বিজ্ঞানের সঙ্গে গড়তে হবে মানুষের সেতুবন্ধন

বিজ্ঞান সত্যের সন্ধান করেছবি: আরএসিজিপি

২০২০ সালের মাঝামাঝি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাস্ক পরার নির্দেশনা পরিবর্তন করেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ল একঝাঁক পোস্ট, ‘দেখলেন তো, বিজ্ঞানীরা নিজেরাই জানে না কী বলছে!’ সরকারের দেওয়া তথ্য নিয়েও তখন চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠছে। হাসপাতালে মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সরকারি সংখ্যায় তা ধরা পড়ছে না বলে অভিযোগ উঠছে। পরিণতিতে বহু মানুষ সরকারি পরামর্শ না মেনে ভুয়া চিকিৎসার পথে হেঁটেছে। এতে কতজনের প্রাণ গেছে, তার হিসাব কেউ রাখেনি। এই ঘটনা বাংলাদেশে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সংকটটিকে উন্মোচিত করে। সংকটটি তথ্যের নয়, বিশ্বাসের।

বিজ্ঞান সত্যের সন্ধান করে। কিন্তু সেই সত্য যদি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে তা সমাজের কোনো কাজে আসে না। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলে মানুষ যদি সেটি না মানে, বন্যার সতর্কতা জারি হলে মানুষ যদি সরে না যায়, তাহলে বিজ্ঞান যতই নির্ভুল হোক, তা অর্থহীন।

বাংলাদেশে ১৭ কোটির বেশি মানুষের জীবন প্রতিদিন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত। ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক আছে কি নেই, এই বর্ষায় বন্যা হবে কতটুকু, নতুন ধানের বীজের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কতটুকু—এমন আরও অনেক। কিন্তু এই দেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস ঐতিহাসিকভাবেই দুর্বল। দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং তথ্য গোপনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মানুষকে সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে। ফলে বিজ্ঞানীর কথাও অনেক সময় মানুষ বিশ্বাস করে না, যদিও তথ্যটি সঠিক।

আরও পড়ুন
ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলে মানুষ যদি সেটি না মানে, বন্যার সতর্কতা জারি হলে মানুষ যদি সরে না যায়, তাহলে বিজ্ঞান যতই নির্ভুল হোক, তা অর্থহীন।

কাকে বিশ্বাস করে মানুষ

বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে মানুষ বিজ্ঞানীর চেয়ে ইমাম, কবিরাজ বা ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সারকে বেশি বিশ্বাস করে। এটি অশিক্ষার লক্ষণ নয়, এটি আস্থাহীনতার পরিণতি। যে প্রতিষ্ঠান বারবার মানুষকে হতাশ করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের কথায় কান দেবে না মানুষ, এটাই স্বাভাবিক।

ফেসবুক এখন দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী তথ্যমাধ্যম। সেখানে বাংলায় বিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য কণ্ঠস্বর প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ ভুয়া চিকিৎসার বিজ্ঞাপন, অলৌকিক নিরাময়ের ভিডিও এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে লাখ লাখ শেয়ারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অ্যালগরিদম এই ভুল তথ্যকে আরও ছড়িয়ে দেয়, কারণ এগুলো মানুষের আবেগকে উসকে দেয় এবং এতে প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন-আয় বাড়ে।

গবেষণাগারে সততা না থাকলে বিশ্বাস আসবে কোথা থেকে

বিশ্বাস অর্জনের শুরু হয় বিজ্ঞানের নিজের ঘর থেকে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণানৈতিকতার যে দুরবস্থা, তা সর্বজনবিদিত। থিসিসে চৌর্যবৃত্তি, মানহীন জার্নালে প্রকাশনা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক মহলের স্বার্থে পরিচালিত গবেষণা—এসব ঘটনা যখন সামনে আসে, তখন পুরো বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু সেসবের প্রয়োগ দুর্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট বা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন গবেষণানৈতিকতা বোর্ড দরকার, যেগুলো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কাজ করবে। গবেষণার তথ্য ও পদ্ধতি প্রকাশ্যে রাখতে হবে, যাতে যে কেউ তা যাচাই করতে পারে।

ছাত্ররাজনীতি এবং শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মেধার চেয়ে আনুগত্য যখন বড় হয়, তখন মানসম্পন্ন গবেষণা আশা করা যায় না। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে বিজ্ঞানে আস্থা ফিরবে না।

আরও পড়ুন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট বা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন গবেষণানৈতিকতা বোর্ড দরকার, যেগুলো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে কাজ করবে।

বিজ্ঞান প্রচারের ভাষা হতে হবে বাংলা

বাংলাদেশে বিজ্ঞান যোগাযোগের বড় ব্যর্থতা হলো ভাষার দেয়াল। দেশের বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক জার্নালে ইংরেজিতে লেখেন, কিন্তু বাংলায় সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন না। মিডিয়ায় নিবেদিত বিজ্ঞান সাংবাদিক প্রায় নেই, পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞান বিভাগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

আইসিডিডিআর,বি এর ব্যতিক্রম। করোনার সময় তারা নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন করেছে, সহজ ভাষায় তথ্য দিয়েছে, মিডিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। খাবার স্যালাইন আবিষ্কার থেকে শুরু করে কোভিড গবেষণা পর্যন্ত তাদের দশকের পর দশকের কাজ প্রমাণ করেছে, সততা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান আস্থা অর্জন করতে পারে। এই মডেল অনুসরণ করতে হবে।

কৃষিজীবন, নদীর ভাঙন, মৌসুমি বৃষ্টির হিসাব—এই পরিচিত অভিজ্ঞতার ভাষায় বৈজ্ঞানিক সত্য বললে তা মানুষের কাছে পৌঁছায়। বিজ্ঞানীদের এই দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এনজিওগুলো দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিজ্ঞান প্রচারের সুযোগ নিতে পারে।

মাটির কাছের বিজ্ঞান

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র দেখিয়েছে, বিজ্ঞান যখন সরাসরি মানুষের কাজে লাগে, তখন মানুষ তাকে বিশ্বাস করে। বন্যার পূর্বাভাস এখন লাখো কৃষক ও ইউনিয়ন পরিষদ মেনে চলে, কারণ এটি কাজ করে। এই কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জনের মডেলটি অন্যত্রও কাজে লাগানো যায়; বায়ুদূষণের তথ্য থেকে শুরু করে কৃষি গবেষণা পর্যন্ত।

উপকূলীয় জেলেরা যখন নিজেরা আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করেন, গ্রামের মানুষ যখন নদীর পানির মান পরীক্ষা করেন, তখন এই কাজগুলো যথার্থই নাগরিক বিজ্ঞানের অনুশীলন হয়ে ওঠে। এই কার্যক্রমগুলোকে জাতীয় তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে মানুষকে গবেষণার প্রশ্ন নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে বিজ্ঞানের প্রতি মালিকানার অনুভূতি তৈরি হবে এবং সেখান থেকেই জন্ম নেবে আস্থা।

আরও পড়ুন
উপকূলীয় জেলেরা যখন নিজেরা আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করেন, গ্রামের মানুষ যখন নদীর পানির মান পরীক্ষা করেন, তখন এই কাজগুলো যথার্থই নাগরিক বিজ্ঞানের অনুশীলন হয়ে ওঠে।

রাজনীতি যখন বিজ্ঞানকে গ্রাস করে

বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও রাজনীতির সম্পর্কটি বিপজ্জনক। সুন্দরবনের কাছে শিল্পকারখানার পরিবেশগত প্রভাব, ঢাকার বায়ুদূষণের সত্যিকারের মাত্রা বা তামাক কোম্পানির স্বাস্থ্যক্ষতির তথ্য—এসব ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল কীভাবে উপেক্ষিত বা বিকৃত হয়, তার নজির কম নয়। কোভিড-১৯ মহামারিতে সরকারপ্রদত্ত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছিল। এই সন্দেহ বিজ্ঞানের প্রতি জনআস্থার যে ক্ষতি করেছে, তা পূরণ করতে লাগবে আরও বহু বছর।

এর সমাধান হলো সংসদের কাছে জবাবদিহি করে এমন স্বাধীন বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা সংস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চলবে না। গবেষকদের সুরক্ষাও দরকার, যাতে তাঁরা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেও সত্য কথা বলতে পারেন।

প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেয়। ভারতে কোভিডের সময় সরকারি চাপে বিজ্ঞানীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়েছিল। পাকিস্তানে পোলিওর বিরুদ্ধে টিকা অভিযান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধায় বারবার থমকে গিয়েছিল। এই পথে বাংলাদেশ যেন না হাঁটে।

আরও পড়ুন
৬৮টি দেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করার পক্ষে। অর্থাৎ বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা পুরোপুরি শেষ হয়নি।

এগিয়ে যাওয়ার পথ

বাংলাদেশ মাথাপিছু হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু বিজ্ঞানের জটিল তথ্য সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে একটি স্বাধীন, বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংস্থা এখন জরুরি প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) কাজের ফিরিস্তি কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে তার গবেষণা প্রকাশ্যে আনতে হবে।

সরকারি অর্থে পরিচালিত গবেষণার ফলাফল মানুষের সম্পদ। এটি উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা উচিত। জাতীয় পর্যায়ে একটি গবেষণা-তথ্যভান্ডার গড়া দরকার, যেখানে সবাই প্রবেশ করতে পারবে।

৬৮টি দেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো বিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করার পক্ষে। অর্থাৎ বিজ্ঞানের প্রতি আস্থা পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু এই আস্থা ধরে রাখতে এবং যেখানে হারিয়েছে, সেখানে ফিরিয়ে আনতে বিজ্ঞানীদের, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে, সরকারকে এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আইসিডিডিআর,বি আন্তর্জাতিক বিশ্বাস অর্জন করেছে দশকের পর দশকের সততা ও নিষ্ঠায়। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছেছে কাজের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মাটিতে বিশ্বমানের বিজ্ঞান যে সম্ভব, তা প্রমাণিত। এখন এই আস্থাকে দেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

কারণ বিজ্ঞান যদি শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে থাকে আর মানুষের মনে না পৌঁছায়, তাহলে বন্যা আসবে, মহামারি আসবে, দুর্যোগ আসবে, কিন্তু মানুষ প্রস্তুত থাকবে না। সেই ব্যর্থতার দায় কেবল রাজনীতিবিদের নয়, বিজ্ঞানীদেরও।

লেখক: অধ্যাপক, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ

*মতামত লেখকের নিজস্ব

আরও পড়ুন