বিজ্ঞানের যে ১০টি শব্দ আমরা ভুলভাবে ব্যবহার করি
মানুষ বড্ড কৌতূহলী প্রাণী। চারপাশে যা কিছু ঘটে, তার একটা মাথামুণ্ডু বের করার বা প্যাটার্ন খোঁজার চেষ্টা করা আমাদের স্বভাব। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা সবাই তো আর ল্যাবরেটরিতে বসে সারাদিন গবেষণা করি না। ফলে রোজকার কথাবার্তায় বিজ্ঞানের এমন অনেক শব্দ বা পরিভাষা আমরা ব্যবহার করি, যার আসল অর্থ হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন।
আপনার কি মনে হয় পকেটে টাকা এলেই গাড়ির সমস্যা শুরু হয়? কিংবা আপনার মায়ের যেহেতু পথ ভোলা স্বভাব, তাই আপনারও সেই জেনেটিক সমস্যা আছে?
আড্ডায় বা তর্কে বিজ্ঞানের শব্দগুলো নিজের মতো করে ব্যবহার করলে হয়তো পুলিশ ধরবে না, কিন্তু এই শব্দগুলোর আসল বৈজ্ঞানিক অর্থ জানা থাকলে আপনি স্বাস্থ্য, পরিবেশ কিংবা অর্থনীতিবিষয়ক খবরগুলো আরও ভালো বুঝতে পারবেন।
আপনি কি কথায় কথায় দাবি করেন যে আপনার কোম্পানির গ্রোথ এক্সপোনেনশিয়াল? কিংবা পরপর চারবার সমুদ্র সৈকতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে কি দাবি করছেন যে আপনার কপালটাই খারাপ এবং এটা প্রমাণিত? যদি এমন শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে হয়তো একটু ভুল করছেন। আসুন দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানের এমন ১০টি শব্দ, যা আপনি সম্ভবত ভুলভাবে ব্যবহার করছেন।
আমরা সবাই তো আর ল্যাবরেটরিতে বসে সারাদিন গবেষণা করি না। ফলে রোজকার কথাবার্তায় বিজ্ঞানের এমন অনেক শব্দ বা পরিভাষা আমরা ব্যবহার করি, যার আসল অর্থ হয়তো পুরোপুরি ভিন্ন।
১০. প্রমাণ
দৈনন্দিন জীবনে আমরা কোনো বিল পরিশোধ করলে রিসিট দেখাই ‘প্রুফ’ হিসেবে। কিংবা বয়স প্রমাণের জন্য আইডি কার্ড দেখাই। কিন্তু আপনি যদি একজন জলবায়ু বিজ্ঞানীকে বলেন, ‘প্রমাণ করে দেখান মানুষই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী’ তাহলে তিনি হয়তো বিরক্তি নিয়ে চোখ উল্টাবেন।
কারণ বিজ্ঞানে ‘প্রুফ’ বা ‘প্রমাণ’ বলে চূড়ান্ত কিছু নেই। গাণিতিক বা লজিকের ক্ষেত্রে প্রমাণ খাটে। যেমন, পিথাগোরাসের উপপাদ্য একবার প্রমাণ হয়েছে মানে ওটা আজীবন সত্য। কিন্তু বিজ্ঞানের কাজ হলো প্রতিনিয়ত আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে ঝালিয়ে নেওয়া। আজকের কোনো প্রতিষ্ঠিত ধারণা আগামীকাল নতুন কোনো তথ্যের ভিত্তিতে বদলে যেতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা সাধারণত বলেন, তথ্য-উপাত্ত এই বিষয়টিকে ‘সাপোর্ট’ করছে, তাঁরা প্রমাণ করার দাবি করেন না।
৯. হাইপোথিসিস
স্কুল-কলেজের সায়েন্স ফেয়ারে হয়তো শেখানো হয়, হাইপোথিসিস হলো এমন একটা বিবৃতি, যাকে পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়। কিন্তু সাধারণ কথাবার্তায় আমরা হাইপোথিসিসকে অনুমান হিসেবে চালিয়ে দিই। দুটোর মধ্যে মিল আছে, কিন্তু বিজ্ঞানে হাইপোথিসিস হতে হলে সেটাকে অবশ্যই পরীক্ষাযোগ্য হতে হবে। আর মনে রাখবেন, আগের পয়েন্টের মতো হাইপোথিসিস কখনো ‘প্রমাণিত’ হয় না, এটা পরীক্ষার মাধ্যমে হয় সমর্থিত হয়, নয়তো বাতিল হয়। হাইপোথিসিস হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির একদম হামাগুড়ি দেওয়া পর্যায়।
৮. থিওরি
সাধারণ আলাপে থিওরি বা তত্ত্ব মানে হয়তো শুধুই একটা ধারণা বা খসড়া চিন্তা। কিন্তু বিজ্ঞানে ‘থিওরি’ হলো এমন এক সিস্টেম, যা বারবার পরীক্ষার মাধ্যমে টিকে আছে। মহাকর্ষ তত্ত্ব কেবল অনুমান নয়, এগুলো অসংখ্য হাইপোথিসিস, পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। সহজে বোঝার জন্য, বিজ্ঞানে ল বা সূত্র বলে দেয় কী ঘটবে (যেমন: আপেল নিচে পড়বে), আর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কেন সেটা ঘটবে (যেমন: আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি)। তাই তত্ত্বকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
সাধারণ আলাপে থিওরি বা তত্ত্ব মানে হয়তো শুধুই একটা ধারণা বা খসড়া চিন্তা। কিন্তু বিজ্ঞানে থিওরি হলো এমন এক সিস্টেম, যা বারবার পরীক্ষার মাধ্যমে টিকে আছে।
৭. মডেল
‘মডেল’ শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় আসে র্যাম্পের মডেল কিংবা খেলনা বিমান। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় মডেল হলো এমন একটি টুল বা হাতিয়ার, যা গবেষকদের ভবিষ্যৎবাণী করতে সাহায্য করে। পদার্থবিজ্ঞানে সৌরজগতের মডেল ও অর্থনীতির মডেল এক জিনিস নয়। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা ক্লাইমেট মডেল ব্যবহার করেন আবহাওয়ার ভবিষ্যৎ আচরণের পূর্বাভাস দিতে। সাধারণত কোনো জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝার জন্য কিছু বিষয় বাদ দিয়ে এই মডেল তৈরি করা হয়। তাই বিজ্ঞানের মডেল মানে শুধুই ছোট আকৃতির নকল কোনো বস্তু নয়।
৬. ন্যাচারাল বা অর্গানিক
সুপারশপের তাকে সাজানো থাকে ‘ন্যাচারাল’ ও ‘অর্গানিক’ খাবার। আমরা ভাবি এগুলোই সেরা। কিন্তু ‘ন্যাচারাল’ মানেই কি ভালো? বিষাক্ত আইভি লতা বা সাপের বিষও কিন্তু একদম ন্যাচারাল! তাই বলে কি ওগুলো সালাদে দিয়ে খাবেন? যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাচারাল’ খাবারের কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই। কৃত্রিম রং বা ফ্লেভার না থাকলেই অনেক সময় ন্যাচারাল ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ‘অর্গানিক’ শব্দটি কৃষি বা চাষাবাদের পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত। তবে রসায়নের ভাষায়, কার্বন আছে এমন প্রায় সবকিছুই অর্গানিক। সেই হিসেবে আপনার প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে বিষ পর্যন্ত সবই কেমিক্যালি অর্গানিক!
৫. জেনেটিক
কারও কোনো অদ্ভুত রোগ হলে আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কি জেনেটিক?’ আমরা আসলে জানতে চাই, রোগটা বংশগত কি না। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় জেনেটিক ও বংশগত এক জিনিস নয়। জেনেটিক মানে জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সব ক্যানসারই জেনেটিক, কারণ জিনের মিউটেশনের ফলেই ক্যানসার হয়। কিন্তু মাত্র ৫-১০ শতাংশ ক্যানসার বংশগত বা বাবা-মায়ের কাছ থেকে আসে। বাকিগুলো আমাদের জীবদ্দশায় জিনের পরিবর্তনের কারণে ঘটে। তাই সব জেনেটিক রোগই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নয়।
রসায়নের ভাষায়, কার্বন আছে এমন প্রায় সবকিছুই অর্গানিক। সেই হিসেবে আপনার প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে বিষ পর্যন্ত সবই কেমিক্যালি অর্গানিক!
৪. এক্সপোনেনশিয়াল
কোনো কিছুর বৃদ্ধি খুব দ্রুত হলেই আমরা বলে ফেলি এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ হচ্ছে বা সূচকীয় হারে বাড়ছে। কিন্তু গণিতের ভাষায়, এক্সপোনেনশিয়াল মানে বিশাল বা দ্রুত নয়। এর মানে হলো, কোনো কিছুর বৃদ্ধির হার তার বর্তমান আকারের সমানুপাতিক।
ধরুন, আমাদের অর্থনীতি বছরে ০.১ শতাংশ হারে বাড়ছে, এটাও কিন্তু এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ; যদিও এর গতি কচ্ছপের মতো! আবার অনেকে ভাবেন এক্সপোনেনশিয়াল মানেই দ্বিগুণ-তিনগুণ হারে বাড়া। পৃথিবীর জনসংখ্যা এক্সপোনেনশিয়াল হারে বাড়ছে শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভাববেন না যে কালই আমরা একে অপরের ঘাড়ে উঠে বসব। বর্তমানে এই বৃদ্ধির হার বছরে ১ শতাংশের মতো।
৩. কোয়ান্টাম
গাড়ির বিজ্ঞাপনে হয়তো দেখেছেন নতুন মডেলকে কোয়ান্টাম লিপ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। তারা বোঝাতে চায় এটা এক বিশাল উন্নতি। কিন্তু একজন পদার্থবিদ এটা শুনলে মুচকি হাসবেন। বিজ্ঞানে কোয়ান্টাম হলো শক্তির ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য একক। কোয়ান্টাম লিপ মানে ইলেকট্রনের এক শক্তিস্তর থেকে আরেক স্তরে যাওয়া, মানে সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম পরিবর্তন। তাই কোয়ান্টাম লিপ মানে বিশাল লাফ নয়, বরং ছোট্ট একটা লাফ! আবার অনেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমরা যা চাইব, তাই বাস্তবে ঘটবে।’ এটা আসলে কোয়ান্টাম ফিজিকসের অপব্যাখ্যা।
গণিতের ভাষায়, এক্সপোনেনশিয়াল মানে বিশাল বা দ্রুত নয়। এর মানে হলো, কোনো কিছুর বৃদ্ধির হার তার বর্তমান আকারের সমানুপাতিক।
২. পারসেন্ট
এই ক্রিম মাখলে ৮০ শতাংশ ফর্সা হবেন! বিজ্ঞাপনে এমন পারসেন্টেজ দেখে আমরা বিভ্রান্ত হই। কিন্তু প্রসঙ্গ ছাড়া শতাংশের কোনো মানে নেই। ধরুন, খবরে বলা হলো, ২০ বছরের আগে ৫ বার রোদে পুড়লে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি ৮০ শতাংশ বেড়ে যায়। শুনে মনে হবে সর্বনাশ!
কিন্তু আসল তথ্য হলো, এমনিতে এই ঝুঁকির হার হয়তো ২ শতাংশ। ৮০ শতাংশ বাড়া মানে সেই ঝুঁকি বেড়ে হবে ৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ১.৬ জন অতিরিক্ত আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি শুনলে মনে হয় নিশ্চিত মৃত্যু! পরিসংখ্যানের এই মারপ্যাঁচ না বুঝলে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক।
১. কার্যকারণ
আমার এক শিক্ষক বলতেন, ‘বছরের যে সময়টায় আইসক্রিম বিক্রি বাড়ে, ঠিক সেই সময়েই হাঙ্গরের আক্রমণও বেড়ে যায়।’ এখন আপনি কি বলবেন যে আইসক্রিম খেলে হাঙ্গররা ক্ষেপে যায়? নাকি হাঙ্গর তাড়া করলে মানুষের আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে?
আসল ঘটনা হলো গরমকাল। গরমে মানুষ আইসক্রিমও বেশি খায়, আবার সমুদ্রে সাঁতারও কাটতে নামে। তাই হাঙ্গরের হামলার সুযোগ বাড়ে। দুটোর মধ্যে সম্পর্ক আছে, কিন্তু একটি অন্যটির কারণ নয়।
কাজেই, হুট করে দুটো ঘটনার মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক জুড়ে দেওয়ার আগে একটু তলিয়ে দেখা ভালো। কাকতালীয় ঘটনা ও কার্যকারণ এক জিনিস নয়!