কার্গো কাল্ট সায়েন্স: তথ্যের ভিড়ে সত্য খোঁজার গল্প
বিমান নামছে। রানওয়ের পাশে বাঁশের তৈরি টাওয়ার। কানে কাঠের হেডফোন। আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়ার সংকেত পাঠানো হচ্ছে আকাশে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনো ছোট্ট দ্বীপে সত্যিই বিমান অবতরণের প্রস্তুতি চলছে। অথচ বাস্তবে সেখানে নেই কোনো বিমানবন্দর, নেই কোনো যোগাযোগব্যবস্থা। আছে শুধু অনুকরণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু দ্বীপে মার্কিন ও জাপানি সেনারা ঘাঁটি গড়েছিল। তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল টিনের খাবার, ওষুধ, কাপড়সহ নানা ধরনের আধুনিক জিনিস। যুদ্ধ শেষে সেনারা চলে গেলে দ্বীপবাসীরা ভাবল, এই ‘উপহার’ আবার ফেরত আনতে হলে সেনাদের আচরণ অনুকরণ করতে হবে। তাই তারা কাঠ দিয়ে বানাল নকল রেডিও, বাঁশ দিয়ে তৈরি করল কন্ট্রোল টাওয়ার, সৈনিকদের মতো মার্চ করল। তারা বিশ্বাস করত, তাহলেই আবার আকাশ থেকে নেমে আসবে সেই সম্পদভর্তি বিমান। এই ঘটনাকেই বলা হয় কার্গো কাল্ট।
১৯৭৪ সালে পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় এই কার্গো কাল্টের গল্প টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্য ছিল খুব সহজ, কিন্তু ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বিজ্ঞান দেখতে বিজ্ঞানের মতো হলেও আসলে তা বিজ্ঞান নয়। বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হয়, কিন্তু ভেতরে সততা থাকে না। ফাইনম্যান এ ধরনের ভুয়া বা আধা-বিজ্ঞানকে বলেছিলেন কার্গো কাল্ট সায়েন্স।
আজকের পৃথিবীতে এই ধারণা আগের চেয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, আমরা এমন একসময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের চেয়ে দেখতে বিশ্বাসযোগ্য হওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৯৭৪ সালে পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যান ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় এই কার্গো কাল্টের গল্প টেনে আনেন। তাঁর বক্তব্য ছিল খুব সহজ, কিন্তু ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ।
ধরুন, কেউ ইউটিউবে দাঁড়িয়ে সাদা অ্যাপ্রন পরে বলছে, ‘এই পানীয় খেলে তিন দিনে ওজন কমবে।’ পেছনে ল্যাবের মতো সাজানো ঘর, হাতে চার্ট, মুখে জটিল বৈজ্ঞানিক শব্দ। দেখতে সবই বিজ্ঞানসম্মত। কিন্তু সত্যি কি তা-ই?
অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ লিখল, ‘বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন…’, কিন্তু কোন বিজ্ঞানী? কোথায় গবেষণা? কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল? সেসবের কোনো উত্তর নেই। তবু হাজার হাজার মানুষ তা বিশ্বাস করছে, শেয়ার করছে।
ফাইনম্যানের ভয়টা ছিল এখানেই। তিনি বলেছিলেন, বিজ্ঞান শুধু কিছু যন্ত্রপাতি, সূত্র বা পরীক্ষার নাম নয়। বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো সততা। বিশেষ করে নিজের ভুল খুঁজে বের করার সততা। তাঁর বিখ্যাত কথাগুলোর একটি ছিল: ‘দ্য ফার্স্ট প্রিন্সিপল ইজ দ্যাট ইউ মাস্ট নট ফুল ইয়োরসেলফ—অ্যান্ড ইউ আর দ্য ইজিয়েস্ট পারসন টু ফুল।’ অর্থাৎ, সবার আগে নিজেকে ঠকানো বন্ধ করতে হবে। কারণ, পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজে যাকে বোকা বানানো যায়, সে আপনি নিজেই।
শুনতে সহজ লাগলেও কাজটা খুব কঠিন। কারণ, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এমন তথ্য বিশ্বাস করতে চায়, যা তার নিজের মতের সঙ্গে মিলে যায়। কেউ যদি আগে থেকেই বিশ্বাস করে যে পৃথিবীর সব রোগের গোপন প্রাকৃতিক চিকিৎসা আছে, তাহলে সে ওই ধরনের ভিডিও বা পোস্ট খুব সহজেই বিশ্বাস করবে। আবার কেউ যদি মনে করে সব বিজ্ঞানী ষড়যন্ত্র করছেন, তাহলে সে যেকোনো ভুয়া তথ্যেও সত্যের গন্ধ খুঁজে পাবে।
ফাইনম্যান বলেছিলেন, বিজ্ঞান শুধু কিছু যন্ত্রপাতি, সূত্র বা পরীক্ষার নাম নয়। বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো সততা। বিশেষ করে নিজের ভুল খুঁজে বের করার সততা।
ফাইনম্যান বলেছিলেন, একজন সত্যিকারের বিজ্ঞানীকে নিজের প্রিয় ধারণাকেও সন্দেহ করতে জানতে হবে। শুধু যে তথ্য নিজের পক্ষে যায়, তা দেখলে হবে না; যে তথ্য বিপক্ষে যায়, সেটাও দেখতে হবে। এটাই আসলে বিজ্ঞানের সৌন্দর্য।
বিজ্ঞান কখনো শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার দাবি করে না। বরং বিজ্ঞান সব সময় বলে, এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে মনে হচ্ছে…। অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন করার জায়গা আছে, ভুল ধরার জায়গা আছে, নতুন তথ্য এলে মত বদলানোর জায়গা আছে। কিন্তু কার্গো কাল্ট সায়েন্সে এই জায়গাগুলো থাকে না। সেখানে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পরে তার পক্ষে প্রমাণ খোঁজা হয়।
আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পপ সায়েন্স নামে যে জিনিস দেখা যায়, তার অনেক অংশই এই সমস্যায় ভোগে। চটকদার শিরোনাম, অতিরঞ্জিত দাবি, বিজ্ঞান বলছে ধরনের বাক্য—এসব খুব দ্রুত মানুষের মনোযোগ কাড়ে। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, অনেক সময় তথ্য অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর বা একেবারেই ভুল।
মজার ব্যাপার হলো, ফাইনম্যান শুধু অন্যদের সমালোচনা করেননি। তিনি বিজ্ঞানীদেরও সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, গবেষণা করতে গিয়ে নিজের ফলাফলকে বেশি সুন্দর দেখানোর লোভ থেকেও সাবধান থাকতে হবে। যদি কোনো পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না আসে, সেটাও সৎভাবে প্রকাশ করতে হবে। কারণ, সত্যিকারের বিজ্ঞান জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কাজ করে না; সত্য খোঁজার জন্য কাজ করে।
বিজ্ঞান কখনো শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার দাবি করে না। বরং বিজ্ঞান সব সময় বলে, এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে মনে হচ্ছে…। অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন করার জায়গা আছে, ভুল ধরার জায়গা আছে।
ফাইনম্যানের এই কথাগুলো শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও জরুরি। কারণ, এখন আমরা সবাই একেকজন তথ্যভোক্তা। প্রতিদিন অসংখ্য খবর, ভিডিও, পোস্ট, ফ্যাক্ট, স্টাডি আমাদের সামনে আসছে। সবকিছু যাচাই করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু অন্তত প্রশ্ন করা সম্ভব। যেমন, এটার উৎস কী? এটা কি সত্যিই গবেষণায় প্রমাণিত? অন্য কোনো বিজ্ঞানী কি একই কথা বলছেন? এখানে কি অতিরঞ্জন আছে?
এই প্রশ্নগুলোই আমাদের ভুয়া তথ্যের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। কার্গো কাল্টের মানুষগুলো ভুল করেছিল, কারণ তারা ভেবেছিল শুধু বাহ্যিক আচরণ নকল করলেই ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, বিমানের পেছনে ছিল জটিল প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও বাস্তব কারণ।
আজও আমরা অনেক সময় একই ভুল করি। আমরা বিজ্ঞানের ভাষা নকল করি, কিন্তু বিজ্ঞানের মনোভাবটা ভুলে যাই। আর বিজ্ঞানের সেই মনোভাবের কেন্দ্রে আছে একটি কঠিন কিন্তু সুন্দর অভ্যাস—নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে পারা।