৪ লাখ ৩০ হাজার বছরের পুরোনো প্রাচীনতম লাঠির খোঁজে

লাঠিটি প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার লম্বাছবি: ক্যাটেরিনা হারভাতি / দিমিত্রিস মিশেলিডিস / এপি

মাটি খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাধারণত পাথরের অস্ত্র, ডাইনোসরের হাড়গোড়, কিংবা ব্রোঞ্জ বা লোহার ভাঙাচোরা জিনিস পান। কিন্তু কাঠ? কাঠ খুঁজে পাওয়া অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। কারণ, লোহায় মরিচা ধরে ঠিকই, কিন্তু কাঠ তো কয়েক বছরের মধ্যেই পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়।

কিন্তু গ্রিসে পাওয়া গেছে এমন একটি কাঠের লাঠি, যেটি মাটির নিচে টিকে আছে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার বছর! মানুষের ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন এই কাঠের হাতিয়ারটি যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা এক আশ্চর্য জাদুকর।

কী পাওয়া গেছে

গ্রিসের এক হ্রদের পাড়ে কাদার নিচ থেকে বিজ্ঞানীরা দুটি কাঠের জিনিস উদ্ধার করেছেন। একটা এই রহস্যময় লাঠি। প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার লম্বা এই চিকন লাঠিটি। দেখতে অনেকটা সাধারণ গাছের ডালের মতো মনে হলেও এটি আসলে সাধারণ নয়।

কাঠগুলো মাটির নিচে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার বছর ধরে টিকে ছিল
ছবি: ক্যাটেরিনা হারভাতি / নিকোলাস থম্পসন / এপি

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আদিম মানুষরা এটি ব্যবহার করত মাটি খোঁড়ার কাজে। হয়তো মাটির নিচে থাকা সুস্বাদু কোনো উদ্ভিদের মূল বের করতে কিংবা ছোটখাটো প্রাণী শিকার করতে এই লাঠিই ছিল তাদের ভরসা।

খুঁজে পাওয়া অন্য জিনিসটি হলো  উইলো কাঠের টুকরো। মানে উইলো বা পপলার গাছের এক খণ্ড কাঠ। এটি হাতে ধরার মতো ছোট। গবেষকদের ধারণা, পাথরের অস্ত্র তৈরি বা ধার করার সময় এই কাঠটিকে হয়তো হাতুড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, আদিম মানুষরা লাঠিগুলো ব্যবহার করত মাটি খোঁড়ার কাজে বা হয়তো মাটির নিচে থাকা সুস্বাদু কোনো উদ্ভিদের মূল বের করতে কিংবা ছোটখাটো প্রাণী শিকার করার কাজে।

কাঠ কেন পচে গেল না

এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ৪ লাখ বছর তো কম সময় নয়! কাঠ সাধারণত অক্সিজেন ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে পচে যায়। কিন্তু এই লাঠিগুলো যেখানে পাওয়া গেছে, সেই পরিবেশটাই ছিল অদ্ভুত।

লাঠিগুলো পড়েছিল একটি হ্রদের পাড়ে। সম্ভবত খুব দ্রুত এগুলো কাদা বা পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। ভেজা মাটির নিচে অক্সিজেনের অভাব থাকায় ব্যাকটেরিয়াগুলো কাঠ পচাতে পারেনি। অনেকটা প্রাকৃতিক ফ্রিজের মধ্যে সংরক্ষিত থাকার মতো অবস্থা। তাই লাখ লাখ বছর পর যখন এগুলো মাটির ওপরে এল, তখনো এদের গঠন অটুট ছিল।

কারা ব্যবহার করত এগুলো

দুঃখের বিষয় হলো, লাঠিগুলোর পাশে কোনো মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোড় পাওয়া যায়নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, ঠিক কে বা কারা এগুলো ব্যবহার করত।

তবে সময়কাল বিবেচনা করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এগুলো হয়তো নিয়ান্ডারথালদের কাজ। অথবা তাদেরও আগের কোনো পূর্বপুরুষদেরও হতে পারে। তারা আমাদের মতো হোমো সেপিয়েন্স না হলেও বুদ্ধিতে খুব একটা পিছিয়ে ছিল না। ওই একই জায়গায় বিজ্ঞানীরা পাথরের তৈরি হাতিয়ার এবং হাতির হাড়ও পেয়েছেন। সেগুলোর গায়ে কাটা দাগ আছে। অর্থাৎ, ওই লাঠির মালিকেরা যে দক্ষ শিকারি ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞানীদের মতে, লাঠিগুলো নিয়ান্ডারথালরা তাঁদের কাজে ব্যবহার করত
ছবি: ক্যাটেরিনা হারভাতি / দিমিত্রিস মিশেলিডিস / এপি

স্মিথসোনিয়ান ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যারড হুটসন অবশ্য একটা মজার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো দেখে আপনি হয়তো খুব বেশি উত্তেজিত হবেন না। কারণ এগুলো দেখতে আহামরি কোনো রাজকীয় অস্ত্র নয়, বরং সাধারণ ভাঙা ডালপালার মতো। চট করে দেখে বোঝাই যায় না যে এগুলো মানুষের তৈরি হাতিয়ার।’

কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের গবেষক অ্যানেমিক মিল্কস বলেন, ‘আমি তো এগুলো ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েই শিহরিত! লাখ লাখ বছর আগে কোনো এক আদিম মানুষ নিজের হাতে এই কাঠিটা ধরেছিল, আজ আমি সেটা ধরছি।’

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীদের মতে, লাঠিগুলো হয়তো নিয়ান্ডারথালদের কাজ। অথবা তাদেরও আগের কোনো পূর্বপুরুষদেরও হতে পারে। তারা আমাদের মতো হোমো সেপিয়েন্স না হলেও বুদ্ধিতে পিছিয়ে ছিল না।

এই আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ

আমরা সাধারণত আদিম যুগকে বলি প্রস্তর যুগ। আমাদের ধারণা, আদিম মানুষ মানেই শুধু পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাবে আর পাথরের অস্ত্র দিয়ে মারামারি করবে। কিন্তু এই লাঠি প্রমাণ করে, তারা কাঠের কারিগরি বিদ্যাতেও পারদর্শী ছিল।

শিল্পীর কল্পনায় আদিম মানুষেরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে গাছের ডালপালাও হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছিল
ছবি: জি. প্রিয়েতো / কে. হারভাতি

এর আগে জার্মানিতে কিছু কাঠের বর্শা ও চীনে ৩ লাখ বছরের পুরোনো মাটি খোঁড়ার লাঠি পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু গ্রিসের এই আবিষ্কার আরও পেছনের কথা বলছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আদিম মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে শুধু পাথর নয়, গাছের ডালপালাও ছিল বড় হাতিয়ার।

দেখতে হয়তো তুচ্ছ এক লাঠি, কিন্তু এর গায়ে লেগে আছে মানবসভ্যতার টিকে থাকার আদিম ঘ্রাণ।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও পড়ুন