রাসায়নিক মারণাস্ত্রে দেহের ভেতর কী পরিবর্তন ঘটে

মানুষের কল্যাণে আবিষ্কৃত কেমিক্যালই ইতিহাসে পরিণত হয়েছে ভয়াবহ মারণাস্ত্রেছবি: শাটারস্টোক ডটকম

টোকিও শহরের সাবওয়ে ট্রেনের কামরায় গাদাগাদি ভিড়। অফিসগামী মানুষগুলো কেউ ঝিমুচ্ছে, কেউ আবার খবরের কাগজ পড়ছে। হঠাৎ অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল। একজন কাশি শুরু করল, তারপর আরেকজন। দেখতে দেখতে পুরো বগিতে কাশির দমক।

এক তরুণী যাত্রী খেয়াল করলেন, ট্রেনের ভেতরের আলোগুলো কেমন যেন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। হলদেটে ফ্যাকাশে এক অদ্ভুত আভা। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। মনে হচ্ছে বাতাসটা ভারী হয়ে গেছে। তিনি জানালা খোলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাভ হলো না। অদ্ভুত এক অনুভূতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর চোখের পাতা কাঁপতে শুরু করল, শরীর অবশ হয়ে এল।

১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে টোকিও সাবওয়েতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সারিন গ্যাস হামলায় ১৩ জন মারা গিয়েছিলেন, অসুস্থ হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ
ছবি: উইকিপিডিয়া

১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে টোকিও সাবওয়েতে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ংকর সারিন গ্যাস হামলার ঘটনা এমনই। ওই হামলায় ১৩ জন মারা গিয়েছিলেন, অসুস্থ হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তরুণীটি বেঁচে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সেই অভিজ্ঞতা আমাদের বলে, রাসায়নিক অস্ত্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বা সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ। তবুও সিরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাশিয়ার যুদ্ধে বারবার ফিরে এসেছে এই মারণাস্ত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিষাক্ত গ্যাসগুলো মানুষের শরীরে ঢুকে কী ক্ষতি করে? কীভাবে এরা নিঃশব্দে মৃত্যু ডেকে আনে?

আরও পড়ুন
১৯৯৫ সালের মার্চ মাসে টোকিও সাবওয়েতে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ংকর সারিন গ্যাস হামলার ঘটনা এমনই। ওই হামলায় ১৩ জন মারা গিয়েছিলেন, অসুস্থ হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

নার্ভ এজেন্ট: সাক্ষাৎ যমদূত

রাসায়নিক অস্ত্রের কথা বললেই প্রথমে যে নামটা আসে, তা হলো সারিন। একে বলা হয় নার্ভ এজেন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা কীটনাশক তৈরি করতে এই ভয়ংকর বিষ আবিষ্কার করে। ভিএক্স বা নোভিচকও এই গোত্রেরই বিষ। এগুলো গ্যাস বা তরল আকারে শরীরে ঢুকতে পারে। এমনকি চামড়ার সংস্পর্শে এলেও মৃত্যু নিশ্চিত!

কিন্তু শরীরে ঢুকে এটা কী করে? আমাদের শরীর চলে মস্তিষ্কের নির্দেশে। মস্তিষ্ক স্নায়ুর মাধ্যমে পেশিতে সংকেত পাঠায়, কখন হাত নাড়াতে হবে বা কখন শ্বাস নিতে হবে। এই সংকেত পাঠানোর কাজটা করে অ্যাসিটাইলকোলিন নামে একধরনের রাসায়নিক। কাজ শেষ হলে শরীরের এনজাইমগুলো এই রাসায়নিককে ভেঙে ফেলে, যাতে পেশিগুলো আবার শিথিল হতে পারে।

মস্তিষ্ক স্নায়ুর মাধ্যমে পেশিতে সংকেত পাঠায়, কখন হাত নাড়াতে হবে বা কখন শ্বাস নিতে হবে
ছবি: এলুমাইন্ড সেন্টারস

নার্ভ এজেন্ট ওই এনজাইমগুলোকে অকেজো করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের পাঠানো সংকেত আর বন্ধ হয় না। পেশিগুলো ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে। বুক ও ফুসফুসের পেশিগুলো অবশ হয়ে যায়। মানুষ তখন আর শ্বাস নিতে পারে না। মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে, প্রচণ্ড খিঁচুনি শুরু হয় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে।

আরও পড়ুন
অ্যাসিটাইলকোলিন নামে একধরনের রাসায়নিক। কাজ শেষ হলে শরীরের এনজাইমগুলো এই রাসায়নিককে ভেঙে ফেলে, যাতে পেশিগুলো আবার শিথিল হতে পারে।

চোকিং এজেন্ট: মৃত্যুর কারিগর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে বলা হয় রসায়নবিদদের যুদ্ধ। ১৯১৫ সালে জার্মানরা প্রথম ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করেছিল। বাতাসের তোড়ে সেই সবুজ-হলুদ গ্যাস যখন ট্রেঞ্চের দিকে ধেয়ে আসছিল, সৈন্যরা বুঝতেই পারেনি কী ভয়াবহ মৃত্যু অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

ক্লোরিন, ফসজিনকে বলা হয় চোকিং এজেন্ট। এদের কাজ হলো মানুষকে শ্বাসরোধ করে মারা। ক্লোরিন গ্যাস যখনই নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাকে বা গলায় ঢোকে, তখন শরীরের জলীয় অংশের সঙ্গে মিশে এটি অ্যাসিডে পরিণত হয় (হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড)। সোজা কথায়, এই অ্যাসিড শরীরের ভেতরটা পুড়িয়ে দেয়। কোষগুলো মরে যায়, প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া ও কাশি শুরু হয়।

বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস
ছবি: সংগৃহীত

তবে ফসজিন গ্যাস আরও বেশি মারাত্মক। ক্লোরিনের মতো এটি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। এটি চুপিসারে ফুসফুসের গভীরে অ্যালভিওলাইতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে ধীরে ধীরে ফুসফুসের কোষগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ফলে ফুসফুসের ভেতরে পানি জমতে শুরু করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ড্রাই ল্যান্ড ড্রাউনিং।

আরও পড়ুন
ক্লোরিন, ফসজিনকে বলা হয় চোকিং এজেন্ট। ক্লোরিন গ্যাস যখনই নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাকে বা গলায় ঢোকে, তখন শরীরের জলীয় অংশের সঙ্গে মিশে এটি অ্যাসিডে পরিণত হয়।

ব্লিস্টার এজেন্ট: যন্ত্রণার আরেক নাম

মাস্টার্ড গ্যাসের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? এটি হলো ব্লিস্টার এজেন্ট। যুদ্ধের ময়দানে এর কুখ্যাতি অনেক পুরোনো। এর নাম মাস্টার্ড গ্যাস হওয়ার কারণ এর রং খানিকটা হলদেটে এবং ঝাঁজালো গন্ধ। এই গ্যাসগুলো চর্বি বা ফ্যাটজাতীয় জিনিসে সহজেই মিশে যায়। তাই শরীরের যেসব জায়গা বেশি ঘামে বা ভেজা থাকে, সেখানে এগুলো আক্রমণ করে।

শরীরে লাগার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ব্যথা বোঝা যায় না, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বিশাল সব ফোস্কা পড়তে শুরু করে। চামড়া পুড়ে যায়, চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর নিঃশ্বাসের সঙ্গে যদি ভেতরে ঢোকে, তবে শ্বাসনালিতে দগদগে ঘা তৈরি করে। এতে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে মারা না-ও যেতে পারে, কিন্তু এর যন্ত্রণা এবং ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন।

মাস্টার্ড গ্যাসের সংস্পর্শে এলে প্রথমে ব্যথা বোঝা না গেলেও পরে ত্বকে বড় ফোস্কা পড়ে
ছবি: সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি

১৯৯৭ সালে কেমিক্যাল উইপন কনভেনশনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে এসব রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, মানুষের ওপর মানুষের এই নিষ্ঠুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা থামেনি। টোকিওর সাবওয়ে থেকে সিরিয়ার রণাঙ্গনে রাসায়নিক অস্ত্রের বিভীষিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানের অপব্যবহার কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জীববিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন