বিশ্বের প্রাচীনতম শিল্পকর্মের খোঁজে

ইন্দোনেশিয়ার লিয়াং মেটান্ডুনো গুহায় আবিষ্কৃত বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গুহাচিত্রছবি: ম্যাক্সিম অবার্ট

ইন্দোনেশিয়ার এক চুনাপাথরের গুহা। পর্যটকদের আনাগোনায় সবসময় মুখর থাকে জায়গাটি। গুহার দেওয়ালে আঁকা নানা রকম পশুপাখির ছবি। তার ভিড়েই একপাশে অনাদরে পড়ে ছিল আবছা হয়ে যাওয়া একটি হাতের ছাপ। এতদিন কেউ সেভাবে খেয়ালই করেনি। অথচ গবেষকেরা এখন বলছেন, এটিই হয়তো বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গুহাচিত্র বা রক আর্ট!

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিকেরা দাবি করছেন, এই হাতের ছাপটি অন্তত ৬৭ হাজার ৮০০ বছর আগের। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি অঞ্চলের মুনা দ্বীপে অবস্থিত এই গুহাটির নাম লিয়াং মেটান্ডুনো। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক ম্যাক্সিম অবার্ট এবং অধ্যাপক অ্যাডাম ব্রাম এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার মুনা দ্বীপের লিয়াং মেটান্ডুনো গুহার প্রবেশপথ
ছবি: কার্টেসি অব রত্নো সার্দি

অধ্যাপক অবার্ট বলেন, ‘গুহাচিত্রের বয়স বের করা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু আপনি যখন সঠিক বয়সটা বের করতে পারেন, তখন চোখের সামনে এক ভিন্ন জগত খুলে যাবে। এটা যেন অতীত দেখার এক জানালা, আদিম মানুষের মনের ভেতর উঁকি দেওয়ার সুযোগ।’

এই হাতের ছাপ তৈরির পদ্ধতিটাও বেশ মজার। আদিম মানুষ মুখে গিরিমাটি গোলানো রং নিয়ে হাতের ওপর ফুঁ দিয়ে স্প্রে করত। ফলে দেওয়ালের ওপর হাতের একটা উল্টো ছাপ তৈরি হতো। বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলছি। মানুষ যখন এখনকার মতো তুলি, রং বা ক্যানভাস চিনত না, তখন প্রকৃতিই ছিল একমাত্র রংয়ের দোকান।

আরও পড়ুন
অধ্যাপক অবার্ট বলেন, ‘গুহাচিত্রের বয়স বের করা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু আপনি যখন সঠিক বয়সটা বের করতে পারেন, তখন চোখের সামনে এক ভিন্ন জগত খুলে যাবে।'

গিরিমাটি বা কাঠকয়লা পিষে গুঁড়ো করা হতো। সেই গুঁড়োর সঙ্গে পানি বা কখনো লালা মিশিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের তরল রং। তারপর মানুষ নিজের হাতটা গুহার দেয়ালে ঠেসে ধরত। মুখে সেই রং নিয়ে হাতের ওপর জোরে ফুঁ দিত। হাতের চারপাশে রং ছিটকে পড়ত, কিন্তু যেখানে হাত ছিল সেখানে রং লাগত না। ফলে দেয়ালে হাতের একটা স্পষ্ট ছাপ থেকে যেত। অর্থাৎ ভেতরটা ফাঁকা, চারপাশে রং। একে বলে নেগেটিভ হ্যান্ড প্রিন্ট।

গুহায় আবিষ্কৃত হাতের ছাপটির আঙুলগুলো বেশ সরু এবং চোখা
ছবি: আহদি আগুস অক্টাভিয়ানা

তবে সম্প্রতি পাওয়া এই ছাপটির একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। আঙুলগুলো বেশ সরু এবং চোখা। দেখে মনে হয় পাখির নখ বা অদ্ভুত কোনো প্রাণীর থাবা। গবেষকদের ধারণা, শিল্পীরা ইচ্ছে করেই আঙুলগুলো এমন সরু করে এঁকেছেন। হয়তো এর পেছনে কোনো প্রতীকী অর্থ আছে।

এই আবিষ্কার শুধু শিল্পের ইতিহাস নয়, মানুষের ভ্রমণের ইতিহাসও নতুন করে লিখছে। আদিম মানুষ কীভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে পাড়ি জমিয়েছিল, তার হদিস মিলছে এখানে। তখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অনেক কম ছিল। বোর্নিও, সুমাত্রা ও জাভা মিলে ছিল সুন্দা ভূখণ্ড। অস্ট্রেলিয়া, নিউগিনি ও তাসমানিয়া মিলে ছিল সাহুল ভূখণ্ড। গবেষকেরা মনে করছেন, আদিম মানুষেরা সুলাওয়েসি হয়ে উত্তরের পথ ধরে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল। এই গুহাচিত্র প্রমাণ করে, অন্তত ৬৫ হাজার বছর আগেই মানুষ অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে বসতি গেড়েছিল।

আরও পড়ুন
হাতের চারপাশে রং ছিটকে পড়ত, কিন্তু যেখানে হাত ছিল সেখানে রং লাগত না। ফলে দেয়ালে হাতের একটা স্পষ্ট ছাপ থেকে যেত। অর্থাৎ ভেতরটা ফাঁকা, চারপাশে রং। একে বলে নেগেটিভ হ্যান্ড প্রিন্ট।

তাহলে এই ছবি কারা আঁকল? নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, এই হাতের ছাপ হোমো সেপিয়েন্স বা আমাদের মতো বুদ্ধিমান মানুষের। কারণ, আঙুলের নকশায় যে জটিলতা আছে, তা উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়।

তবে সবাই এই কথায় একমত নন। যুক্তরাজ্যের ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল পেটিট স্পেনের গুহাচিত্র নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘একে জটিল শিল্পকর্ম বলাটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। আঙুলের এই সরু আকৃতি হয়তো অসাবধানতাবশত হয়েছে।’

স্পেনের গুহায় সংরক্ষিত নিয়ানডারথালদের হাতের ছাপের একটি প্রতিরূপ
ছবি: শাটারস্টোক

তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, ৬৪ হাজার বছর আগে স্পেনের গুহায় নিয়ানডারথালরাও এমন হাতের ছাপ এঁকেছিল। এ ছাড়া এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তখন ডেনিসোভান নামে আরেক মানব প্রজাতি বাস করত। তাই নিশ্চিত করে বলা কঠিন, এটা হোমো সেপিয়েন্সেরই কাজ।

তবে শিল্পী যেই হোক, ৬৭ হাজার বছর আগের সেই মানুষটি গুহার দেওয়ালে হাত রেখে হয়তো ভবিষ্যতের মানুষকে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে চেয়েছিল। আর আজ আমরা সেই বার্তার পাঠোদ্ধার করছি।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: লাইভ সায়েন্স ও গার্ডিয়ান ডটকম

আরও পড়ুন