আটলান্টিকের কোল্ড ব্লব কি বড় কোনো প্রলয়ের আভাস

১৯৫১–৮০ সালের গড়ের তুলনায় ২০১৫ সালের গড় তাপমাত্রার তথ্যচিত্রে দেখা যাচ্ছে কোল্ড ব্লবছবি: নাসা

বিশ্ব উষ্ণায়নের তীব্র দাপটে যখন পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রান্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে দেখা গেছে এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। গত দেড় শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়লেও গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট অংশ উল্টো প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত শীতল হয়েছে। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময় এই এলাকাটি কোল্ড ব্লব (শীতল পিণ্ড) নামে পরিচিত। এই শীতল বলয়ের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন এক ভয়াবহ আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করছে, মহাসাগরের এই ব্যতিক্রমী আচরণ আসলে বিশ্ব জলবায়ুর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন’ বা ‘অ্যামক’ নামে স্রোতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

বিশ্ব জলবায়ুর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন
ছবি: সংগৃহীত

প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে মেক্সিকো উপসাগর থেকে উষ্ণ ও লবণাক্ত জলরাশি এই অ্যামক স্রোতের মাধ্যমে উত্তর আটলান্টিকের দিকে প্রবাহিত হয়, যা ইউরোপ মহাদেশকে বাসযোগ্য ও উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। সেখানে পৌঁছানোর পর জলরাশি শীতল ও ঘন হয়ে সমুদ্রের তলদেশে নেমে যায় এবং পুনরায় দক্ষিণের দিকে প্রবাহিত হয়।

আরও পড়ুন
গত দেড় শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়লেও গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সমুদ্রের একটি নির্দিষ্ট অংশ উল্টো প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত শীতল হয়েছে।

কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সমুদ্রে মিশছে, তা এই লবণাক্ত পানির ঘনত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে পানি আর আগের মতো সহজে নিচে নামতে পারছে না, যা পুরো মহাসাগরীয় সঞ্চালনপ্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে তুলছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এই স্রোতব্যবস্থাটি যদি একটি নির্দিষ্ট সংকটময় সীমা অতিক্রম করে, তবে তা ইউরোপজুড়ে চরম স্থবিরতা ডেকে আনবে। একই সঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকার কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি মৌসুমি বায়ু এবং বৃষ্টিপাতকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

এই শীতল বলয়টি তৈরি হওয়ার পেছনে সাগরের ভেতরের স্রোত নাকি ওপরের বায়ুমণ্ডল দায়ী, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। কিছু গবেষকের মতে, আর্কটিক অঞ্চলের দ্রুত উষ্ণায়নের ফলে মেরু ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেছে।

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সমুদ্রে মিশছে, তা এই লবণাক্ত জলের ঘনত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে
ছবি: ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর

ফলে শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাস উত্তর দিকে সরে এসে সমুদ্রের তাপ কেড়ে নিচ্ছে এবং অধিক বাষ্পীভবনের মাধ্যমে মেঘ তৈরি করে সূর্যালোকে বাধা দিচ্ছে। তবে জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের জলবায়ুবিজ্ঞানী স্টেফান রাহমস্টর্ফ ও তাঁর সহকর্মীদের সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

তাঁরা জলবায়ু মডেলিংয়ের ওপর নির্ভর না করে স্যাটেলাইট, বয়া ও জাহাজ থেকে পাওয়া সরাসরি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ১৯৫৫ সাল থেকে এই অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপের ক্ষয় আসলে কমেছে। অথচ সমুদ্রের তলদেশ প্রায় এক কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত শীতল হয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে নয়; বরং মহাসাগরের নিজস্ব স্রোত দুর্বল হওয়ার কারণেই সেখানে উষ্ণ পানি কম পৌঁছাচ্ছে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এই স্রোতব্যবস্থাটি যদি একটি নির্দিষ্ট সংকটময় সীমা অতিক্রম করে, তবে তা ইউরোপজুড়ে চরম স্থবিরতা ডেকে আনবে।

রাহমস্টর্ফের এই আবিষ্কার আরও এক বিপদের সংকেত দিচ্ছে। আটলান্টিকের এই স্রোতবিপর্যয় শুধু অ্যামকের পতনই ডেকে আনবে না, বরং তা সাবপোলার জাইর নামে শীতল জলরাশিকে ঘিরে থাকা একটি বিশাল সামুদ্রিক ঘূর্ণিস্রোতকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই ঘূর্ণিটি বন্ধ হয়ে গেলে অ্যামকের সম্পূর্ণ পতনের আগেই ২০৪০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপের তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যেতে পারে।

অবশ্য তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে ডেভিড থর্নালি বা নেল ফ্রেজারের মতো অনেক বিজ্ঞানীই একে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলতে নারাজ। তাঁদের মতে, নরওয়েজিয়ান স্রোতের মতো অ্যামকের অন্য কোনো শাখা শক্তিশালী হয়ে এই তাপ সরিয়ে নিচ্ছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, যখন এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবর্তনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের বাজেট কাটা হয়েছে। ‘ওশান অবজারভেটরিজ ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় গ্রিনল্যান্ড ও আমেরিকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে সাগরের নিচে নজর রাখার যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ছিল, বাজেট স্বল্পতার কারণে তা সংকুচিত করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
আটলান্টিকের স্রোতবিপর্যয় শুধু অ্যামকের পতনই ডেকে আনবে না, বরং তা সাবপোলার জাইর নামে শীতল জলরাশিকে ঘিরে থাকা একটি বিশাল সামুদ্রিক ঘূর্ণিস্রোতকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

স্যাটেলাইট যেহেতু সমুদ্রের গভীরে দেখতে পায় না, তাই এই ডুবো পর্যবেক্ষণব্যবস্থাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে সাগরের তলদেশের পরিবর্তন পরিমাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই তথ্যের ঘাটতি জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার পথকে যেমন অন্ধ করে দেবে, তেমনি প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর প্রভাব সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে মৎস্যশিল্পও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। গভীর সমুদ্রের এই রহস্যময় শীতলতা আসলে এক জলবায়ু বিপর্যয়ের নীরব বার্তা, যা সময়মতো অনুধাবন করতে না পারলে মানবজাতিকে চড়া মূল্য চোকাতে হতে পারে।

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

আরও পড়ুন