গণিতে প্রাচীন সভ্যতার পুরস্কারের ইতিহাস

সমস্যাই গণিতের প্রাণ। একটি ভালো সমস্যা দেখিয়ে দেয়, গণিতে এখনো কী জানা বাকি। তাই যুগে যুগে কঠিন সব গাণিতিক সমস্যাকে ঘিরে ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিতে নানা সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে নানা লোভনীয় পুরস্কার। এসব পুরস্কারকে ঘিরেই জন্ম নিয়েছে গণিতের ইতিহাসের অনেক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। আজ প্রাচীন সভ্যতার পুরস্কারের ইতিহাস জানা যাক।

গণিতে পুরস্কার দেওয়া বা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার রেওয়াজ অনেক পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক গণিতে ধ্রুপদি তিনটি সমস্যা ছিল। প্রথমটি হলো, একটি ঘনকের ঠিক দ্বিগুণ আয়তনের আরেকটি ঘনক তৈরি করা। দ্বিতীয়টি, যেকোনো কোণকে সমান তিন ভাগে ভাগ করা। আর তৃতীয়টি, একটি বৃত্তের সমান ক্ষেত্রফলের বর্গক্ষেত্র আঁকা।

ইউক্লিড তাঁর এলিমেন্টস বইয়ে শুধু রুলার ও কম্পাস ব্যবহার করে জ্যামিতিক নির্মাণের নিয়ম নির্ধারণ করেছিলেন। তাই ধরে নেওয়া হয়, এই সমস্যাগুলোও শুধু রুলার ও কম্পাস দিয়েই সমাধান করতে হবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, শুধু এই দুটি জিনিস দিয়ে এগুলো সমাধান করা অসম্ভব! প্রাচীন গ্রিকরাও এটা জানতেন। তাই তাঁরা নানা রকম অদ্ভুত বক্ররেখা ও নতুন সব পদ্ধতি বের করেছিলেন। স্বয়ং আর্কিমিডিসের মতো গণিতবিদও এসব সমস্যা সমাধানের নেশায় মেতেছিলেন।

এই সমস্যাগুলো তখন সাধারণ মানুষেরও দারুণ মনোযোগ কেড়েছিল। প্লেটোর মেনো সংলাপে সক্রেটিস প্রশ্ন করতে করতে একজন ক্রীতদাস বালককে একটি বর্গক্ষেত্রের দ্বিগুণ ক্ষেত্রফলের আরেকটি বর্গক্ষেত্র নির্মাণ করিয়েছিলেন। আবার প্লেটোর রিপাবলিক ও পরবর্তী গ্রিক ঐতিহ্যে একটি জনপ্রিয় কাহিনি পাওয়া যায়। একবার ডেলস দ্বীপে ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়লে দেবতা অ্যাপোলোর ওরাকল নাকি নির্দেশ দিয়েছিল, তাঁর ঘনকাকৃতির বেদির আয়তন দ্বিগুণ করতে হবে। কিন্তু বেদির আকার যেন একই রকম থাকে। সেই নির্দেশ থেকেই জন্ম নেয় বিখ্যাত ঘনক দ্বিগুণ করার সমস্যা। গ্রিকরা বিশ্বাস করত, এই কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারলেই দেবতারা সন্তুষ্ট হবেন এবং মহামারির অবসান ঘটবে।

আরও পড়ুন
ইউক্লিড তাঁর এলিমেন্টস বইয়ে শুধু রুলার ও কম্পাস ব্যবহার করে জ্যামিতিক নির্মাণের নিয়ম নির্ধারণ করেছিলেন। তাই ধরে নেওয়া হয়, এই সমস্যাগুলোও শুধু রুলার ও কম্পাস দিয়েই সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে, বৃত্তের সমান বর্গক্ষেত্র আঁকার বিষয়টি তখন ‘অসম্ভব’ শব্দের সমার্থক হয়ে গিয়েছিল! প্লেটোর সমসাময়িক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনেস তাঁর এক নাটকে এমন এক চরিত্র এনেছিলেন, যে দাবি করত সে বৃত্তকে বর্গক্ষেত্র বানাতে পারে। তা শুনে এথেন্সের দর্শকেরা হাসিতে ফেটে পড়ত!

কোনো অসাধারণ সমস্যার সমাধান করা মানেই চিরস্থায়ী সম্মান। যেমনটা ঘটেছিল ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে, ইতালিতে। ১৫৩৫ সালে আন্তোনিও ফিওর নামে এক গণিতবিদ নিকোলো টার্টাগ্লিয়াকে এক তুমুল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তিনি টার্টাগ্লিয়াকে ত্রিঘাত সমীকরণের ৩০টি সমস্যা দেন। ফিওর এই সমাধানের পদ্ধতিটি শিখেছিলেন বোলোগনার গণিতবিদ সিপিওন দেল ফেরোর কাছ থেকে। তিনিই মূলত এটি আবিষ্কার করেছিলেন।

তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিযোগিতার দুই মাস আগে দুই প্রতিযোগীকেই একে অপরকে ৩০টি করে সমস্যা পাঠাতে হতো। যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশি সমস্যার সমাধান করতে পারত, বিজয়ী হতো সে-ই। টার্টাগ্লিয়াও ফিওরের জন্য ৩০টি সমস্যা তৈরি করে পাঠালেন। কিন্তু সব সমস্যাই ছিল একই ধরনের, ত্রিঘাত সমীকরণ নিয়ে। প্রথমে তিনি বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেও হাল ছাড়েননি। দিন-রাত এক করে চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। অবশেষে প্রতিযোগিতার মাত্র এক দিন আগে তিনি হঠাৎ করেই সেই সমীকরণ সমাধানের কৌশল আবিষ্কার করে ফেলেন।

আরও পড়ুন
১৫৩৫ সালে আন্তোনিও ফিওর নামে এক গণিতবিদ নিকোলো টার্টাগ্লিয়াকে এক তুমুল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। তিনি টার্টাগ্লিয়াকে ত্রিঘাত সমীকরণের ৩০টি সমস্যা দেন।

প্রতিযোগিতার দিনে তিনি শুধু ফিওরের ৩০টি সমস্যারই সমাধান করেননি, অল্প সময়েই সবগুলোর উত্তর দিয়ে সবাইকে হতবাক করে দেন। অন্যদিকে ফিওর টার্টাগ্লিয়ার পাঠানো সমস্যাগুলোর একটিও ঠিকমতো সমাধান করতে পারেননি। ফলে টার্টাগ্লিয়াই জিতে নেন প্রতিযোগিতা। পুরস্কার হিসেবে অর্থের পরিবর্তে তিনি বন্ধুদের নিয়ে ৩০টি জমকালো ডিনারের আপ্যায়ন। মানে তিনি ৩০টি দাওয়াতে বন্ধুদের নিয়ে খাওয়াদাওয়ার সুযোগ পান। ইতালির রেনেসাঁ যুগে এটি ছিল সম্মান ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।

তখনকার দিনে এসব প্রতিযোগিতা হতো খুব গোপনীয়। সবাই শুধু সমাধান দেখাতেন, সমাধানের পথটি কাউকে বলতেন না। টার্টাগ্লিয়া পরে জিরোলামো কার্ডানো নামে একজনকে গোপনে তাঁর পদ্ধতিটি শিখিয়েছিলেন। কিন্তু কার্ডানো কথা রাখেননি। ১৫৪৫ সালে তিনি তাঁর আরস ম্যাগনা বইয়ে পদ্ধতিটি প্রকাশ করে দেন।

কার্ডানোর যুক্তি ছিল, এই পদ্ধতির আসল আবিষ্কারক তো দেল ফেরো, টার্টাগ্লিয়া নন। তাই এটি লুকিয়ে রাখার কোনো অধিকার টার্টাগ্লিয়ার নেই! কার্ডানো এখানেই থামেননি। তিনি সব ধরনের ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করেন। তাঁর ছাত্র ফেরারি তো একধাপ এগিয়ে চতুর্ঘাত সমীকরণও সমাধান করে ফেলেন!

আরও পড়ুন
টার্টাগ্লিয়া পরে জিরোলামো কার্ডানো নামে একজনকে গোপনে তাঁর পদ্ধতিটি শিখিয়েছিলেন। কিন্তু কার্ডানো কথা রাখেননি। ১৫৪৫ সালে তিনি তাঁর আরস ম্যাগনা বইয়ে পদ্ধতিটি প্রকাশ করে দেন।

গণিতবিদদের মধ্যে একে অপরকে কঠিন সমস্যা ছুড়ে দেওয়ার রেওয়াজ তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল। নতুন কোনো পদ্ধতি বা তত্ত্বের শক্তি যাচাই করার এটিই ছিল অন্যতম উপায়। ১৬৯৬ সালের জুন মাসে সুইস গণিতবিদ জোহান বার্নোলি ইউরোপের গণিতবিদদের উদ্দেশে একটি বিখ্যাত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। সমস্যাটির নাম ব্র্যাকিস্টোক্রোন সমস্যা। প্রশ্নটি ছিল, দুটি নির্দিষ্ট বিন্দুর মধ্যে এমন একটি বক্ররেখা কী হতে পারে, যার ওপর দিয়ে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে কোনো বস্তু সবচেয়ে কম সময়ে নিচে নেমে আসবে? দেখতে সহজ মনে হলেও, সে সময়ের জন্য এটি ছিল ক্যালকুলাসের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি।

বার্নোলির এই চ্যালেঞ্জের পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্যও ছিল। তখন নিউটন ও লিবনিজের মধ্যে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছিল। বার্নোলি ছিলেন লিবনিজের সমর্থক। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের গণিতবিদেরা, বিশেষ করে নিউটন এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন কি না।

কিন্তু ফল হলো উল্টো। রাজকীয় টাকশালের দায়িত্বে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও আইজ্যাক নিউটন এক সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে সমস্যাটি নিয়ে বসলেন। কাজ করলেন সারা রাত। পরদিন ভোর হওয়ার আগেই পুরো সমাধান লিখে ফেলেন। পরে সমাধানটি বেনামে প্রকাশিত হয়। কিন্তু সমাধানটি দেখেই বার্নোলি বুঝে ফেলেন, এটি নিউটনেরই লেখা। তখন তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত মন্তব্যটি করেছিলেন, ‘আমি সিংহকে তার থাবা দেখেই চিনতে পারি।’

সূত্র:

১. কিথ ডেভলিন, দ্য মিলেনিয়াম প্রবলেমস (বেসিক বুকস)

২. জাফে, আর্থার এবং অ্যান্ড্রু ওয়াইলস (সম্পা.); দ্য মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমস (আমেরিকান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি)

৩. ক্লে ম্যাথ ডটঅর্গ/মিলেনিয়াম প্রবলেমস

৪. ম্যাথ সোসাইটি ডটকম

৫. ওয়ার্ল্ড অব ম্যাথমেটিকস ডটকম

আরও পড়ুন