পরমাণু কণিকাগুলোর পারস্পরিক বন্ধন

সাধারণত পরমাণুর কোন ইলেকট্রিক চার্জ প্রকাশ পায় নাছবি: আইস্টক

পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে অনবরত আবর্তিত হয় ইলেকট্রন। মনে হয় যেন ইলেকট্রনটি নিউক্লিয়াসের সঙ্গে একটি অদৃশ্য সুতার দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে! এই অদৃশ্য সুতাটি হচ্ছে ইলেকট্রিক শক্তি। কোথা থেকে এলো এই শক্তি?

প্রিয় বন্ধুরা, চলো একটি গল্প শোনা যাক। আড়াই হাজার বছরেরও পূর্বে প্রাচীন গ্রিসের মিলেট শহরে বাস করতেন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ফালেস। একদিন ফালেসের কন্যা চরকায় পশম দিয়ে উল বুনছিলেন। চরকাটি ছিল অ্যাম্বারের তৈরি। হঠাৎ করে তিনি খেয়াল করে দেখলেন যে, পশমগুলো প্রায়শই চরকার গায়ে লেপটে যাচ্ছে। ব্যাপারটি বাবাকে জানানোর পর ফালেস ভাবলেন হয়তো তার কন্যা ভুল করছে! নিজেই পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখলেন যে, পশম দ্বারা ঘর্ষণের ফলে অ্যাম্বার শুধুমাত্র পশম নয়, সুতা, চুলসহ বিভিন্ন বস্তুকেও আকর্ষণ করছে।

গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বার হলো 'ইলেকট্রন'। পশম দ্বারা ঘর্ষণের ফলে অ্যাম্বার হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করার যে গুণ অর্জন করে বহুবছর পরে তার নাম দেয়া হলো ইলেকট্রিসিটি।

এরই মধ্যে জানা গেল যে, সিল্কের রুমালের সাহায্যে কাঁচের দণ্ডকে ঘষার পর এটিও বিভিন্ন হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করতে শুরু করবে। মজার ব্যাপার হলো, যদি অ্যাম্বারের দুটি টুকরোকে পশমের সাহায্যে ঘর্ষণ করা হয় তবে টুকরো দুইটি পরস্পরকে বিকর্ষণ করতে শুরু করবে। তেমনিভাবে কাঁচের দুটি দণ্ডকে যদি সিল্কের রুমালের সাহায্যে ঘর্ষণ করা হয় তবে তারাও পরস্পরকে বিকর্ষণ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই অ্যাম্বারের টুকরো ও কাঁচের দণ্ড পরস্পরকে আকর্ষণ করে।

আরও পড়ুন
গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বার হলো ইলেকট্রন। পশম দ্বারা ঘর্ষণের ফলে অ্যাম্বার হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করার যে গুণ অর্জন করে বহুবছর পরে তার নাম দেয়া হলো ইলেকট্রিসিটি।

বিজ্ঞানিরা সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, পশম দ্বারা ঘর্ষিত অ্যাম্বার এবং সিল্কদ্বারা ঘর্ষিত কাঁচের মধ্যে যে ইলেকট্রিসিটির উদ্ভব হয় তারা ভিন্ন ধর্মের। কাঁচের বিদ্যুৎকে প্লাস (+) এবং অ্যাম্বারের বিদ্যুৎকে মাইনাস (-) হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। অ্যাম্বারের ইলেকট্রিসিটি আগে আবিষ্কৃত হলেও এটিকে মাইনাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়তো ঠিক হয়নি, কিন্তু এখনতো আর কিছুই করার নেই। কিছুই আর পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

অনেক পরে বিজ্ঞানিরা প্রমাণ করে দেখালেন যে, প্রকৃতিতে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত অতিক্ষুদ্র কণিকা রয়েছে, যাকে তারা নাম দিয়েছেন ইলেকট্রন (নিশ্চই মনে আছে যে গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বার হচ্ছে ইলেকট্রন)।

এখন বুঝা গেল যে, পশম দ্বারা অ্যাম্বারের ঘর্ষণের ফলে কি ঘটে! অ্যাম্বারে বহুসংখ্যক ইলেকট্রন জড়ো হওয়ার কারণে এটি ঋণাত্মক চার্জ অর্জন করে।

প্রশ্ন হলো, এই ইলেকট্রন কোথা থেকে আসে? পশম থেকে কি? অবশ্যই। একই সঙ্গে ইলেকট্রন হারিয়ে পশম ধনাত্মক চার্জ অর্জন করে।

তুমি কি ধনাত্মক চার্জযুক্ত হতে চাও? এটা খুবই সোজা... চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে চুল থেকে যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক ইলেকট্রন ঝেড়ে ফেল। এ জন্য একটি চিরুনি দিয়ে মাথার চুল কয়েকবার আঁচড়ে নাও। তবে মনে রেখ, চুলগুলো যাতে শুকনা থাকে এবং চিরুনিটি হয় প্লাস্টিকের তৈরি।

আরও পড়ুন
পদার্থবিদরা অনুমান করলেন যে, হাইড্রোজেনের পরমাণুতে ধনাত্মক চার্জযুক্ত কিছু একটা রয়েছে এবং এর চার্জের পরিমাণ ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জের সমান।

চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে ইলেকট্রন ঝেরে ফেলা... শুনতে খুব অদ্ভুত লাগে, তাই না? আঁচড়ানোর ফলে সত্যিকার অর্থেই চুল থেকে ইলেকট্রন চিরুনিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে চিরুনিটি ঋণাত্মক এবং চুল ধনাত্মক চার্জ অর্জন করেছে। এখন দেখলেতো ধনাত্মক চার্জযুক্ত হওয়া কত সহজ!

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইলেকট্রনের ইলেকট্রিক চার্জের পরিমাণ অতি নগণ্য। পৃথিবীতে এর চাইতে কম চার্জযুক্ত কোন কিছু বিজ্ঞানিরা অদ্যাবধি খুঁজে পাননি।

ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর আরো জানা গেল যে, ঋণাত্মক চার্জযুক্ত এই ক্ষুদ্র কণিকাগুলো প্রতিটি পরমাণুতেই রয়েছে। যদি তাই হয়, পরমাণুও ঋণাত্মক চার্জযুক্ত হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। সাধারণত পরমাণুর কোন ইলেকট্রিক চার্জ প্রকাশ পায় না।

উদাহরণস্বরূপ, হাইড্রোজেনের পরমাণুতে একটি ইলেকট্রন রয়েছে, কিন্তু পরমাণুটি কোন চার্জ বহন করে না। কি কারণ রয়েছে এর পিছনে? পরমাণুতে অবস্থিত ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জ কোথায় গেল?

না কোথাও যায়নি। পদার্থবিদরা অনুমান করলেন যে, হাইড্রোজেনের পরমাণুতে ধনাত্মক চার্জযুক্ত কিছু একটা রয়েছে এবং এর চার্জের পরিমাণ ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জের সমান। এর ফলে পরমাণুটি ধনাত্মক বা ঋণাত্মক কোন চার্জই বহন করে না। ধনাত্মক চার্জযুক্ত যে কণিকাটির কথা বলা হচ্ছে তা হলো প্রোটন।

আরও পড়ুন
ইলেকট্রন আবিষ্কারের পর আরো জানা গেল যে, ঋণাত্মক চার্জযুক্ত এই ক্ষুদ্র কণিকাগুলো প্রতিটি পরমাণুতেই রয়েছে। যদি তাই হয়, পরমাণুও ঋণাত্মক চার্জযুক্ত হওয়া উচিত।

এখন কি তোমার কাছে পরিষ্কার, কোন ইলেকট্রিক সুতা ইলেকট্রন এবং প্রোটনকে এক সঙ্গে বেঁধে রেখেছে? ঋণাত্মক চার্জযুক্ত কণিকা ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণিকাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। ইলেকট্রন ও প্রোটনের চার্জের পরিমাণও সমান। অতএব, পরমাণুর ভিতরে প্রোটন অদৃশ্য ইলেকট্রিক সুতার সাহায্যে একটি মাত্র ইলেকট্রনকে ধরে রাখতে সক্ষম। পরমাণুতে যদি আরো একটি ইলেকট্রন স্থাপনের চেষ্টা করা হয়- তবে তা ছুটে বেরিয়ে যাবে।

পরমাণুতে যদি অতিরিক্ত ইলেকট্রন স্থাপন করতে হয় তবে প্রথমেই নিউক্লিয়াসে আরো একটি প্রোটন যোগ করতে হবে। তখনই দ্বিতীয় ইলেকট্রনটি ধরে রাখা সম্ভব হবে।

কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবং

পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকা

আরও পড়ুন