পারমাণবিক জ্বালানির দহন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রছবি: সংগৃহীত

পারমাণবিক জ্বালানিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়, মাত্র কয়েক শতাংশ। এর কারণ হলো চেইন রিঅ্যাকশন যাতে খুব দ্রুত সংঘটিত না হতে পারে, কোন দুর্ঘটনা পরিস্থিতি যাতে না ঘটে এবং নিজস্ব প্রয়োজন মতো চেইন রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

প্রিয় বন্ধু, তোমার কি মনে হয়, কোন ধরনের নিউট্রন দ্রুত না মন্থর ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসকে ভাঙ্গতে বেশি কার্যকরী? তুমি হয়তো দ্রুত নিউট্রনের কথা ভাবছ। কিন্তু বাস্তবে মন্থর নিউট্রনগুলোই বেশি কার্যকরী। ক্ষুদ্র পরমাণুর জগতে কত অদ্ভুত জিনিসই না আমরা দেখতে পাচ্ছি!

যদি মন্থর নিউট্রনগুলো ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াস ভাঙ্গার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে তবে আমাদের লক্ষ্য হবে দ্রুত নিউট্রনগুলোকে মন্থর নিউট্রনে রূপান্তর করা! এ জন্য ব্যবহৃত হয় গ্রাফাইট অথবা পানি। এগুলোর প্রভাবে নিউট্রনের গতি অনেকগুণ কমে আসে।

যেমনটি আমরা দেখি মানুষের ক্ষেত্রে যখন সে বুক পানিতে দৌড়ানোর চেষ্টা করে। যে সকল পারমাণবিক চুল্লিতে গতি মন্থরকারী পদার্থ ব্যবহৃত হয় সেগুলো স্লো নিউট্রন বা থার্মাল নিউট্রন রিঅ্যাক্টর হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন
বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ছিল স্লো নিউট্রন রিঅ্যাক্টর। ১৯৫৪ সালে রাশিয়ার মস্কো শহরের অদূরে অবনিনস্কে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়।

জেনে রাখা ভালো, এমন চুল্লিও রয়েছে যেগুলোতে ব্যবহৃত হয় দ্রুত গতির নিউট্রন। রাশিয়ার উড়াল অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এখনও সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে এমন একটি এবং বিশ্বের একমাত্র 'ফাস্ট' রিয়‍্যাক্টর। পদার্থবিদরা স্লো নিউট্রন রিয়‍্যাক্টর নিয়েই প্রথম কাজ শুরু করেছিলেন। বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ছিল স্লো নিউট্রন রিঅ্যাক্টর। ১৯৫৪ সালে রাশিয়ার মস্কো শহরের অদূরে অবনিনস্কে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয়।

নিউট্রনের সাহায্যে পরমাণুর নিউক্লিয়াসতো ভাঙ্গা হলো.... তার পর কী? ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে দুটি নতুন পদার্থের পরমাণুর নিউক্লিয়াস সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই টুকরোগুলো হচ্ছে স্ট্রোনসিয়াম ধাতু এবং ভারী গ্যাস জেননের পরমাণুর নিউক্লিয়াস। আশ্চর্য ব্যাপার তাই না? একটি পদার্থ ভেঙ্গে এমন দুটি পদার্থ তৈরি হলো যেগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক পদার্থটির কোন মিলই নেই!

আরও পড়ুন
বিদ্যুৎ মোটরের সাহায্যে জাহাজের প্রপেলার ঘুরায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা ইলেকট্রিক তারের সাহায্যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

নিউক্লিয়াসের টুকরোগুলো নিউট্রনের মতোই দ্রুত গতিতে ছুটতে থাকে। কিন্তু নিউট্রনের মতো তারা অন্য পরমাণুকে আঘাত করে নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে ফেলে না। টুকরোগুলোর আঘাতে পরমাণুগুলোতে কম্পনের সৃষ্টি হয়। এই কম্পন ক্রমান্বয়ে দ্রুত হতে থাকে এবং যে জ্বালানি রডে এই পরমাণুগুলো অবস্থান করে তার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক সময় জ্বালানি রডটি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠে যে যদি এর সংস্পর্শে পানিসহ কোন পাত্র রাখা হয় তবে সেই পানি নিমিষেই বাষ্পীভূত হয়ে যাবে।

বিদ্যুৎ শক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের এই বাষ্পেরই দরকার ছিল। বাষ্প টারবাইনকে ঘুরাতে সাহায্য করে। টারবাইন বিদ্যুৎ জেনারেটরকে সচল করে এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। বিদ্যুৎ মোটরের সাহায্যে জাহাজের প্রপেলার ঘুরায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় তা ইলেকট্রিক তারের সাহায্যে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এই বিদ্যুতের সাহায্যেই বাসগৃহ, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে আলো জ্বলে। বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বিস্তৃত। আমাদের জীবনে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় এই বিদ্যুৎ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি অনেক স্বাচ্ছন্দ্যও বয়ে আনে সকলের জন্য।

কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবং

পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকা

আরও পড়ুন