শ্রদ্ধাঞ্জলি
ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন, রোবট এবং আসিমভ
পেশেন্ট জিরোবিজ্ঞান কল্পগল্পের গ্র্যান্ড মাস্টার বলা হয় আইজ্যাক আসিমভকে। সাইফাইয়ের প্রতিশব্দ যেনো আসিমভ। অসংখ্য কল্পগল্প লেখকের কাছে তিনি অনুসরণীয়। শুধু কল্পবিজ্ঞানেই নয়, সাধারণ পাঠকদের জন্য বিজ্ঞানেরও বেশকিছু বই লিখেছেন তিনি। তাঁর বিজ্ঞান কল্পগল্পের মতোই সেগুলোও জনপ্রিয়। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখকের মৃত্যু আজকের এই দিনে, ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল। এই দিনে জানুন তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে…
প্রায় ২৫০ বছর আগের ঘটনা। হঠাৎ চমক জাগানো এক আবিষ্কার করে বসেন ইতালির বিজ্ঞানি লুইজি গ্যালভানি। মৃত ব্যাঙের পা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একদিন ঘটে আজব এক ঘটনা। লোহা ও তামার তার দিয়ে ব্যাঙকে স্পর্শ করতেই নড়ে ওঠে সেটি। আচমকা! একে প্রথমে ভূতুড়ে কাণ্ড ভেবে ভয় পেয়েছিলেন গ্যালভানি। পরে ধারণা করলেন, মৃত ব্যাঙের প্রাণ ফিরে এসেছে।
এ বিষয়ে তাঁর লেখা প্রতিবেদন সেকালে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। হইচই পড়ে যায় ইউরোপে। তবে শিগগিরই ভুল ভাঙে গ্যালভানির। এ নিয়ে কয়েক বছর গবেষণা করে বুঝতে পারেন, বিদ্যুত্প্রবাহের কারণে এমনটি ঘটছে। আসলে তাঁর গবেষণাগারে একটা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ছিল। সেই যন্ত্রের সংযুক্ত তার দুটি স্পর্শ করেছিল ব্যাঙটিকে। ব্যাঙের শরীরে বৈদ্যুতিক ক্রিয়ার ফলেই নড়ে ওঠে সেটি। গ্যালভনি ব্যাঙ নাচুনের আসল ব্যাখ্যা পেলেন ঠিকই, কিন্তু ততদিনে তাঁর পিঠে সেঁটে গেছে বিদ্রুপাত্মক তকমা—‘ব্যাঙ নাচানো অধ্যাপক’। আজ সেই নিন্দুকেরা টিকে নেই, আছেন গ্যালভানি। কারণ বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর আবিষ্কার আজও গুরুত্বপূর্ণ। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে, বিদ্যুৎবিষয়ক দুটি শব্দ ‘গ্যালভানিজম’, ‘গ্যালভানিজেশন’-এ জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। আবার তাঁর সম্মানে বিদ্যুত্প্রবাহ মাপার যন্ত্রের নাম দেয়া হয়েছে গ্যালভানোমিটার।
গ্যালভানির মরা ব্যাঙ নাচানো দেখে সেকালে অনেকেই ভাবলেন, জীবনের গুপ্ত রহস্য বুঝি উদঘাটিত হয়েই গেছে। এ ঘটনা শুধু বিজ্ঞান জগতেই নয়, শিল্পী আর কবি-সাতিহ্যিকদেরও প্রভাবিত করেছিল। যেমন সে সময়ের বিখ্যাত দুজন ইংরেজ কবিকেও বিষয়টি বেশ ভাবিয়েছিল। তাঁরা হলেন কবি জর্জ গর্ডন বায়রন এবং পার্সি বিশি শেলি।
বিশেষ কারণে ১৮১৬ সালের দিকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ছিলেন এই দুই কবি। সঙ্গে ছিলেন বায়রনের এক চিকিত্সক এবং শেলির বান্ধবী মেরি উলস্টোনক্র্যাফট। মেরির বয়স তখন একুশ বছর। মেরিকে সে বছরই বিয়ে করেন শেলি। এরপরই শেলির নাম যুক্ত হয়ে তাঁর নাম পরিণত হল মেরি শেলি।
যাইহোক, এক সন্ধ্যায় আড্ডা দিচ্ছিলেন তাঁরা। এ কথা সে কথার পর আড্ডায় একসময় উঠে এলো গ্যালভানির চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারের প্রসঙ্গ। আড্ডায় সিদ্ধান্ত হল, চারজনই অদ্ভুতুড়ে ও অস্বাভাবিক এই ঘটনা নিয়ে গল্প লিখবেন। অনেকটা গল্প লেখা প্রতিযোগিতার মতো। কে লিখতে পারবে সেরা হরর গল্প?
বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু বিশেষ কারণে বায়রন এবং শেলি কথা রাখতে পারলেন না। তবে মেরি এবং বায়রনের চিকিত্সক গল্প লিখলেন ঠিকই। বায়রনের চিকিত্সকের লেখা গল্পটা তেমন সাড়া জাগাতে পারল না। মেরির গল্পটা বেশ মনে ধরল সবার। ১৮১৮ সালে সেটা বই আকারে প্রকাশ করেন মেরি। প্রায় রাতারাতি সেটা পাঠকের মন জয় করে নেয়।
মেরি শেলির সেই বিখ্যাত বইটির নাম ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন। গল্পে দেখা যায়, বিজ্ঞানী ড. ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন একটা মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করেন। মৃতদেহ থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠা মানুষটির দেহ ছিল বিশালকৃতির। চেহারাটা কদাকার ও বেঢপ। যাকে কিম্ভুতাকিমাকার দানবের সঙ্গেই কেবল তুলনা করা চলে। এই আবিষ্কার এক সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনের। ভীষণ আতঙ্কে একপর্যায়ে ওই দানবকে তাড়িয়েও দেন। কিন্তু হতাশা আর ক্ষোভে ড. ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন ও তাঁর পরিবারের ওপর রক্তাক্ত প্রতিশোধ নিয়েছিল দানবটি। ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন পাঠকদের বলেছিল, কৃত্রিম জীবন সৃষ্টি করা ভয়ঙ্কর।
মেরির এ বইটিকেই প্রথম সার্থক বিজ্ঞান কল্পকাহিনি হিসেবে ধরা হয়। সেকালের নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে লেখা হলেও গল্পটির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। পরের একশ বছরে বিজ্ঞান কল্পগল্প লেখা হলেও সেগুলোর কোনটাই ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন-এর মতো নাম কুড়াতে পারেনি।
দীর্ঘ বিরতির পর, ১৯২০ সালে চেকোস্লাভিয়ান লেখক ক্যারেল চ্যাপেক আর.ইউ.আর. নামে একটি নাটক লেখেন। পরের বছর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। নাটকে রোসাম নামের এক লোক চাবি দেয়া স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বানাতেন, যেগুলো দেখতে মানুষের মতই। মানবজাতিকে শ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতেই এদের বানানো হয়েছিল। সে উদ্দেশ্য শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়। শিগগিরই ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনের দানবের মত সেই যন্ত্রমানবরা ভয়ঙ্কর হয়ে পৃথিবী থেকে মানবজাতিকে চিরতরে মুছে ফেলে। তবে বেঁচে যান রোসাম।
আর.ইউ.আর. (R.U.R.) আদ্যাক্ষর দিয়ে রোসামের কারখানার নাম বোঝানো হয়েছিল, যার পূর্ণ অর্থ রোসাম’স ইউনিভার্সাল রোবটস (Rossum’s Universal Robots)। চেক ভাষায় রোবট (robot) অর্থ ‘অনৈচ্ছিক কর্মী’ বা ‘ক্রীতদাস’। তাই এ নাটকের কল্যাণে কালক্রমে রোবট শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘কৃত্রিম মানুষ’। এখন স্বচালিত যন্ত্র বোঝাতে প্রায় সব ভাষাতেই ‘রোবট’ শব্দটি ব্যবহার হয়।
দুই
বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে পাল্লা দিয়ে এরপর বাড়তে থাকে বিজ্ঞান কল্পগল্পের জনপ্রিয়তা । ১৯২৬ সালে পুরোপুরি বিজ্ঞান কল্পগল্প নির্ভর প্রথম ম্যাগাজিন অ্যামেজিং স্টোরিজ প্রকাশিত হয়। পাঠকদের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া যেতে থাকে। সেটা দেখে কয়েক বছরের মধ্যে প্রকাশিত হতে থাকে একই ধরনের আরও কটি ম্যাগাজিন। এতে বছরে কয়েক শত বিজ্ঞান কল্পকাহিনি প্রকাশিত হত, যার অনেকগুলোর বিষয়বস্তু ছিল রোবট। তবে বেশিরভাগ লেখকই মেরি শেলি আর চ্যাপেকের প্রভাব এড়াতে পারেননি। তাই প্রায় সব বিজ্ঞান কল্পগল্পেই রোবটকে ভয়ঙ্কর বা খুনে চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হত।
ঠিক এই সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আবির্ভাব হল এক তরুণ লেখকের। পুরনো এই ছকের বাইরে অন্য ধরনের রোবটের গল্প লেখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর নাম আইজাক আসিমভ।
রাশিয়ায় এক ইহুদি পরিবারে জন্মেছিলেন আইজ্যাক আসিমভ (বা আজিমভ)। ১৯২০ সালের ২ জানুয়ারি। জায়গাটা তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের পেট্রোভিচি রাজ্যে। বর্তমানে এই রাজ্যটি বেলারুশ প্রজাতন্ত্রের একটি প্রদেশের অন্ত্মর্ভুক্ত। আসিমভের বাবা জুডাহ আসিমভ এবং মা আন্না রাচেল বের্মান তাদের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন আইজাক ইউদোভিচ আসিমভ। আসিমভ তার পারিবারিক ও বংশীয় উপাধি। এটি এসেছে রাশিয়ান ভাষার শব্দ ওজিমিয়ে থেকে, যা শীতকালীন এক শস্যের নাম। আইজাক আসিমভের বাবার দাদা এই শস্য চাষ করতেন। শব্দটি কিছুটা রূপান্তরিত হয়ে আসিমভ শব্দটি উত্পন্ন হয়েছে।
সেসময় রাশিয়ার ক্ষুদ্র কারখানা মালিক শ্রেণির সদস্য ছিল আসিমভের পরিবার। তাই ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক শাসন চালু হলে অনেকটা বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায় তাঁদের পরিবার। আইজাক আসিমভের বয়স তখন মাত্র তিন বছর। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনেই কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। এই শহরেই তার পড়ালেখার হাতেখড়ি। ছোট্টবেলা থেকেই তিনি প্রতিভার সাক্ষর রাখতে শুরু করেন আসিমভ। মাত্র ৫ বছর বয়সে প্রায় নিজে নিজেই পড়তে শিখে যান। তার স্মৃতিশক্তিও ছিল বেশ ভালো। তাই ষোল পেরোবার আগেই পেরিয়ে গিয়েছিলের স্কুলের গণ্ডি।
আসিমভের লেখালেখির আগ্রহও সেই ছোটবেলা থেকেই। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ছোট্ট একটি ক্যান্ডি স্টোর চালাত তাঁর পরিবার। অবসরে আসিমভও সেখানে কাজ করতেন। ওই দোকানেই প্রথম সস্তা ও সেকালের জনপ্রিয় সব পত্রপত্রিকার সাথে পরিচিত হন তিনি। বাবার নিষেধ সত্ত্বেও অবসরে লুকিয়ে সেসব পাল্প ম্যাগাজিন গ্রোগ্রাসে গিলতে থাকেন। এর প্রভাবে একসময় নিজেই গল্প লেখা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১১ বছর। লেখালেখির আগ্রহ দেখে টাইপরাইটার কিনে দেন তাঁর বাবা। এই টাইপরাইটার তাঁর জীবনের সবসময়ের সঙ্গী বনে যায়। ১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লিখতে শুরু করেন আসিমভ। গল্পটির নাম কসমিক কর্কস্ক্রু।
১৯৩৮ সালে গল্পটি লেখা শেষ করেন আসিমভ। প্রথম গল্প লেখার তীব্র উত্তেজনায় যা হয় আর কি! সাতপাঁচ না ভেবেই গল্পটি সেকালের বিখ্যাত বিজ্ঞান কল্পকাহিনির পত্রিকা অ্যাসটাউন্ডিং-এর সম্পাদক ডব্লিউ ক্যাস্পবেলের কাছে নিয়ে যান তিনি। গল্পটি স্রেফ বাতিল করে দেন সম্পাদক। সাথে আসিমভকে বিনামূল্যে কিছু উপদেশও দেন ক্যাম্পবেল। শুধু প্রথমটিই নয়, পর পর ১২টি গল্প বাতিল করেন অ্যাসটাউন্ডিং-এর সম্পাদক।
একের পর এক ব্যর্থতার পরও হতাশ না হয়ে লেখা চালিয়ে যান আসিমভ। পরের বছর অন্যান্য পত্রিকায় গল্প বিক্রি করতে শুরু করেন তিনি। অবশেষে আসিমভের লেখা ৩২তম গল্পটি ছেপেছিল অ্যাসটাউন্ডিং। গল্পটির নাম নাইটফল। এই গল্পটিকে বলা হয় সর্বকালের সেরা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী।
এরপর অ্যাসটাউন্ডিং পত্রিকায় নিয়মিত লেখক আর ক্যাম্পবেলের বিশ্বস্ত বন্ধু বনে যান আসিমভ। ১৯৩৯ সালে নতুন ধরনের রোবটের গল্প লেখেন আসিমভ। সেই গল্পে রোবট এক সাধারণ যন্ত্র, যাকে নিদিষ্ট কাজের জন্য বানানো হয়েছিল। এছাড়া রোবটটি আগে থেকেই রক্ষাকবচসহ তৈরি করায় সে কারো ক্ষতি করতে পারত না। রোবটের এই নতুন ধাঁচের কাহিনী দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন লেখক আসিমভও।
তাঁর গল্পের রোবটে আগে থেকেই ঢুকিয়ে দেয়া সেই রক্ষাকবচকে ডাকা হতে লাগল, ‘রোবোটিকসের তিনটি সূত্র’ হিসেবে। এখন রোবট সংক্রান্ত প্রায় গল্পেই এ তিনটি সূত্র থাকে। সূত্রগুলো হচ্ছে: ১. রোবট কখনো মানুষের ক্ষতি করবে না বা কোনো মানুষের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না। ২. রোবট অবশ্যই মানুষের নির্দেশ মেনে চলবে, যদি না সেই নির্দেশ প্রথম সূত্রকে লঙ্ঘন করে। ৩. রোবট সবসময় নিজেকে রক্ষা করবে, যদি না তা প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্রকে লঙ্ঘন করে।
আসিমভ রোবোটিকসের তিনটি সূত্র প্রথম উল্লেখ করেছিলেন ১৯৪২ সালে প্রকাশিত রানঅ্যারাউন্ড গল্পে। এ গল্পের মাধ্যমে রোবোটিকস শব্দটিও প্রথমবার ছাপার অক্ষরে দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে রোবট নিয়ে পড়ালেখা, নকশা, রোবট বানানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও রোবট মেরামত বোঝাতে এ শব্দটি ব্যবহার হয়।
এই তিনটি সূত্রই ছিল রোবট নিয়ে মানুষের আতঙ্কের অবসানে প্রথমবার কোন সত্যিকারের প্রচেষ্টা। আসিমভের ভাষায় রোবট নিয়ে মানুষের এ আতঙ্কের নাম ‘ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন কমপ্লেক্স’। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। আসিমভের রোবটের গল্পের কারণে পুরনো ধাঁচের রোবটের গল্প একসময় অচল হয়ে পড়ে। এতে অনেকেই সেকেলে ধাঁচের রোবটের গল্প লেখা বন্ধ করে দেন। পাশাপাশি রোবটকে তারা নিরীহ ও উপকারী, এমনকি ভালোবাসার যোগ্য চরিত্র হিসেবে গল্পে তুলে ধরতে শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রে C3PO আর R2D2 নামের দুটি রোবট দেখা গিয়েছিল, যারা কেড়েছিল দর্শকদের সব মনোযোগ।
তবে বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নিজে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না। আসলে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীকে একেবারে আনকোরা এক ধরনের রূপকথা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। নতুন এই রূপকথা লেখা হয় জাদু, মন্ত্র আর অলৌকিক ঘটনার বদলে প্রকৃতি আর বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, জাদু আর অলৌকিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রূপকথা সম্ভবত কখনোই সত্যি হয় না। কিন্তু প্রাকৃতিক ঘটনা আর বিজ্ঞানকে পুঁজি করে লেখা রূপকথা অনেক সময় সত্যিও হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নামের এই রূপকথা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের উত্সাহ যোগায়। গল্পে বর্ণিত কোন উন্নত কিছু নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন তারা। উদাহরণ হিসেবে ১৯৫০ সালের এক ঘটনার কথা বলা যায়। সেবছর রোবট নিয়ে আসিমভের লেখা নয়টি গল্প একত্রিত করে আই, রোবট নামে বই প্রকাশিত হয়েছিল। তুমুল জনপ্রিয়তা পেল বইটি।
বইটির প্রথম দিকের পাঠক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোসেফ এফ. এঞ্জেলবার্গার। এটি পড়ে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন তিনি। বাকি জীবন রোবটের পিছনে উত্সর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে প্রকৌশলী জর্জ ডেভোলের সাথে যৌথভাবে বিশ্বের প্রথম রোবট কারখানা খোলেন তিনি; নাম ইউনিমেশন ইনকর্পোরেট। তাঁকে বলা হয় রোবটিকসের জনক।
এ প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্বের প্রথম রোবট তৈরি হয়েছিল, যা শিল্পকারখানায় উত্পাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়। সেই ছিল শুরু, এখন তো সারা বিশ্বে ঘর ঝাড়ু দেয়া থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণায় রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্তমানে যারা রোবোটিকস নিয়ে কাজ করেন, তাদের অধিকাংশই আই, রোবট পড়েছেন এবং বইটি দিয়ে প্রভাবিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আইজ্যাক আসিমভ রোবট নিয়ে কোন কাজ বা গবেষণা করেননি, শুধু তাদের নিয়ে গল্প লিখতেই পছন্দ করতেন। তবুও রোবটের ইতিহাসে তার নাম স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
এখানেই শেষ নয়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতে বিশেষ অবদানের জন্য আসিমভকে ডাকা হয় গ্রান্ড মাস্টার অব সায়েন্স ফিকশন। ১৯৮৭ সালে সায়েন্স ফিকশন রাইটার্স এসোসিয়েশন অব আমেরিকা তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া বিজ্ঞান কল্প কাহিনি লেখার কারণে মোট চারবার হুগো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। পেয়েছেন নেবুলা পুরস্কারসহ আরও অসংখ্য পুরস্কার। আসিমভের প্রতি সম্মান দেখাতে তাঁর নামেও একাধিক পুরস্কার চালু রয়েছে। এছাড়া তার নামে নিয়মিত প্রকাশিত হয় একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ম্যাগাজিন। তাঁকে সম্মান জানাতে ১৯৮১ সালে একটি গ্রহাণুর নাম রাখা হয় ৫০২০ আসিমভ। আবার মঙ্গলগ্রহের একটি খাদের নামও রাখা হয়েছে আসিমভ। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর গ্র্যান্ডমাস্টার আইজ্যাক আসিমভ মারা যান ১৯৯২ সালের আজকের এই দিনে।
আইজ্যাক আসিমভের মৃত্যুদিবসে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।