বজ্রপাতে বেঁচে গেলে কী হয়
পেশায় ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট রায়ান ব্লুমেনথাল। তাঁর কাজ অনেকটা গোয়েন্দার মতোই। কোনো মানুষ যদি রহস্যজনকভাবে, হঠাৎ করে কিংবা কোনো দুর্ঘটনায় মারা যান, তবে সেই মৃত্যুর পেছনের আসল রহস্য খুঁজে বের করাই তাঁর কাজ।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি এক অদ্ভুত ঘটনার মুখোমুখি হন। একটি মাঠে পড়ে থাকা এক ব্যক্তির মৃতদেহ পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, লোকটির পোশাক ছেঁড়াফাটা এবং কানের পর্দা ফেটে গেছে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল, এটি হয়তো কোনো ভয়ংকর অপরাধীর কাজ।
কিন্তু পরীক্ষা করার পর দেখা গেল, ঘটনাটার জন্য দায়ী বজ্রপাত। সেই থেকেই বজ্রপাতের অদ্ভুত সব ধ্বংসক্ষমতা দেখে রায়ান ব্লুমেনথাল এর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি সারা বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকজন সেরা বজ্রপাত বিশেষজ্ঞের অন্যতম। বজ্রপাত আঘাত হানার পর মানুষের শরীরে ঠিক কী ঘটে, তা নিয়ে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন।
বজ্রপাতের বিদ্যুৎ যখন মানুষের শরীরে আঘাত করে, তখন ঠিক কী ঘটে? বজ্রপাতের ভোল্টেজ এতই বেশি যে এটি মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে কয়েক লাখ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়। কারণ, আমাদের হৃৎপিণ্ড চলে খুব সূক্ষ্ম ইলেকট্রিক সিগন্যালে। আর বজ্রপাতের প্রচণ্ড ভোল্টেজ সেই ছন্দকে পুরোপুরি এলোমেলো করে দেয়।
বজ্রপাতের ভোল্টেজ এতই বেশি যে এটি মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে কয়েক লাখ ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মারা যায়।
শুধু তা-ই নয়, বজ্রপাতের ফলে তৈরি হওয়া তীব্র বাতাসের চাপের কারণে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে এবং মানুষের শ্বাসতন্ত্র সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে পড়তে পারে। এমনকি বিদ্যুতের তাপে চুল বা পোশাকে আগুন ধরে গিয়ে শরীর মারাত্মকভাবে পুড়েও যেতে পারে।
বজ্রপাত কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা এর তাপমাত্রার হিসাব শুনলেই বোঝা যায়। একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। এটি সূর্যের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি! আকাশ থেকে যখন প্রচণ্ড উত্তপ্ত এই বিদ্যুৎ পৃথিবীতে নেমে আসে, তখন চারপাশের বাতাস মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে বিস্ফোরিত হয়। তা থেকেই আমরা কানফাটানো বজ্রপাতের সেই শব্দ শুনতে পাই। বজ্রপাত দূর থেকে দেখতে যতটা সুন্দর, কাছ থেকে ঠিক ততটাই ভয়ংকর।
বেশ কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী হচ্ছে। খবরে প্রায়ই বজ্রপাতে প্রাণহানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেকেরই ধারণা, বজ্রপাত মানেই অবধারিত মৃত্যু। কিন্তু বজ্রপাতে আক্রান্ত সব মানুষই কিন্তু মারা যান না। বরং প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই কোনো না কোনোভাবে বেঁচে যান। একটি বজ্রপাত চোখের পলকের চেয়েও দ্রুত ঘটে। অর্থাৎ সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই তা শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায়। এটি এতই দ্রুত ঘটে যে অনেক সময় শরীরে বাইরের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত রাখার সুযোগ পায় না।
একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। এটি সূর্যের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি!
তবে যাঁরা বেঁচে ফেরেন, তাঁদের জীবনটা আর আগের মতো থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রের বজ্রপাত সচেতনতা ও নিরাপত্তা সংস্থা ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ মেরি অ্যান কুপার বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি জানান, বজ্রপাতের আঘাতে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে মনোযোগের অভাব, বিচারবুদ্ধি কমে যাওয়া কিংবা সারাক্ষণ মানসিক আতঙ্কের মতো নানা সমস্যা দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া তীব্র বিদ্যুৎ ও বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দের চাপের কারণেই মস্তিষ্কের এই স্থায়ী ক্ষতি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস আরও কিছু অদ্ভুত তথ্য জানিয়েছে। বেঁচে যাওয়া কিছু মানুষ স্মৃতিশক্তি হারানো বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার পাশাপাশি বিষণ্নতায় ভোগেন।
এমনকি কেউ কেউ দাবি করেন যে তাঁরা বিশেষ কোনো মানসিক ক্ষমতা পেয়েছেন। বজ্রপাতের আঘাতে কেউ বেঁচে গেলেও তাঁর জীবন আর কখনোই আগের মতো স্বাভাবিক থাকে না।
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে অনেক সময় এক অদ্ভুত নকশা দেখা যায়, যা দেখতে ঠিক ফার্ন গাছের পাতার মতো। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় লিচটেনবার্গ ফিগার। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ বয়ে যাওয়ার সময় রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেখান থেকে তরল কোষের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এই নকশা তৈরি করে। ২০২০ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ লেখা হয়, ৫৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে এমন নকশা দেখা দিলেও সেগুলো ছিল পুরোপুরি ব্যথাহীন এবং মাত্র দুদিন পরেই তা গা থেকে মিলিয়ে গিয়েছিল।
বজ্রপাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে অনেক সময় এক অদ্ভুত নকশা দেখা যায়, যা দেখতে ঠিক ফার্ন গাছের পাতার মতো। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় লিচটেনবার্গ ফিগার।
বজ্রপাত নিয়ে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পটি হলো রয় সালিভানের। আমেরিকার একটি ন্যাশনাল পার্কের এই রেঞ্জার ১৯৪২ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে মোট সাতবার বজ্রপাতের শিকার হয়েছিলেন। ভাবা যায়! সাতবার বজ্রপাত তাঁর গায়ে পড়লেও প্রতিবারই তিনি বেঁচে ফিরেছেন। তাঁর নামেই বজ্রপাতে সর্বাধিক আঘাতের বিশ্ব রেকর্ড রয়েছে। যদিও বজ্রপাতের আঘাতে তাঁর চুল ও জামাকাপড় পুড়ে গিয়ে শরীর মারাত্মক জখম হয়েছিল। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সাতটি বজ্রপাত যাঁকে মারতে পারেনি, সেই মানুষটিই ৭২ বছর বয়সে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগে আত্মহত্যা করেছিলেন।
বজ্রপাতের আঘাত কেবল শরীরের ওপর দিয়েই যায় না, এটি মানুষের মনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। স্টিভ ম্যাশবার্ন নামের এক ব্যক্তি ১৯৬৯ সালে বজ্রপাতের শিকার হন। সেই ভয়াবহ আঘাতে তাঁর পিঠের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তিনি জানান, বজ্রপাত থেকে বেঁচে ফেরা অনেক মানুষ পরবর্তী সময়ে অসহ্য শারীরিক ব্যথার পাশাপাশি চরম মানসিক অবসাদে ভোগেন। এমনকি অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তাও কাজ করতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে মানুষকে সাহায্য করার জন্য স্টিভ ম্যাশবার্ন বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা পরিচালনা করছেন। সেখানে বজ্রপাত থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা একে অপরের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। আসলে শরীরের হাড় বা রক্তনালির ক্ষত হয়তো একসময় শুকিয়ে যায়, কিন্তু স্নায়ু ও মস্তিষ্কে যে ধাক্কা লাগে, তা থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠা অনেক লম্বা ও কঠিন একটি প্রক্রিয়া।
আমেরিকার একটি ন্যাশনাল পার্কের রেঞ্জার রয় ১৯৪২ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে মোট সাতবার বজ্রপাতের শিকার হয়েছিলেন। সাতবার বজ্রপাত তাঁর গায়ে পড়লেও প্রতিবারই তিনি বেঁচে ফিরেছেন।
আকাশে যখন বিজলি চমকায়, তখন অনেকেই ভয়ে থাকেন। কিন্তু আশার কথা হলো, সচেতন থাকলে বজ্রপাতের আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব। ঝড়ের আভাস পেলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত কোনো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া। আর মনে রাখবেন, শেষবার মেঘ ডাকার অন্তত ৩০ মিনিট পর পর্যন্ত ঘর থেকে বের হওয়া একদম উচিত নয়। কারণ, ঝড় থেমে গেছে মনে হলেও বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে যায়।
অবাক করা তথ্য হলো, বজ্রপাত যে সব সময় সরাসরি মানুষের মাথায় পড়ে, তা কিন্তু নয়। সরাসরি আঘাতের ঘটনা ঘটে মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সাইড ফ্ল্যাশ এবং গ্রাউন্ড কারেন্টের কারণে। সাইড ফ্ল্যাশ হলো এমন এক অবস্থা, যেখানে বজ্রপাত হয়তো পাশের কোনো গাছ বা খুঁটিতে পড়েছে, কিন্তু তার বিদ্যুতের একটা অংশ ছিটকে এসে শরীরে লাগে। আর গ্রাউন্ড কারেন্ট হলো, যখন মাটিতে বিদ্যুৎ পড়ার পর তা মাটির নিচ দিয়ে পায়ের কাছে চলে আসে। এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়, মাঠের এক জায়গায় বজ্রপাত হয়ে পশুর পুরো পাল একসঙ্গে মারা গেছে।
বজ্রপাত যে সব সময় সরাসরি মানুষের মাথায় পড়ে, তা কিন্তু নয়। সরাসরি আঘাতের ঘটনা ঘটে মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সাইড ফ্ল্যাশ এবং গ্রাউন্ড কারেন্টের কারণে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বর্তমানে সচেতনতা বাড়ায় সেখানে মৃত্যুর হার অনেকটাই কমে এসেছে। আমাদের দেশের চিত্রটা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। আগে আমাদের দেশে প্রচুর তালগাছ ও বড় বড় গাছ ছিল, যা প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করত। বজ্রপাত সাধারণত উঁচু জায়গাকে আগে আঘাত করে, তাই উঁচু গাছগুলো সেই বিদ্যুৎ নিজের দিকে নিয়ে নিত। বর্তমানে সেই গাছগুলো কমে যাওয়ায় খোলা মাঠে বা ফাঁকা জায়গায় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
মার্কিন পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, মানুষের সচেতনতা বজ্রপাতের ঝুঁকি কতটা কমিয়ে দিয়েছে। ২০০১ সাল থেকে বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবছর বজ্রপাত সুরক্ষা সচেতনতা সপ্তাহ পালন শুরু করে। আগে যেখানে দেশটিতে বছরে গড়ে ৫৫ জন মারা যেতেন, ২০২২ সালে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নিয়ম মেনে চললে বজ্রপাতের ভয়াবহ তাণ্ডব থেকেও জীবন বাঁচানো সম্ভব।