ছক্কার সাহায্যে মিলল ১৫০ বছরের পুরোনো গাণিতিক রহস্যের সমাধান
আপনার চারপাশের বাতাসে এই মুহূর্তে কী হচ্ছে? অসংখ্য অণু-পরমাণু এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এগুলো কখন কোথায় যাবে, তা আগে থেকে বলা একেবারে অসম্ভব। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন। কীভাবে? বোলজম্যান ডিস্ট্রিবিউশন নামের একটি নিয়মের সাহায্যে। প্রতিটি অণুর আলাদা অবস্থান না মেপে তাঁরা পুরো সিস্টেমটা কী অবস্থায় থাকতে পারে, তার একটা সম্ভাবনা বের করেন। ব্যাপারটা অনেকটা ছক্কা ছোঁড়ার মতো। একবার ছক্কা ছুঁড়লে কী উঠবে তা কেউ জানে না। কিন্তু বারবার ছুঁড়লে একটা নির্দিষ্ট ছক ঠিকই চোখে পড়ে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ও গণিতবিদ লুডভিগ বোলজম্যান এই চমৎকার নিয়মটি আবিষ্কার করেছিলেন। আজ ১৫০ বছর পরও এই সূত্রটি সমান জনপ্রিয়। শুধু পদার্থবিজ্ঞান নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে শুরু করে অর্থনীতি—সব জায়গায় এর অবাধ বিচরণ। অর্থনীতিতে একে বলা হয় মাল্টিনোমিয়াল লজিট মডেল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল অর্থনীতিবিদ এই পুরোনো নিয়মটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছিলেন। তাঁরা পৌঁছালেন এক অভাবনীয় সিদ্ধান্তে! তাঁদের গবেষণা দেখাল, যে সিস্টেমগুলো স্বাধীন বা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল নয়, সেগুলোকে ব্যাখ্যা করার জন্য বোলটজম্যানের এই সূত্রটির কোনো বিকল্প নেই।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বোলজম্যান ডিস্ট্রিবিউশন নামে চমৎকার একটি নিয়ম আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ও গণিতবিদ লুডভিগ বোলজম্যান।
কিন্তু স্বাধীন সিস্টেম বলতে কী বোঝায়? ধরুন, একজন অর্থনীতিবিদ গবেষণা করছেন মানুষ কোন ব্র্যান্ডের জুস খায় তা নিয়ে। এখন কেউ যদি বলে, ওই ব্যক্তি কোন ব্র্যান্ডের কাপড় কাচার সাবান কিনল বা কোন রঙের শার্ট পরল, তার ওপর জুস কেনা নির্ভর করছে! তাহলে ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত শোনাবে না? একটির সঙ্গে তো আরেকটির কোনো সম্পর্কই নেই। ক্যালটেকের অধ্যাপক ওমের তামুজ ঠিক এই প্রশ্নটাই তুলেছিলেন। অপ্রাসঙ্গিক বা স্বাধীন বিষয়গুলো যখন একে অপরের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলে না, তখন তাকে আমরা কীভাবে গাণিতিক মডেলে ফেলব? বোলটজম্যানের নিয়মে এটা খুব নিখুঁতভাবে কাজ করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানতে চাইলেন, পৃথিবীতে কি এমন আর কোনো সূত্র আছে, যা এই কাজটা ঠিকঠাক করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা ছক্কার সাহায্য নিলেন। একটি সাধারণ ছক্কায় ১ থেকে ৬ পর্যন্ত সংখ্যা থাকে। প্রতিটি সংখ্যা ওঠার সম্ভাবনাই ছয় ভাগের এক ভাগ। এখন যদি আপনি দুটি ছক্কা একসঙ্গে ছোঁড়েন এবং তাদের যোগফল হিসাব করেন, তবে কী হবে? কিছু যোগফল খুব কম উঠবে, আর কিছু উঠবে বেশি। যেমন, দুটি ছক্কায় ১ উঠলেই কেবল যোগফল ২ হবে। এর সম্ভাবনা হলো ৩৬ বারের মধ্যে মাত্র ১ বার। কিন্তু যোগফল ৮ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটি ৩৬ বারের মধ্যে ৫ বার উঠতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, একটি ছক্কার ফলাফলের সঙ্গে অন্য ছক্কার ফলাফলের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো পুরোপুরি স্বাধীন।
যদি আপনি দুটি ছক্কা একসঙ্গে ছোঁড়েন এবং তাদের যোগফল হিসাব করেন, তবে কিছু যোগফল খুব কম উঠবে, আর কিছু উঠবে বেশি। যেমন, দুটি ছক্কায় ১ উঠলেই কেবল যোগফল ২ হবে।
এই স্বাধীন ব্যাপারটিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে গবেষকেরা এক অদ্ভুত ছক্কার সাহায্য নিলেন। এর নাম সিচারম্যান ডাইস বা পাগলা ছক্কা! ১৯৭৭ সালে জর্জ সিচারম্যান নামে এক পাজল ডিজাইনার এটি বানিয়েছিলেন। এই ছক্কার গায়ে সাধারণ সংখ্যা লেখা থাকে না। প্রথম ছক্কায় লেখা থাকে ১, ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ৮। আর দ্বিতীয় ছক্কায় থাকে ১, ২, ২, ৩, ৩ এবং ৪। ছক্কা দুটি দেখতে খুবই অদ্ভুত। কিন্তু আসল জাদুটা লুকিয়ে আছে এদের ফলাফলে। আপনি যদি এই দুটি ছক্কা একসঙ্গে ছোঁড়েন এবং যোগফল হিসাব করেন, তবে ফলাফল একটি সাধারণ জোড়া ছক্কার মতোই আসবে! যোগফল ২ হওয়ার সম্ভাবনা সেই ৩৬ ভাগের ১ ভাগই থাকবে। আবার ৮ হওয়ার সম্ভাবনাও ৩৬ ভাগের ৫ ভাগই থাকবে!
এই অদ্ভুত ছক্কাগুলো তামুজ এবং স্যান্ডোমিরস্কির হাতে এক দারুণ অস্ত্র তুলে দিল। তাঁরা বিভিন্ন গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে সাধারণ ছক্কা এবং এই পাগলা ছক্কার ফলাফল মেলানোর চেষ্টা করলেন। যদি কোনো সূত্র দুটি ক্ষেত্রেই একই যোগফলের সম্ভাবনা দেখাতে পারে, তবে তা পরীক্ষায় পাস করবে। আর যদি ফলাফল আলাদা হয়, তবে বুঝতে হবে ওই সূত্রে কোনো গলদ আছে। বিজ্ঞানীরা শুধু একজোড়া পাগলা ছক্কা নিয়েই বসে থাকলেন না। তাঁরা গাণিতিকভাবে অসীমসংখ্যক অদ্ভুত ছক্কার জোড়া তৈরি করলেন! এরপর তাঁরা পদ্ধতিগতভাবে সব কটি সূত্র পরীক্ষা করে দেখলেন। ফলাফল কী এল জানেন? সব বিকল্প সূত্রই বাতিল হয়ে গেল! প্রমাণিত হলো, বিজ্ঞানীদের দেড় শ বছর ধরে ব্যবহার করা বোলটজম্যানের সূত্রটিই একমাত্র কাঠামো, যা সব সময় নিখুঁতভাবে কাজ করে।
১৯৭৭ সালে জর্জ সিচারম্যান নামে এক পাজল ডিজাইনার সিচারম্যান ডাইস বা পাগলা ছক্কা বানিয়েছিলেন। এই ছক্কার গায়ে সাধারণ সংখ্যা লেখা থাকে না।
পুরো এই গাণিতিক সমস্যাটিকে পলিনোমিয়াল বা বহুপদী সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা যায়। আমরা সাধারণত বীজগণিতে f(x) = x+ 3x2+ x3 সমীকরণ দেখি। এখানকার প্রতিটি সম্ভাবনার নিয়মকেই এমন সমীকরণ দিয়ে লেখা যায়। যেমন ধরুন, প্রথম পাগলা ছক্কার সমীকরণটি হলো: f(x) = x1 + x3 + x4 + x5 + x6 + x8। আর দ্বিতীয় পাগলা ছক্কার সমীকরণটি হলো: g(x) = x1+ 2x2 + 2x3 + x4। এখন আপনি যদি এই দুটি সমীকরণ গুণ করেন, অর্থাৎ f(x) × g(x) বের করেন, তবে আপনি একটি নতুন সমীকরণ পাবেন। এই নতুন সমীকরণটিই হবে ছক্কা দুটির যোগফলের সম্ভাবনা।
দারুণ ব্যাপার হলো, এই গুণফলটি দুটি সাধারণ ছক্কার যোগফলের একদম সমান! একটি সাধারণ ছক্কার সমীকরণ হলো h(x) = x1 + x2 + x3 + x4 + x5 + x6। আপনি যদি h(x) × h(x) করেন, তবে ওই পাগলা ছক্কার গুণফলের ঠিক সমান ফলাফলই পাবেন! এই গাণিতিক সম্পর্কটিই প্রমাণ করে, সিস্টেমগুলো একে অপরের থেকে পুরোপুরি স্বাধীন।
অধ্যাপক স্যান্ডোমিরস্কি বলেন, ‘আমরা যখন এই কাজ শুরু করেছিলাম, তখন আমরা জানতাম না কী পেতে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমরা দেখলাম, বোলটজম্যানের সূত্র ছাড়া আর কোনো উপায় নেই! এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পাঠ্যবইয়ে থাকা একটি ধারণাকে আমরা সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার করলাম।’