পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গরম ছিল আগস্টে, দাবি বিজ্ঞানীদের
প্রচণ্ড গরমে ঘেমে-নেয়ে যখন আপনি এসির রিমোট খুঁজছেন কিংবা ফ্যানের রেগুলেটর ফুল স্পিডে ঘুরিয়ে দিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না, ঠিক তখন ইউরোপীয় জলবায়ু সংস্থা কোপার্নিকাস শোনাল এক ভয়ংকর খবর। সদ্য বিদায় নেওয়া অগাস্ট মাসটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে উত্তপ্ত মাস! চারপাশের এই হাঁসফাঁস করা গরম কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। মানুষের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তন ও শক্তিশালী এল নিনোর যৌথ হামলায় আমাদের এই চিরচেনা নীল গ্রহটি এখন রীতিমতো একটি ফুটন্ত কড়াইতে পরিণত হয়েছে।
কোপার্নিকাসের তথ্যমতে, গত মাসে পুরো বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ছিল ১৬.৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৈশ্বিক গড়ের হিসাবটি সারা পৃথিবীর দিন-রাত এবং মেরু অঞ্চলের বরফশীতল তাপমাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে করা হয় বলে সংখ্যাটি আপনার কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে এটি রীতিমতো একটি সাইরেন! এই তাপমাত্রা গত বছরের জুলাই মাসের রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রার একেবারে সমান।
মানুষের তৈরি করা জলবায়ু পরিবর্তন ও শক্তিশালী এল নিনোর যৌথ হামলায় আমাদের এই চিরচেনা নীল গ্রহটি এখন রীতিমতো একটি ফুটন্ত কড়াইতে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের বিরক্তি ও আমাদের নির্বিকার দশা
রাস্তায় বের হলে যখন রোদের তাপে পিঠ পুড়ে যায়, তখন আমরা অনেকেই বেশ অবাক হয়ে বলি, ‘আরে! এত গরম কেন আজ?’ কিন্তু টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু ডেসলার এই অবাক হওয়া ব্যাপারটিতে বেশ বিরক্ত। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, এই গ্রহের তাপমাত্রা যে লাগামহীনভাবে বাড়বে, তা বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক আগেই একেবারে নিখুঁতভাবে বলে দিয়েছিলেন। তাই এখন আকাশ থেকে পড়ার কোনো মানেই হয় না! ডেসলার বেশ চমৎকার একটি উপমা টেনেছেন। তিনি বলেন, আমরা এমন এক অদ্ভুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বিশাল ট্রেন আমাদের পিষে ফেলার জন্য ছুটে আসছে। আর আমরা ট্রেনটি থামানোর কোনো চেষ্টা না করে, ঠিক রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে বোকার মতো সেটির দিকে তাকিয়ে আছি!
২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে একটি বিপদসীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল—পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে কোনোভাবেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়তে দেওয়া যাবে না। কিন্তু বিদায়ী আগস্ট মাস সেই সীমানাকে রীতিমতো বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১.৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল। কোপার্নিকাস-এর তথ্য বলছে, গত বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত টানা আটটি মাস আগের সব গরমের রেকর্ড তছনছ করে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এবারের গ্রীষ্মকাল এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, গত প্রায় ৯০ বছর ধরে টিকে থাকা অনেক দেশের পুরোনো সব তাপপ্রবাহের রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
গলে যাওয়া রাস্তা আর ফুটন্ত মহাসাগর
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একসময় মানুষের ধারণা ছিল, এটি হয়তো অনেক দূরের কোনো ব্যাপার। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে বা দূরবর্তী কোনো দ্বীপ ডুবে যাচ্ছে; এমন খবরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুব একটা যায়-আসত না। কিন্তু কোপার্নিকাসের জলবায়ু প্রধান সামান্থা বার্জেস জানাচ্ছেন, ‘সেই দিন আর নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা এখন সরাসরি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এসে পড়েছে। তীব্র দাবদাহের কারণে স্কুল বন্ধ করে দিতে হচ্ছে, হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীতে হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে, পিচঢালা রাস্তা গরমে গলে যাচ্ছে, এমনকি রেললাইনও অতিরিক্ত তাপে বেঁকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।’
শুধু ডাঙাতেই নয়, পানির নিচেও চলছে আরেক তাণ্ডব। গত ২২ অগাস্ট ছিল বিশ্বের সমুদ্রগুলোর ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত দিন! বিশ্বজুড়ে এবারের গ্রীষ্মকাল এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, গত প্রায় ৯০ বছর ধরে টিকে থাকা অনেক দেশের পুরোনো সব তাপপ্রবাহের রেকর্ড এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রায় বড়জোর শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ যোগ করে। বাকি পুরো বিশাল উত্তাপের দায়ভার শতভাগ আমাদের অর্থাৎ মানুষের।
অপরাধী কি কেবলই এল নিনো
অনেকেই গরমের সব দায়ভার এল নিনোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বেশ তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশের এই প্রাকৃতিক ও সাময়িক উষ্ণতা অবশ্যই আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন আসল সত্যটা ভিন্ন। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক অটো বেশ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, এল নিনো হয়তো গরমের আগুনে একটু ঘি ঢেলেছে, কিন্তু আসল আগুনটা জ্বালিয়েছে আমাদের নিজেদের পোড়ানো জীবাশ্ম জ্বালানি। কয়লা, তেল আর গ্যাসের এই লাগামহীন ব্যবহার বন্ধ না করা পর্যন্ত এমন হাড়কাঁপানো গরমের রেকর্ড ভাঙার খেলা চলতেই থাকবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রায় বড়জোর শূন্য দশমিক ১ থেকে শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ যোগ করে। বাকি পুরো বিশাল উত্তাপের দায়ভার শতভাগ আমাদের অর্থাৎ মানুষের।
ফ্রেডেরিক অটো বেশ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, এল নিনো হয়তো গরমের আগুনে একটু ঘি ঢেলেছে, কিন্তু আসল আগুনটা জ্বালিয়েছে আমাদের নিজেদের পোড়ানো জীবাশ্ম জ্বালানি।
সামনে অপেক্ষা করছে আরও অন্ধকার দিন
আপনি যদি ভাবেন ২০২৬ সালের এই গরমই সবচেয়ে ভয়ংকর, তবে আপনার জন্য আরও বড় দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। বার্কলে আর্থ-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী জেকে হাউসফাদার সতর্ক করে জানিয়েছেন, খুব সম্ভবত ২০২৬ সাল গতবারের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে চলেছে। আর ২০২৭ সাল এই দুই বছরকেই টপকে যাবে! সে বছর বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের চেয়ে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল পুরো পরিস্থিতিকে মানুষের ‘জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি আসক্তি’-এর চরম মূল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমরা যদি এখনই সতর্ক না হই, তবে এই চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া শুধু লাখ লাখ মানুষের প্রাণই কাড়বে না, বরং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে এবং চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবে। তাই প্রকৃতির এই চরম প্রতিশোধ থেকে বাঁচতে হলে এসি ছেড়ে বসে থাকার চেয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর দিকে নজর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই!