এমন গরমে ৭টি গরম গরম তথ্য
গ্রীষ্মকাল মানেই কি শুধু কাঠফাটা রোদ ও ঘাম? জানলে অবাক হবেন, এই ঋতুটি আসলে অনেকগুলো বিস্ময়কর ঘটনার কারণ। প্রকৃতির অনেক বিচিত্র পরিবর্তন কেবল বছরের এই বিশেষ সময়েই ঘটে। প্রচণ্ড দাবদাহে আমাদের শরীরের ভেতরেও এমন কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন হয়, যা আমরা হয়তো সচরাচর খেয়ালই করি না। তাই গ্রীষ্মের শুরুতেই চলুন জেনে নেওয়া যাক, এই ঋতুটি সম্পর্কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অপ্রত্যাশিত কিছু মজার তথ্য।
১. লম্বা হয় আইফেল টাওয়ার
অবাক করার মতো তথ্য হলেও সত্যি, গ্রীষ্মের গরমে প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার প্রায় ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়ে যায়! আইফেল টাওয়ার মূলত লোহা দিয়ে তৈরি। প্রচণ্ড রোদে লোহার তাপীয় প্রসারণ ঘটে। কঠিন পদার্থের অণুগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব শক্তভাবে লেগে থাকে। কিন্তু এতে যখন তাপ দেওয়া হয়, তখন অণুগুলো জোরে কাঁপতে শুরু করে এবং একে অপরকে ধাক্কা দেয়। এই ধাক্কাধাক্কির কারণে এদের মধ্যকার শক্ত বন্ধন কিছুটা ঢিলে হয়ে যায় এবং অণুগুলো একে অপরের থেকে সামান্য দূরে সরে যায়। এভাবেই প্রতিটি অণু দূরে সরে যাওয়ার ফলে পুরো পদার্থটির আয়তন কিছুটা বেড়ে যায়। একে আমরা প্রসারণ হিসেবে দেখি।
তবে সূর্যের কড়া রোদে আইফেল টাওয়ারের সব দিক সমানভাবে উত্তপ্ত হয় না। যে দিকটি সূর্যের দিকে থাকে, সেই পাশের লোহা অন্য পাশের তুলনায় বেশি গরম হয়ে প্রসারিত হয়। লোহার এই অসম প্রসারণের ফলে টাওয়ারের ভারসাম্য একদিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে এবং এর মাথাটি সূর্য থেকে প্রায় সাত ইঞ্চি পর্যন্ত দূরে হেলে যায়।
কঠিন পদার্থের অণুগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব শক্তভাবে লেগে থাকে। কিন্তু এতে যখন তাপ দেওয়া হয়, তখন অণুগুলো জোরে কাঁপতে শুরু করে এবং একে অপরকে ধাক্কা দেয়।
২. পৃথিবীতে দীর্ঘতম গ্রীষ্মকাল!
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে এক ভয়াবহ গ্রীষ্মকাল এসেছিল। তখন পৃথিবী হঠাৎ করেই প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময়ে ৫ হাজার বছরের ব্যবধানে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বেড়ে যায় প্রায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, এই তীব্র গরমে তখন পৃথিবীর গাছপালা ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারছিল না। ফলে উদ্ভিদরা বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করা কমিয়ে দেয়। সেই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ প্রায় ১ লাখ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়েছিল।
বর্তমানে পৃথিবী সেই সময়ের চেয়েও দশ গুণ দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে, যা আজকের উদ্ভিদজগতের টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলছে। গত ১৫০ বছরে আমাদের কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে। বাতাসের এই বাড়তি কার্বন ডাই-অক্সাইডের ফলে গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ডাক্তারের অভিজ্ঞতার এই অভাবের কারণে জুলাই মাসে রোগীদের মৃত্যুর হার ৮ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে! এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমে রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যায়।
৩. গ্রীষ্মকালে বজ্রপাত বেশি হয়
বছরের অন্য সময়ের চেয়ে গ্রীষ্মকালেই কেন আকাশে বেশি বজ্রপাতের ডাক শোনা যায়? আসলে বজ্রঝড় হওয়ার জন্য দুটি জিনিস খুব প্রয়োজন—বাতাসের তাপ ও জলীয় বাষ্প। গ্রীষ্মকালে রোদ ও গরমের কারণে মাটিসংলগ্ন বাতাস বেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই গরম বাতাসে যখন প্রচুর জলীয় বাষ্প মেশে, তখন তা হালকা হয়ে দ্রুত বায়ুমণ্ডলের ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে। ওপরে গিয়ে এই বাষ্প থেকেই বড় বড় মেঘ তৈরি হয়। সেই মেঘ পরে বজ্রঝড় ও বিদ্যুৎ চমকানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রীষ্মের উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুপ্রবাহের কারণেই মূলত এই সময়, বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় আর্দ্র এলাকাগুলোতে বজ্রঝড় বেশি দেখা দেয়। এই সময়ই বেশি বজ্রপাতে আহত ও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
৪. জুলাই মাসে হাসপাতালে মৃত্যুর হার বাড়ে
অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় জুলাই মাসে হাসপাতালে চিকিৎসার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। বিশেষ করে যেসব হাসপাতালে নতুন ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেখানে এই ঝুঁকি বেশি লক্ষ করা যায়। কারণ, জুলাই মাসে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা তাঁদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য হাসপাতাল ছেড়ে যান এবং তাঁদের জায়গায় সম্পূর্ণ নতুন ও অনভিজ্ঞ মেডিকেল শিক্ষার্থীরা কাজে যোগ দেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অভিজ্ঞতার এই অভাবের কারণে জুলাই মাসে রোগীদের মৃত্যুর হার ৮ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে! এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমে রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। তীব্র দাবদাহের কারণে এই সময়ে মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে হাসপাতালে জরুরি বিভাগে আসা জটিল রোগীর চাপ বাড়ে।
গ্রীষ্মের উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুপ্রবাহের কারণেই মূলত এই সময়, বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় আর্দ্র এলাকাগুলোতে বজ্রঝড় বেশি দেখা দেয়।
৫. জন্মের ঋতু কি শিশুর মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে
ইউরোপিয়ান কলেজ অব নিউরোসাইকোফার্মাকোলজির ২০১৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালে জন্ম নেওয়া শিশুদের মেজাজ দ্রুত পরিবর্তনের প্রবণতা বেশি থাকে। অন্যদিকে, শীতকালে জন্ম নেওয়া শিশুরা সাধারণত বেশি শান্ত প্রকৃতির হয়। বিজ্ঞানীরা এর সঠিক কারণ সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তবে তাঁরা ধারণা করছেন, ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারগুলো জন্মের ঋতু দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। অবশ্য জন্মের ঋতু যা-ই হোক না কেন, এটিই মানুষের মেজাজ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র কারণ নয়।
৬. গরমে ইনসুলিন দ্রুত কাজ করে
যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, গ্রীষ্মকালের অতিরিক্ত গরমে তাঁদের ইনসুলিন নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তীব্র গরমে আমাদের শরীরের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়ে যায়। ফলে ইনজেকশন দেওয়ার পর ইনসুলিন শরীরের রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত মিশে যেতে পারে। রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ খুব বেশি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই সমস্যা এড়াতে ইনসুলিন নেওয়ার আগে কয়েক মিনিট ঠান্ডা পরিবেশে থেকে শরীর শীতল করে নেওয়া উচিত। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, কার্যকারিতা বজায় রাখতে ইনসুলিনের তাপমাত্রা অবশ্যই ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে রাখা জরুরি।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারগুলো জন্মের ঋতু দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
৭. বিশ্বের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা
এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ কত ডিগ্রি তাপমাত্রা অনুভব করেছেন? সাধারণত তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার করলেই আমরা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যাই। কিন্তু ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই পৃথিবীর তাপমাত্রা পৌঁছেছিল অসহনীয় প্রায় ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালির ফার্নেস ক্রিকে এটি রেকর্ড করা হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রার এই বিশ্ব রেকর্ডটি ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উত্তর গোলার্ধের অন্যতম উষ্ণতম এই স্থানে প্রতিবছর গড় তাপমাত্রা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। বাংলাদেশের তাপমাত্রার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্বাধীনতার আগে ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকাতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই রেকর্ডের দীর্ঘ ৫৪ বছর পর ২০১৪ সালের ১৪ ও ২৩ এপ্রিল ঢাকার তাপমাত্রা আবার ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়। সেদিন থার্মোমিটারের পারদ উঠেছিল ৪০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ঠিক একই তাপমাত্রা অর্থাৎ ৪০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস আবারও রেকর্ড করা হয় ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিলে।