শিশুর ওপর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) সম্প্রতি একটি নতুন গবেষণা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, শিশুরা স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে তাদের মধ্যে আবেগিক ও আচরণগত সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার এই সমস্যাগুলোর কারণেও আরও বেশি স্ক্রিন ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে শিশুরা।
আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে। তাঁরা ১১৭টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। এতে বিশ্বজুড়ে দুই লাখ ৯২ হাজারের বেশি শিশুর তথ্য ছিল। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সাইকোলজিক্যাল বুলেটিন জার্নালে।
সমস্যা ঠেকাতে সমস্যা বাড়ছে
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল নোটেল এই গবেষণার প্রধান ছিলেন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা এখন বিনোদন, বাড়ির কাজ বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্ক্রিনে বেশি সময় ব্যয় করছে। আমরা দেখেছি, স্ক্রিন টাইম বাড়লে আবেগিক ও আচরণগত সমস্যা বাড়ে।’
আবার যেসব শিশু ইতিমধ্যেই স্ক্রিন আসক্তিতে ভুগছে, তারা সেই সমস্যা মোকাবিলার জন্য আরও বেশি স্ক্রিনের আশ্রয় নেয়। বিজ্ঞানীরা এই মেটা-বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় বোঝার চেষ্টা করেছেন। যেমন, স্ক্রিন টাইমের সঙ্গে শিশুর আক্রমণাত্মক মনোভাব, উদ্বেগ বা আত্মবিশ্বাসের অভাবের মতো সমস্যার সম্পর্ক কতটা গভীর।
তাঁরা মূলত ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর করা গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করেন। এই গবেষণায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, ভিডিও গেম, টিভি দেখা ও অনলাইনে পড়াশোনার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব সাইকোলজির সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল নোটেল বলেন, ‘শিশুরা এখন বিনোদন, বাড়ির কাজ বা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য স্ক্রিনে বেশি সময় ব্যয় করছে। আমরা দেখেছি, স্ক্রিন টাইম বাড়লে আবেগিক ও আচরণগত সমস্যা বাড়ে।’
স্ক্রিন টাইম ও আবেগীয় সমস্যার দ্বিমুখী সম্পর্ক
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যত বেশি ইলেকট্রনিক স্ক্রিনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাদের সামাজিক-আবেগীয় সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়ে। আবার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। বাহ্যিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে আক্রমণাত্মক আচরণ।
বিপরীতভাবে, যেসব শিশু আগে থেকেই সামাজিক-আবেগীয় সমস্যায় ভুগছে, তারা সেই সমস্যা মোকাবিলার একটি কৌশল হিসেবে স্ক্রিনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। গবেষকেরা এই আচরণকে প্রভাবিত করে এমন কয়েকটি কারণও চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ছোট শিশুদের যাদের বয়স পাঁচ বছর বা তার কম, তাদের তুলনায় বড় শিশুরা মানে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সীরা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে সামাজিক-আবেগীয় সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, মেয়ে শিশুরা বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে সামাজিক-আবেগীয় সমস্যায় বেশি সংবেদনশীল হয়। অন্যদিকে, ছেলে শিশুরা কোনো মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হলে স্ক্রিন ব্যবহার বাড়ানোর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ছোট শিশুদের যাদের বয়স পাঁচ বছর বা তার কম, তাদের তুলনায় বড় শিশুরা মানে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সীরা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে সামাজিক-আবেগীয় সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়।
যেমন কনটেন্ট, তেমন প্রভাব
বিজ্ঞানী নোটেলের মতে, শিশুরা স্ক্রিনে কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, তার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষামূলক বা সাধারণ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের তুলনায় ভিডিও গেমিংয়ের সঙ্গে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। যেসব শিশু আগে থেকেই সামাজিক-আবেগীয় সমস্যায় ভুগছে, তারা সমস্যা মোকাবিলার জন্য গেমসের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
বিজ্ঞানী নোটেল বলেন, ‘এই গবেষণার ফল বাবা-মায়েদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিশুদের স্ক্রিনে কী দেখার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁদের আরও সতর্ক হতে হবে। তাঁরা সময় নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ ব্যবহার করতে পারেন। তবে যে শিশুরা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করছে, তাদের শুধু বিধিনিষেধ দিলেই চলবে না। তাদের আবেগীয় সমর্থনও প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের বিজ্ঞানী ড. রবার্টা ভাসকোনসেলোসও এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, এই গবেষণা শিশুদের স্ক্রিন টাইম ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সঠিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরেছে।
তাঁর মতে, স্ক্রিন ব্যবহার ও সামাজিক-আবেগীয় সমস্যার মধ্যে এই দ্বিমুখী সম্পর্কটি বুঝতে হবে। এটি বাবা-মা, শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকদের শিশুদের স্বাস্থ্যকর বিকাশে সঠিক পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।