৫ হাজার বছরের পুরোনো পৃথিবীর প্রথম শহরের হদিস মিলল ইরাকে
আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে যখন পৃথিবীতে সবেমাত্র প্রথম শহর গড়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়ের এক বিশাল ভবনের খোঁজ পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। ইরাকের উত্তরের জাগ্রোস পর্বতমালার পাদদেশে এই রহস্যময় কাঠামোর সন্ধান মিলেছে।
গত সেপ্টেম্বরে আবিষ্কৃত এই জায়গাটির নাম কানি শাই। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি হয়তো একটি মন্দির বা কাল্টিক স্পেস ছিল। সেখানে সেকালের মানুষ উপাসনা করত। এর স্থাপত্য শৈলী দেখে বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ বাড়ি নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ছিল।
এই আবিষ্কার আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভবনটি তৈরি হয়েছিল উরুক যুগে। আনুমানিক ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই উরুক যুগ কিন্তু যেনতেন যুগ নয়! এর নামকরণ হয়েছে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার উরুক শহরের নামে। দক্ষিণ মেসোপটেমিয়াই বর্তমানের দক্ষিণ ইরাক।
উরুক ছিল এক অবিশ্বাস্য শহর। অনেকেই মনে করেন, এটিই হয়তো পৃথিবীর প্রথম শহর। প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সেখানে বাস করত। শহরটিতে ছিল পরিকল্পিত রাস্তাঘাট, আলাদা আলাদা আবাসিক ও প্রশাসনিক এলাকা। উরুকের মানুষেরাই কিউনিফর্ম লিপির লিখন পদ্ধতি এবং প্রথম লিখিত সংখ্যার আবিষ্কার করেছিল। কৃষিপণ্যের হিসাব রাখার জন্য তারা সংখ্যা ব্যবহার করত। তারাই প্রথম জিগুরাট বা পিরামিডের মতো দেখতে মন্দির বানানোর প্রচলন করে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি হয়তো একটি মন্দির বা কাল্টিক স্পেস ছিল। সেখানে সেকালের মানুষ উপাসনা করত। এর স্থাপত্য শৈলী দেখে বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ বাড়ি নয়।
কিন্তু আসল রহস্যটা অন্য জায়গায়! এই উরুক শহর ছিল দক্ষিণে। আর নতুন এই মন্দিরটা পাওয়া গেছে উত্তরে। দক্ষিণের চেয়ে প্রায় ৪৮০ কিমি দূরে! সে যুগে এই পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে সময় লাগত প্রায় ১৫ দিন। এতদিন বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, উরুক থেকে এত দূরে হওয়ায় কানি শাই হয়তো একটা গুরুত্বহীন, প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল। কিন্তু এই নতুন আবিষ্কার সব হিসাব পাল্টে দিচ্ছে!
কিন্তু কী পাওয়া গেল মন্দিরে?
প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই ধ্বংসস্তূপ থেকে এমন সব জিনিস খুঁজে পেয়েছেন, যা দেখে তাদের চোখ কপালে উঠেছে! সেখানে যেসব জিনিস পাওয়া গেছে, সেসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিসের হদিস এখানে দিচ্ছি।
১. সিলিন্ডার সিল: এগুলো হলো একধরনের বিশেষ সিলমোহর, যা সেই যুগে প্রশাসন বা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
২. সোনার লকেট: একটি সোনার লকেটের ভাঙা অংশও পাওয়া গেছে। এতে প্রমাণিত হয়, তখনকার মানুষও নিজেদের সম্পদ প্রদর্শন করত।
৩. ওয়াল কোন: সবচেয়ে অবাক করা জিনিস হলো এই ওয়াল কোন। মানে দেয়ালের সঙ্গে কোনক আকৃতি বানানো ছিল। এগুলো পোড়ামাটি বা পাথরের তৈরি শঙ্কু বা মোচার মতো দেখতে। কারিগরেরা ভেজা প্লাস্টারের দেয়ালে এর সূচালো মুখটা চেপে গেঁথে দিত। এরপর শঙ্কুর চ্যাপ্টা মাথাগুলো নানা রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হতো। এতে দেয়ালে তৈরি হতো এক দারুণ মোজাইক বা জ্যামিতিক নকশা। এর সাহায্যে বোঝা যায়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা আনুষ্ঠানিক ভবন ছিল।
সবচেয়ে অবাক করা জিনিস হলো এই ওয়াল কোন। মানে দেয়ালের সঙ্গে কোনক আকৃতি বানানো ছিল। এগুলো পোড়ামাটি বা পাথরের তৈরি শঙ্কু বা মোচার মতো দেখতে।
এই আবিষ্কার এটাই দেখাচ্ছে যে, কানি শাই কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল না। বরং এটি উরুক শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। গবেষকরা বলছেন, ‘এই ভবনটির গুরুত্ব যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে এটি উরুকের সঙ্গে আশপাশের অঞ্চলের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।’
এই অঞ্চল যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে বিজ্ঞানীরা আরও বলেছেন, ‘টাইগ্রিস নদীর পূর্বে মানুষের বসতির ইতিহাস বোঝার জন্য কানি শাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান।’