দুই হাজার বছরের পুরোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান কি মিলল

ছবি: মিরাজসি / গেটি ইমেজ

গণিতের জগৎটা বড় অদ্ভুত। এখানে কিছু সমস্যা আছে, যেগুলো দেখতে খুব নিরীহ, কিন্তু হাজার বছর ধরে বাঘা বাঘা গণিতবিদদের রাতের ঘুম হারাম করে রেখেছে। তেমনই একটি সমস্যা হলো বক্ররেখার ওপর বিশেষ কিছু বিন্দু খুঁজে বের করা। প্রায় ২ হাজার বছর ধরে চলে আসা এই সমস্যার সমাধানে সম্প্রতি বড় ধরনের অগ্রগতি করেছেন তিনজন গণিতবিদ।

আপনি যখন শেয়ার বাজারের গ্রাফ বা কোনো ধূমকেতুর গতিপথ দেখেন, তখন আসলে একধরনের বক্ররেখা দেখছেন। গণিতের ভাষায় এগুলোকে সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু গণিতবিদদের, বিশেষ করে সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে যারা কাজ করেন, তাঁদের মাথাব্যথার কারণ এই রেখা নয়। তাঁদের আগ্রহ রেখার ওপর থাকা বিশেষ কিছু বিন্দু নিয়ে। এই বিন্দুগুলোকে বলা হয় মূলদ বিন্দু।

ব্যাপারটা একটু সহজ করা যাক। ছোটবেলায় গ্রাফ পেপারে ছক কাটার কথা মনে আছে? এক্স (x) এবং ওয়াই (y) অক্ষ বরাবর আমরা বিন্দু বসাতাম। এখন ধরুন, একটা বক্ররেখা ওই গ্রাফ পেপারের ওপর দিয়ে গেছে। এই রেখার ওপর কোটি কোটি বিন্দু আছে। কিন্তু গণিতবিদেরা হন্যে হয়ে খোঁজেন সেই বিন্দুগুলো, যেগুলোর স্থানাঙ্ক পূর্ণসংখ্যা কিংবা সাধারণ ভগ্নাংশ দিয়ে প্রকাশ করা যায়।

কেন এই বিন্দুগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ? যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্যারি মাজুর বলছেন, ‘আমরা গণিতবিদ, আমরা সবকিছুর মধ্যে একটা কাঠামো খুঁজতে পছন্দ করি।’ এই বিশেষ বিন্দুগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে জটিল সব গাণিতিক সম্পর্ক। এমনকি আজকের দিনে যে ক্রিপ্টোগ্রাফি বা ইন্টারনেট নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তার মূলে রয়েছে ইলিপ্টিক কার্ভ নামে বিশেষ বক্ররেখার ওপর থাকা এসব বিন্দুর কারিশমা।

আরও পড়ুন
গণিতবিদদের, বিশেষ করে সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে যারা কাজ করেন, তাঁদের মাথাব্যথার কারণ এই রেখা নয়। তাঁদের আগ্রহ রেখার ওপর থাকা বিশেষ কিছু বিন্দু নিয়ে। এই বিন্দুগুলোকে বলা হয় মূলদ বিন্দু।

প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদেরাও এই বক্ররেখার ওপর র‍্যাশনাল পয়েন্ট খুঁজে অনেক সময় নষ্ট করেছেন। বৃত্তের মতো সাধারণ বক্ররেখার ক্ষেত্রে এসব বিন্দুর সংখ্যা অসীম হতে পারে। কিন্তু যখন সমীকরণের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন কী হয়?

১৯২২ সালে লুইস মর্ডেল নামে এক গণিতবিদ এক বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনো বক্ররেখার সমীকরণের মাত্রা যদি ৪ বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর থাকা র‍্যাশনাল পয়েন্টের সংখ্যা অসীম হতে পারে না। একটা নির্দিষ্ট সংখ্যার পর তা থামবেই। অর্থাৎ, তা সসীম হবে।

এর প্রায় ৬১ বছর পর, ১৯৮৩ সালে জার্ড ফাল্টিংস প্রমাণ করেন, মর্ডেল ঠিকই বলেছিলেন। এই প্রমাণের জন্য ফাল্টিংস গণিতের নোবেলখ্যাত ফিল্ডস মেডেল জিতেছিলেন। কিন্তু এখানে একটা বড় কিন্তু ছিল। ফাল্টিংস প্রমাণ করেছিলেন, বিন্দুর সংখ্যা সসীম। কিন্তু তিনি এটা বলতে পারেননি যে সেই সংখ্যাটা আসলে কত বা সর্বোচ্চ কত হতে পারে?

গণিতবিদেরা জানতেন, বিন্দুর একটা সীমা আছে, কিন্তু সেই সীমানাটা কোথায়, তা কেউ জানতেন না। চিলির পন্টিফিকাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ হেক্টর পাস্টেন ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আমরা জানতাম কোথাও একটা সূত্র আছে, কিন্তু সেটা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।’

অবশেষে গত ২ ফেব্রুয়ারি, তিন গণিতবিদ প্রি-প্রিন্টে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। আর তাতেই গণিত মহলে শোরগোল পড়ে গেছে। তাঁরা এমন এক ফর্মুলা আবিষ্কার করেছেন, যা যেকোনো বক্ররেখার জন্য প্রযোজ্য।

আরও পড়ুন
১৯২২ সালে লুইস মর্ডেল নামে এক গণিতবিদ বলেছিলেন, কোনো বক্ররেখার সমীকরণের মাত্রা যদি ৪ বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর থাকা র‍্যাশনাল পয়েন্টের সংখ্যা অসীম হতে পারে না।

এই নতুন সূত্রটি বলে দিচ্ছে না যে একটা রেখায় ঠিক কয়টি বিন্দু আছে। তবে এটি বলে দিচ্ছে, সর্বোচ্চ কতগুলো বিন্দু থাকতে পারে। এর চেয়ে বেশি হওয়া সম্ভব নয়। একে বলা হয় হার্ড আপার লিমিট বা কঠোর ঊর্ধ্বসীমা।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এই সূত্রটি সার্বজনীন। অর্থাৎ, বক্ররেখাটি দেখতে যেমনই হোক বা তার সমীকরণ যেমনই হোক না কেন, এই সূত্র কাজ করবে। এটি মূলত নির্ভর করে দুটি জিনিসের ওপর। সমীকরণের মাত্রা এবং জ্যাকোবিয়ান ভ্যারাইটি নামে বিশেষ এক গাণিতিক কাঠামোর ওপর।

এই আবিষ্কার গণিতবিদদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এতদিন তাঁরা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন এটা ভেবে যে, বিন্দুর সংখ্যা সসীম। এখন তাঁরা জানেন, সেই সীমাটা আসলে কত হতে পারে।

এই বক্ররেখাগুলো আসলে গণিতের বিশাল জগতের প্রবেশদ্বার মাত্র। এর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে বহুমাত্রিক জ্যামিতির ধারণা, যা আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং মহাবিশ্বের স্থান-কাল বুঝতে ব্যবহৃত হয়। এই আবিষ্কারের ফলে এখন ত্রিমাত্রিক বা বহুমাত্রিক তলের ওপর থাকা বিন্দুগুলোর রহস্যভেদ করা হয়তো আরও সহজ হবে।

দুই হাজার বছর ধরে যে প্রশ্ন মানুষকে ভাবিয়েছে, তার উত্তরে এই নতুন সংযোজন গণিতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। অধ্যাপক মাজুর যেমনটা বলেছেন, ‘গণিতের জগতে এখন বিশাল কিছু ঘটছে। এটা খুবই রোমাঞ্চকর সময়।’

লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুর

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন