টেসলা বিজ্ঞানী নাকি উদ্ভাবক

‘আবিষ্কার’ ও ‘উদ্ভাবন’ শব্দ দুটি কি একই অর্থ প্রকাশ করে?ছবি: সংগৃহীত

টেলিভিশন কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: জন লগি বেয়ার্ড!

আমেরিকা কে আবিষ্কার করেন?

উত্তর: ক্রিস্টোফার কলম্বাস!

শৈশবে তোতাপাখির মতো এসব মুখস্থ করে পরীক্ষায় দিব্যি ভালো ফল করেছি ঠিকই, কিন্তু মাথায় কখনো প্রশ্ন আসেনি, কলম্বাস ও বেয়ার্ডের কাজ কি আসলেই এক? মানে টেলিভিশন আবিষ্কার আর আমেরিকা আবিষ্কার কি একই জিনিস?

ভাবুন তো, কলম্বাস কি ল্যাবরেটরিতে বসে টেস্টটিউবে মাটি ও সমুদ্রের পানি মিশিয়ে আস্ত একটা আমেরিকা মহাদেশ বানিয়েছিলেন? নাকি জন লগি বেয়ার্ড আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কোনো এক অজানা দ্বীপে গিয়ে দেখলেন, গাছের ডালে একটা টেলিভিশন ঝুলছে এবং তিনি সেটা কুড়িয়ে নিয়ে এলেন?

কলম্বাস কি ল্যাবরেটরিতে বসে টেস্টটিউবে মাটি ও সমুদ্রের পানি মিশিয়ে আস্ত একটা আমেরিকা মহাদেশ বানিয়েছিলেন?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কথাগুলো শুনতে খুব হাস্যকর লাগছে, তাই না? কিন্তু প্রতিদিন খবরের কাগজ থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডায় আমরা ‘আবিষ্কার’ ও ‘উদ্ভাবন’ শব্দ দুটিকে গুলিয়ে ফেলি। এমনভাবে শব্দ দুটি ব্যবহার করি যেন একটা অন্যটার পরিপূরক। শুধু শব্দই নয়, আমরা গুলিয়ে ফেলি ইতিহাসের বিখ্যাত মানুষগুলোকেও।

যেমন ধরুন, নিকোলা টেসলা! তাঁকে আমরা কী বলব? বিজ্ঞানী নাকি উদ্ভাবক? তিনি কি কিছু আবিষ্কার করেছেন, নাকি উদ্ভাবন করেছেন? এসব বিষয় বোঝার আগে আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের পার্থক্যটা জেনে নিলে বাকিটা বুঝতে সুবিধা হবে।

আরও পড়ুন
নিউটন পৃথিবীতে না এলেও আপেল ঠিকই নিচের দিকেই পড়ত, আকাশে উড়ে যেত না। তিনি কেবল প্রকৃতির এই লুকিয়ে থাকা নিয়মটা সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।

ধরুন, প্রকৃতির একটা বিশাল ভল্ট বা সিন্দুক আছে, যার চাবি আমাদের কাছে নেই। এই ভল্টের ভেতরে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের নানা নিয়মকানুন, অজানা গ্রহ, মহাদেশ ও অদ্ভুত সব রহস্য। কেউ একজন যখন অনেক কষ্টে সেই ভল্টের দরজা একটুখানি খুলে ভেতরের কোনো কিছু আমাদের দেখাতে পারবেন, তখন আমরা তাকে বলব আবিষ্কার। অর্থাৎ, জিনিসটা আগে থেকেই সেখানে ছিল, আপনি কেবল তার ওপর থেকে পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছেন।

নিউটন কি মহাকর্ষ বল তৈরি করেছিলেন?
ছবি: ব্রিটানিকা

বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের সেই আপেল পড়ার বিখ্যাত গল্পটার কথাই ধরুন। নিউটন কি মহাকর্ষ বল তৈরি করেছিলেন? মোটেও না! নিউটনের জন্মের কোটি কোটি বছর আগেও পৃথিবীতে মহাকর্ষ ছিল। তিনি পৃথিবীতে না এলেও আপেল ঠিকই নিচের দিকেই পড়ত, আকাশে উড়ে যেত না। নিউটন কেবল প্রকৃতির এই লুকিয়ে থাকা নিয়মটা সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাই তিনি মহাকর্ষ বলের আবিষ্কারক। মানে তিনি একজন বিজ্ঞানী। একইভাবে কলম্বাসের আমেরিকা খুঁজে পাওয়া, আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন ছত্রাক খুঁজে পাওয়া কিংবা ডিএনএর গঠন বের করাও আবিষ্কার। প্রকৃতি এগুলো আগেই বানিয়ে রেখেছিল, আমরা শুধু খোঁজ পেয়েছি।

আরও পড়ুন
আইনস্টাইন ছিলেন একজন বিশুদ্ধ বিজ্ঞানী। তাঁর কাজ ছিল মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, সেটা খুঁজে বের করা। তিনি খাতা-কলম ও চক-ডাস্টার নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন।

অন্যদিকে, উদ্ভাবন হলো এমন কিছু, যা এই মহাবিশ্বে আগে কখনোই ছিল না। প্রকৃতির নিয়মকানুন ও মানুষের কল্পনাশক্তিকে এক করে শূন্য থেকে নতুন কিছু তৈরি করার নামই উদ্ভাবন। আদিম যুগের কোনো এক মানুষ যেদিন প্রথম একটা পাথরকে গোল করে কেটে চাকা বানাল, সেদিন সে প্রকৃতির নিয়ম বদলায়নি, বরং সেই নিয়ম কাজে লাগিয়ে নতুন একটা জিনিস বানিয়েছিল। চাকা কোনো গাছে ধরে না, মাটিতেও পুঁতে রাখা থাকে না; একে বুদ্ধি খাটিয়ে বানাতে হয়। রাইট ভাইয়েদের উড়োজাহাজ, আপনার হাতের স্মার্টফোনটি কিংবা মাথার ওপর ঘোরা ফ্যানটিও উদ্ভাবন।

আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বুঝলে আপনি খুব সহজেই একজন বিজ্ঞানী এবং একজন উদ্ভাবকের তফাতটাও ধরে ফেলতে পারবেন।

আইনস্টাইন ছিলেন একজন বিশুদ্ধ বিজ্ঞানী
ছবি: গেটি ইমেজ

এই বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য উদাহরণ হিসেবে আমরা দুই মহারথীর কথা জানব। একজন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, অন্যজন টামাস আলভা এডিসন।

আইনস্টাইন ছিলেন একজন বিশুদ্ধ পদার্থ বিজ্ঞানী। তাঁর কাজ ছিল মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, সেটা খুঁজে বের করা। তিনি খাতা-কলম ও চক-ডাস্টার নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। এভাবে একদিন তিনি আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কার করেন। আলো কীভাবে চলে, সময় কীভাবে বাঁকা হয়ে যায়; এসব তিনি অঙ্কের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। কিন্তু তিনি কি নিজের হাতে ল্যাবরেটরিতে বসে কোনো টাইম মেশিন বা গ্যাজেট বানিয়েছেন? না। তিনি শুধু প্রকৃতির নিয়মগুলো আবিষ্কার করেছেন।

আরও পড়ুন
উদ্ভাবন হলো এমন কিছু যা এই মহাবিশ্বে আগে কখনোই ছিল না। প্রকৃতির নিয়মকানুন ও মানুষের কল্পনাশক্তিকে এক করে শূন্য থেকে নতুন কিছু তৈরি করার নামই উদ্ভাবন।

অন্যদিকে, টামাস আলভা এডিসনের দিকে তাকান। তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর উদ্ভাবক। বিদ্যুৎ কীভাবে কাজ করে, তার গাণিতিক সূত্র হয়তো তিনি খুব ভালো বুঝতেন না, কিন্তু তিনি জানতেন এই শক্তিকে কীভাবে বশে আনতে হয়। বৈদ্যুতিক বাতি প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। এডিসন হাজারবার ব্যর্থ হয়ে, ল্যাবরেটরিতে ঘাম ছুটিয়ে, ফিলামেন্ট পুড়িয়ে আলো তৈরির একটি আস্ত যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন। সোজা কথায়, বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের নিয়মকানুনগুলো খুঁজে বের করেন, আর উদ্ভাবকেরা সেই নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন জিনিস তৈরি করেন।

টমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন পুরোদস্তুর উদ্ভাবক
ছবি: উইকিপিডিয়া

এবার আসি নিকোলা টেসলার কথায়। ইন্টারনেটের কল্যাণে টেসলা এখন পপ-কালচারের এক দারুণ জনপ্রিয় চরিত্র। তাঁকে নিয়ে অনেক মিথ প্রচলিত আছে। অনেকেই তাঁকে পাগলা বিজ্ঞানী বলে ডাকেন। কিন্তু টেসলা কি সত্যিই বিজ্ঞানী ছিলেন?

টেসলার জীবনী ঘাঁটলে দেখবেন, তাঁর মাথায় তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীদের মতো গাণিতিক বুদ্ধি যেমন ছিল, তেমনি হাত দুটি ছিল তুখোড় প্রকৌশলীর। তিনি শুধু প্রকৃতির নিয়ম আবিষ্কার করেই বসে থাকেননি, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সেই নিয়মগুলোকে কাজে লাগিয়ে এমন সব জাদুকরী প্রযুক্তি তৈরি করা, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন পুরোপুরি বদলে দেবে।

আরও পড়ুন
টামাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন পুরোদস্তুর উদ্ভাবক। বিদ্যুৎ কীভাবে কাজ করে, তার গাণিতিক সূত্র হয়তো তিনি খুব ভালো বুঝতেন না, কিন্তু তিনি জানতেন এই শক্তিকে কীভাবে বশে আনতে হয়।

টেসলার সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো এসি বিদ্যুৎব্যবস্থার ব্যবহারিক মডেল দাঁড় করানো। কিন্তু বিদ্যুৎ বা চৌম্বকত্ব তিনি আবিষ্কার করেননি। মাইকেল ফ্যারাডে বা জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের মতো বিজ্ঞানীরা আগেই বিদ্যুতের নিয়মকানুন আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন। কিন্তু টেসলা সেই বিজ্ঞানের জ্ঞান পুঁজি করে নিজের মাথায় একটা ঘূর্ণায়মান চৌম্বক ক্ষেত্রের ছবি আঁকেন। তারপর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে নিজের হাতে এমন এক এসি মোটর তৈরি করেন, যা আজকের আধুনিক পৃথিবীর ভিত গড়ে দিয়েছে। তিনি যদি শুধু চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে একটা থিসিস পেপার লিখে রেখে দিতেন, তবে তিনি বিজ্ঞানী হতেন। কিন্তু তিনি একটা আস্ত যন্ত্র বানিয়ে পেটেন্ট নিয়েছিলেন। তাই তিনি একজন নিখাদ উদ্ভাবক।

একটু ভেবে দেখুন তাঁর অন্যান্য কাজের কথা। টেসলা কয়েল ব্যবহার করে তিনি ঘরের ভেতরে কৃত্রিম বজ্রপাত তৈরি করতেন। ১৮৯৮ সালে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে তিনি রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে দূর থেকে একটি খেলনা নৌকা চালিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন।

১৮৯৮ সালে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে টেসলা রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে দূর থেকে একটি খেলনা নৌকা চালিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন
ছবি: টেসলা ইউনিভার্স

এটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস! তিনি রাডার, এক্স-রে এবং তারহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মতো অবিশ্বাস্য সব স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার অনেকগুলোই তিনি যন্ত্রের রূপ দিয়ে গেছেন।

টেসলার নামে প্রায় ৩০০টির মতো পেটেন্ট ছিল। মনে রাখবেন, পেটেন্ট শুধু উদ্ভাবনের জন্যই দেওয়া হয়। আপনি মহাকর্ষ বল বা অক্সিজেনের জন্য পেটেন্ট দাবি করতে পারবেন না, কারণ ওটা আপনার বানানো নয়। টেসলা পেটেন্ট পেয়েছিলেন, কারণ তিনি শূন্য থেকে যন্ত্র বানাতেন।

আরও পড়ুন
১৮৯৮ সালে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে টেসলা রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে দূর থেকে একটি খেলনা নৌকা চালিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। এটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস!

তাহলে তাঁকে নিয়ে কেন এত বিভ্রান্তি? টেসলাকে বিজ্ঞানী বলার একটা বড় কারণ হলো তাঁর চিন্তার গভীরতা। তিনি এডিসনের মতো শুধু বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতেন না। টেসলা যেকোনো যন্ত্র বানানোর আগে নিজের মস্তিষ্কের ভেতরেই সেটির থ্রিডি মডেল দাঁড় করিয়ে ফেলতেন, মনে মনেই যন্ত্রটি চালিয়ে দেখতেন কোথাও কোনো ঘর্ষণ হচ্ছে কি না! তাঁর এই অবিশ্বাস্য মানসিক ক্ষমতা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে একজন বিশুদ্ধ বিজ্ঞানীর কাতারে ফেলে দেয়।

টেসলাকে বিজ্ঞানী বলার একটা বড় কারণ হলো তাঁর চিন্তার গভীরতা
ছবি: মাই হেরিটেজ ব্লগ

কিন্তু দিন শেষে টেসলার পরিচয় হলো, তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা একজন উদ্ভাবক। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কবিতার মতো পড়তেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল জাদুটা ছিল সেই সূত্রগুলোকে লোহালক্কড় ও তামার তারের সাহায্যে বাস্তব রূপ দেওয়ায়।

তাই কেউ যদি বলে, ‘জানিস, অমুক লোকটা গতকাল একটা দারুণ জিনিস আবিষ্কার করেছে, যেটা দিয়ে সহজে রান্না করা যায়!’—তাহলে তাকে জানিয়ে দিন, ’রান্না করার যন্ত্র আবিষ্কার করা যায় না, ওটা উদ্ভাবন করতে হয়।’

সূত্র: মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডটকম ও হিস্ট্রি ডটকম

আরও পড়ুন