মর্টাল ইঞ্জিনস: আধুনিক শহরে শহরে লড়াই
পৃথিবীটা ধ্বংস হয়ে গেছে মাত্র ৬০ মিনিটের এক ভয়ংকর পারমাণবিক যুদ্ধে। হাজার বছর পরের সেই পৃথিবীতে টিকে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইটা একদম অন্যরকম। মাটি কামড়ে পড়ে থাকার বদলে আস্ত শহরগুলো এখন উঠে বসেছে বিশালাকার চাকার ওপর! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। বিশাল সব শহর এখন ইঞ্জিনের শক্তিতে ছুটে বেড়ায় রুক্ষ প্রান্তরে। আর বেঁচে থাকার রসদ জোগাতে বড় শহরগুলো গিলে খায় ছোট ছোট শহরকে। এই অদ্ভুত ও ভয়ংকর নিয়মের নাম দেওয়া হয়েছে মিউনিসিপ্যাল ডারউইনিজম।
এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর ও অভাবনীয় জগৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে সায়েন্স ফিকশন ফ্যান্টাসি মুভি মর্টাল ইঞ্জিনস।
গল্পের কেন্দ্রে আছে লন্ডনের মতো এক বিশাল শিকারি শহর। থাডিউস ভ্যালেন্টাইন নামে এক ক্ষমতালোভী নেতার নেতৃত্বে লন্ডন চষে বেড়াচ্ছে ইউরোপের বুকে, ধ্বংস করছে ছোট ছোট জনপদ। এই ভ্যালেন্টাইনকে হত্যা করে নিজের মায়ের মৃত্যুর বদলা নিতে চায় হেসটার শ নামে এক রহস্যময়ী তরুণী, যার মুখে রয়েছে গভীর এক ক্ষতের দাগ।
লন্ডন শহরেই হেসটারের পরিচয় হয় টম ন্যাটসওয়ার্থি নামে এক ইতিহাসবিদের সঙ্গে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে দুজনকেই ছিটকে পড়তে হয় চলন্ত লন্ডন থেকে। রুক্ষ প্রান্তরে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তাদের সঙ্গী হয় আনা ফ্যাং নামে এক দুর্ধর্ষ বিদ্রোহী যোদ্ধা। তাদের লক্ষ্য একটাই—ভ্যালেন্টাইনের হাত থেকে একটি অতিপ্রাচীন ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র কেড়ে নেওয়া, যা দিয়ে সে পুরো বিশ্বকে নিজের হাতের মুঠোয় আনতে চায়। হেসটার ও টম কি পারবে লন্ডন শহরের এই অশুভ যাত্রাকে থামাতে? জানতে হলে দেখতে হবে মুভিটি।
এই মুভির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ভিজ্যুয়াল ও দুর্দান্ত ওয়ার্ল্ড-বিল্ডিং। লর্ড অব দ্য রিংস খ্যাত পিটার জ্যাকসন এই মুভির প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার। পুরো মুভিতে তাঁর ভিজ্যুয়াল স্টাইলের ছাপ স্পষ্ট। পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান রিভার্স এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছেন, যা এর আগে কখনো সেলুলয়েডের পর্দায় দেখা যায়নি। মুভির শুরুতেই বিশাল আকৃতির লন্ডন শহর যখন একটি ছোট শহরকে ধাওয়া করে, সেই দৃশ্যটি আপনার চোখের পলক ফেলতে দেবে না।
স্টিম্পাঙ্ক ঘরানার এমন নিখুঁত রূপায়ণ খুব কম মুভিতেই দেখা গেছে। বিশালাকার সব গিয়ার, ধোঁয়া ওঠা ইঞ্জিন, পুরনো প্রযুক্তির সঙ্গে ভবিষ্যতের মিশেল—সব মিলিয়ে এমন এক জগৎ তৈরি হয়েছে, যা দেখে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য। মুভির সিনেমাটোগ্রাফি ও স্পেশাল ইফেক্টস এতই নিখুঁত যে, এটি আপনাকে দুই ঘণ্টার জন্য পুরোপুরি অন্য এক দুনিয়ায় নিয়ে যাবে।
তবে এত বিশাল আয়োজনের ভিজ্যুয়াল ও দুর্দান্ত কনসেপ্টের কাছে মুভির গল্পটা কিছুটা মার খেয়ে গেছে। হেসটার চরিত্রে হেরা হিলমার ও আনা ফ্যাং চরিত্রে জিহের অভিনয় দারুণ হলেও, অন্যান্য চরিত্রের গভীরতা সেভাবে ফুটে ওঠেনি। বিশেষ করে টম ও হেসটারের রসায়নটা বেশ তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা বলে মনে হয়।
একনজরে
মর্টাল ইঞ্জিনস
পরিচালক: ক্রিশ্চিয়ান রিভার্স
চিত্রনাট্য: পিটার জ্যাকসন, ফ্র্যান ওয়ালশ, ফিলিপা বোয়েনস
ধরন: সায়েন্স ফিকশন, অ্যাকশন, ফ্যান্টাসি, অ্যাডভেঞ্চার
মুক্তি: ২০১৮ সাল
ব্যাপ্তি: ২ ঘণ্টা ৮ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং: ৬.১/১০
ফিলিপ রিভের বিখ্যাত উপন্যাস মর্টাল ইঞ্জিনস অবলম্বনে মুভিটি তৈরি হলেও, দুই ঘণ্টার মধ্যে এত বড় একটা জগৎ ও এতগুলো চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে চিত্রনাট্য বেশ খেই হারিয়ে ফেলেছে। ভ্যালেন্টাইনের মতো একজন ভিলেনের পেছনের উদ্দেশ্যও বেশ গতানুগতিক। স্টার ওয়ার্স বা ম্যাড ম্যাক্স মুভির মতো ক্লাসিক মুভিগুলোর ছায়া এই মুভিতে বারবার ফিরে এসেছে। ফলে গল্পের শেষটা আপনি সহজেই অনুমান করতে পারবেন।
তবে এই ছোটখাটো দুর্বলতাগুলো বাদ দিলে মর্টাল ইঞ্জিনস দারুণ উপভোগ্য একটি মুভি। আপনি যদি জটিল দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বদলে নিছক বিনোদন, দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এবং একেবারে নতুন ধরনের কোনো সায়েন্স ফিকশন ফ্যান্টাসি দেখতে চান, তবে এই মুভি আপনাকে হতাশ করবে না।
আস্ত একটি শহর কীভাবে আরেকটি শহরকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, শুধু এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যটি দেখার জন্যই মুভিটি আপনার একবার দেখা উচিত।