গুড উইল হান্টিং মুভিটি কেন গণিতবিদদের এত অপছন্দ
হলিউড বিখ্যাত মুভি গুড উইল হান্টিং দেখেছেন? এমআইটির বারান্দা মুছে বেড়াচ্ছে এক সাধারণ ঝাড়ুদার। এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ম্যাট ডেমন। কাজ করতে করতে হঠাৎ করিডরের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা একটা কঠিন অঙ্কের দিকে চোখ আটকে গেল তার। সে থমকে দাঁড়াল এবং চক হাতে অনায়াসেই সমাধান করে ফেলল সেই অসম্ভব গাণিতিক সমস্যা!
মুভির দর্শকদের বলা হয়েছিল, অঙ্কটা এতই কঠিন যে বাঘা বাঘা অধ্যাপকদেরও এর সমাধান করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। অথচ সেই পাজলটাই কিনা এক অজানা প্রতিভাবান ঝাড়ুদার চোখের পলকে মিলিয়ে দিল! দৃশ্যটা দেখে সাধারণ দর্শক হিসেবে আমরা মুগ্ধ হলেও, গণিতবিদ বা বিজ্ঞানসচেতন মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসেন। অনেকেই এটিকে হলিউডি গালগল্প বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু কেন? ১৯৯৭ সালে জোড়া অস্কার জেতা এই মুভির সেই বিখ্যাত ব্ল্যাকবোর্ডের অঙ্কে আসলে কী ভুল ছিল? চলুন, আজ সেই পাজলের রহস্য ভেদ করা যাক!
গুড উইল হান্টিং মুভির দর্শকদের বলা হয়েছিল, অঙ্কটা এতই কঠিন যে বাঘা বাঘা অধ্যাপকদেরও এর সমাধান করতে কয়েক বছর লেগে যাবে।
বাস্তবের গল্পটা আরও রোমাঞ্চকর!
মুভির এই গল্পটা নেওয়া হয়েছিল সত্যিকারের একটি ঘটনা থেকে। তবে বাস্তবের গল্পটা সিনেমার চেয়েও অনেক বেশি অবিশ্বাস্য! যাঁর জীবনের ঘটনা নিয়ে এই গল্প, তিনি জর্জ ডানৎজিগ। তাঁকে আধুনিক লিনিয়ার প্রোগ্রামিংয়ের জনক বলা হয়।
ছোটবেলায় ডানৎজিগ বেশি ভালো ছাত্র ছিলেন না। বীজগণিতে তিনি রীতিমতো ধুঁকছিলেন। ১৯৩৯ সালের তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে গণিতের মাস্টার্সের ছাত্র। একদিন পরিসংখ্যানের অধ্যাপক জের্জি নেইম্যানের ক্লাসে তিনি বেশ দেরিতে পৌঁছালেন। গিয়ে দেখলেন, ব্ল্যাকবোর্ডে দুটি কঠিন অঙ্ক লেখা। ডানৎজিগ ভাবলেন, এগুলো বোধ হয় বাড়ির কাজ বা হোমওয়ার্ক!
বাসায় ফিরে অঙ্ক দুটো মেলাতে গিয়ে তাঁর ঘাম ছুটে গেল। সাধারণ হোমওয়ার্কের চেয়ে এগুলোকে তাঁর কাছে অনেক কঠিন মনে হলো। তবু তিনি হাল ছাড়লেন না। সমাধান করে পরের দিন অধ্যাপকের কাছে জমা দিলেন। পরে জানা গেল, ডানৎজিগ হোমওয়ার্ক ভেবে পরিসংখ্যানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ও অমীমাংসিত দুটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন!
ছোটবেলায় ডানৎজিগ বেশি ভালো ছাত্র ছিলেন না। বীজগণিতে তিনি রীতিমতো ধুঁকছিলেন। ১৯৩৯ সালের তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে গণিতের মাস্টার্সের ছাত্র।
মুভির সেই বিখ্যাত অঙ্ক
বাস্তবের ডানৎজিগের এই অর্জনের তুলনায় হলিউড মুভির দেখানো অঙ্কটা আসলে একেবারেই ডালভাত! বিজ্ঞানের ভারী ভারী শব্দের খোলসটা ছাড়িয়ে ফেললে, যেকোনো পাজলপ্রেমী মানুষই এটা সমাধান করে ফেলতে পারবেন।
মুভির ব্ল্যাকবোর্ডে যে চ্যালেঞ্জটা দেওয়া হয়েছিল, তা হলো: Draw all homeomorphically irreducible trees of size n = 10.’ বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে ঠিকই, কিন্তু ভেঙে বলতে অতটাও জটিল লাগবে না। খেয়াল করলে দেখবেন, ওপরের সমস্যায় ইংরেজিতে ট্রি শব্দটি আছে। গণিতের ভাষায় ট্রি মানে একধরনের গ্রাফ বা নেটওয়ার্ক, যেখানে অনেকগুলো বিন্দু রেখা দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু শর্ত হলো, কোনো লুপ তৈরি করা যাবে না। অর্থাৎ, ঘুরেফিরে আবার আগের বিন্দুতে আসা যাবে না।
আরেকটা শব্দ আছে সাইজ। এখানে সাইজ n = 10 মানে ট্রিতে মোট ১০টি বিন্দু বা নোড থাকবে। আরও আছে হোমিওমরফিক শব্দ। এর মানে ট্রির আসল আকার, রেখার দৈর্ঘ্য বা বাঁকানো হওয়াটা কোনো বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো কোন বিন্দুর পর কোন বিন্দু যুক্ত আছে, সেই ক্রম। যেমন, ৫টি বিন্দু দিয়ে আপনি X আঁকুন বা K—গণিতের চোখে দুটোই এক! এরপর আছে ইরিডিউসিবল শব্দ। এর মানে হলো, কোনো বিন্দুর সঙ্গে ঠিক দুটি রেখা যুক্ত থাকতে পারবে না। হয় একটি রেখা থাকবে, নয়তো তিনটি বা তার বেশি রেখা থাকতে হবে। কারণ দুটি রেখা থাকলে বিন্দুটির কোনো দরকারই নেই, তাকে মুছে দিয়ে রেখাটিকে একটি সরলরেখা বানিয়ে ফেলা যায়।
তার মানে, আপনার কাজ হলো এমন কিছু জ্যামিতিক নকশা আঁকা, যেখানে ঠিক ১০টি বিন্দু থাকবে এবং ওপরের শর্তগুলো মানতে হবে।
গণিতের ভাষায় ট্রি মানে একধরনের গ্রাফ বা নেটওয়ার্ক, যেখানে অনেকগুলো বিন্দু রেখা দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু শর্ত হলো, কোনো লুপ তৈরি করা যাবে না।
কীভাবে সমাধান করবেন
আপনি চাইলে কাগজ-কলম নিয়ে একটু আঁকাআঁকি করেই এর সমাধান বের করে ফেলতে পারেন। যেমন ধরুন, প্রথমে মাঝখানে একটি বিন্দু এঁকে তার চারপাশ দিয়ে ৯টি রেখা টেনে ৯টি বিন্দু বসিয়ে দিলেন। দেখুন, মোট ১০টি বিন্দু হলো এবং কোনো বিন্দুই শুধু দুটি রেখার সঙ্গে যুক্ত নেই। চমৎকার! আপনি একটি সমাধান পেয়ে গেছেন। এরপর মাঝখানের বিন্দু থেকে ৮টি রেখা, ৭টি রেখা…এভাবে ধাপে ধাপে চেষ্টা করতে পারেন।
তবে আপনি যদি আরও একটু গাণিতিক উপায়ে পাজলটা মেলাতে চান, তবে সমীকরণ ব্যবহার করতে পারেন। ধরি, k সংখ্যক সংযোগ থাকা বিন্দুর সংখ্যা হলো nk।
যেহেতু আমাদের ট্রি ইরিডিউসিবল, তাই কোনো বিন্দুতে ঠিক দুটি সংযোগ থাকতে পারবে না, অর্থাৎ n2 = 0।
মোট বিন্দু ১০টি, তাই সর্বোচ্চ সংযোগ হতে পারে ৯টি। তাহলে আমাদের প্রথম সমীকরণটি দাঁড়ায় (মোট ১০টি বিন্দু):
n1 + n3 + n4 + n5 + n6 + n7 + n8 + n9 = 10
এবার সংযোগ বা রেখার হিসাব করা যাক। ১০টি বিন্দুর একটি ট্রিতে মোট ১৮টি সংযোগ থাকে। মানে ক থেকে খ এবং খ থেকে ক; এভাবে দুবার মাপা হলে। তাহলে আমাদের দ্বিতীয় সমীকরণটি হবে:
n1 + 3n3 + 4n4 + 5n5 + 6n6 + 7n7 + 8n8 + 9n9 = 18
এবার নিমেষে দ্বিতীয় সমীকরণ থেকে প্রথমটি বিয়োগ করে দিন। তাহলে পাবেন:
2n3 + 3n4 + 4n5 + 5n6 + 6n7 + 7n8 + 8n9 = 8
ধরুন, প্রথমে মাঝখানে একটি বিন্দু এঁকে তার চারপাশ দিয়ে ৯টি রেখা টেনে ৯টি বিন্দু বসিয়ে দিলেন। দেখুন, মোট ১০টি বিন্দু হলো এবং কোনো বিন্দুই শুধু দুটি রেখার সঙ্গে যুক্ত নেই।
এই শেষ সমীকরণটিই হলো আপনার নকশা আঁকার মূল চাবিকাঠি! আপনাকে এমন পদগুলো বেছে নিতে হবে, যাদের সহগ যোগ করলে ৮ হয়।
যেমন, সমীকরণে 8n9 আছে। এর মানে আপনি এমন একটি নকশা আঁকতে পারবেন, যেখানে একটি বিন্দুর ৯টি সংযোগ থাকবে।
আবার 7n8 দিয়ে কোনো নকশা হবে না, কারণ ৭-এর সঙ্গে আর কিছু যোগ করে ৮ বানানোর সুযোগ নেই।
কিন্তু 6n7 এর সঙ্গে আপনি চাইলেই 2n3 যোগ করে ৮ বানাতে পারেন! মানে, আপনি এমন একটি ট্রি আঁকতে পারবেন, যেখানে একটি বিন্দুর ৭টি সংযোগ এবং আরেকটি বিন্দুর ৩টি সংযোগ থাকবে।
ভাবতে পারছেন? যে অঙ্কটাকে মুভিতে বছরের পর বছর ধরে সমাধানের অযোগ্য বলে দেখানো হয়েছিল, একটু মাথা খাটালে সেটা কাগজ-কলমেই কয়েক মিনিটে নামিয়ে ফেলা সম্ভব!
২০২২ সালে ডেভিড স্মিথ নামে এক সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত ছাপাখানা কর্মী গণিতবিদদের বহু আকাঙ্ক্ষিত আইনস্টাইন টাইল আবিষ্কার করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন!
বাস্তব জীবনের হিরো
মুভির নির্মাতারা হয়তো ক্যামেরায় দেখতে সুন্দর লাগবে বলেই এমন একটি সহজ গ্রাফ থিওরির পাজল বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু গণিতের ইতিহাসে এমন অনেক সাধারণ মানুষের গল্প আছে, যাঁরা কোনো ডিগ্রি ছাড়াই তাক লাগানো সব সমস্যার সমাধান করেছেন। যেমন, ২০২২ সালে ডেভিড স্মিথ নামে এক সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত ছাপাখানা কর্মী গণিতবিদদের বহু আকাঙ্ক্ষিত আইনস্টাইন টাইল আবিষ্কার করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন! এটি এমন একটি জ্যামিতিক আকার, যা দিয়ে কোনো ফাঁকা জায়গা না রেখেই পুরো একটি মেঝে ঢেকে ফেলা যায়। অথচ এর নকশা কখনো নিজেদের পুনরাবৃত্তি করে না