্তি ধরে রাখতে না পেরে সে নিজেই জ্বলে ওঠে এবং শক্তি বের করে দেয়। অন্যদিকে, ধাতুর তৈরি হাঁড়ির এই শক্তি বা তাপ শোষণ করার এবং তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে! এ কারণেই আগুন দিলে হাঁড়িটি না পুড়ে শুধু প্রচণ্ড গরম হতে থাকে।

ধাতুর তৈরি হাঁড়ি আগুনের তাপ শোষণ করতে পারে
ছবি: নাফটিজিন / গেটি ইমেজ

তাপ শোষণের এই জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে চাইলে কাঠ বা কাগজকেও পোড়া থেকে বাঁচানো যায়। আপনি যদি একটি কাগজের কাপে পানি ভরে তার নিচে আগুন ধরিয়ে দেন, তবে দেখবেন কাগজটি পুড়ছে না! কারণ, আগুনের তাপ কাগজের বদলে ভেতরের পানি শোষণ করে নেয়। তাই কাগজ আগুন ধরার সুযোগই পায় না। তবে নিরাপত্তার খাতিরে এটি বাসায় নিজে নিজে চেষ্টা না করাই ভালো!

আরও পড়ুন
ধাতুর রাসায়নিক বন্ধনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়, তাই এদের সহজে ভাঙা যায় না। কাঠের যেহেতু এত শক্তিশালী বন্ধন নেই, তাই সে আগুনের তাপ বা শক্তিটা নিজের ভেতর ধরে রাখতে পারে না।

ধাতু কি আদৌ পোড়ে

আপনি ভাবতে পারেন, ধাতু কি তাহলে কখনোই পোড়ে না? আসলে কিছু ধাতু আছে যারা দিব্যি আগুনে পোড়ে। যেমন পটাশিয়াম বা টাইটানিয়াম। আতশবাজিতে এই ধাতুগুলোই ব্যবহার করা হয়! তবে এগুলোকে সাধারণ লোহার মতো কঠিন অবস্থায় রাখা হয় না, বরং একেবারে মিহি গুঁড়ো বা পাউডার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গুঁড়ো করার ফলে এদের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বেড়ে যায় এবং এরা বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত বিক্রিয়া করার সুযোগ পায়। তীব্র তাপে পুড়ে এগুলো আকাশে বর্ণিল আলোর বন্যা বইয়ে দেয়।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন