কল্পনা কর যে, পরমাণুর কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে দুটি করে প্রোটন ও নিউট্রন রয়েছে। এগুলোকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে দুটি ইলেকট্রন। তুমি কি জানো, এটা কিসের পরমাণু? এই পরমাণুটি হচ্ছে হিলিয়ামের- যা সম্পূর্ণ নতুন একটি গ্যাস, যার সঙ্গে হাইড্রোজেন গ্যাসের কোনই মিল নেই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এরা বিপরীতধর্মী। হাইড্রোজেনের পরমাণু অনেক সামাজিক; কারণ এটি সহজেই অন্যান্য পরমাণুর সঙ্গে মিলিত হতে পারে। কিন্তু হিলিয়ামের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একেবারেই ভিন্ন। হিলিয়ামের পরমাণু অন্যকোন পদার্থের পরমাণুর সঙ্গে মিলিত হতে অনিচ্ছুক।
কি অদ্ভুত এই পরমাণু জগৎ! হাইড্রোজেনের পরমাণুতে একটি নিউট্রন যোগ করার ফলে পরমাণুটি কিছুটা ভারী হয়ে গেলেও এটি হাইড্রোজেনই থেকে যায়। আরো একটি নিউট্রন যোগ করলে পরমাণুটি আরো ভারী হয়ে যাবে, কিন্তু এর হাইড্রোজেন জাতীয় গুণাগুণে কোন পরিবর্তন আসবে না। কিন্তু একটি প্রোটন যোগ করার সঙ্গে সঙ্গে যেন জাদুদণ্ডের স্পর্শে সম্পূর্ণ ভিন্ন গুণাগুণসম্পন্ন নতুন একটি পরমাণুর আবির্ভাব ঘটে। প্রোটনের আকার ও ভর নিউট্রনের মতোই, তবে পার্থক্য এই যে, প্রোটনের চার্জ ধনাত্মক আর নিউট্রনের কোন চার্জ নেই। অর্থাৎ নিউট্রন হচ্ছে চার্জ নিরপেক্ষ। অতএব, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নিউট্রন যোগ করলে বা বের করে নিলে নিউক্লিয়াসের ইলেকট্রিক চার্জের কোন পরিবর্তন ঘটে না।
হাইড্রোজেনের পরমাণুতে একটি নিউট্রন যোগ করার ফলে পরমাণুটি কিছুটা ভারী হয়ে গেলেও এটি হাইড্রোজেনই থেকে যায়। আরো একটি নিউট্রন যোগ করলে পরমাণুটি আরো ভারী হয়ে যাবে।
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন যোগ করার ফলে এটির ইলেকট্রিক চার্জ দ্বিগুন হয়ে যায়। পরমাণুর গুণাগুণ সর্বপ্রথমে নির্ভর করে নিউক্লিয়াসের চার্জের ওপর।
প্রশ্ন জাগে ধনাত্মক চার্জযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও একই নিউক্লিয়াসে কিভাবে একাধিক প্রোটন অবস্থান করে?তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে, একই ধরনের চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে প্রোটনগুলো একসঙ্গে থাকার কথা নয় এবং সাধারণ হিসেবে নিউক্লিয়াস অবশ্যই ভেঙ্গে যেতে বাধ্য।
কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটি ভিন্ন। নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যায় না। অধিকন্তু, অনেক পরমাণুর নিউক্লিয়াস আশ্চর্যজনকভাবে স্থির ও শক্ত গাঁথুনিতে বাঁধা। নিশ্চই কোন একটি শক্তি রয়েছে যা প্রোটনগুলোকে নিউক্লিয়াসে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করে; যদিও এরা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে থাকে। পদার্থবিদরা এই শক্তির নাম দিয়েছেন নিউক্লীয় বল।
নিশ্চই কোন একটি শক্তি রয়েছে যা প্রোটনগুলোকে নিউক্লিয়াসে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করে; যদিও এরা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে থাকে। পদার্থবিদরা এই শক্তির নাম দিয়েছেন নিউক্লীয় বল।
এখন চল হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আরো চারটি করে প্রোটন ও নিউট্রন যুক্ত করি। এখন কি দাঁড়াল? নিউক্লিয়াসে এখন ছয়টি করে প্রোটন ও নিউট্রন রয়েছে। তোমার মতে এই নিউক্লিয়াসকে ঘিরে কয়টি ইলেকট্রন আবর্তিত হওয়া উচিত? হ্যাঁ ঠিক বলেছো, ছয়টি। নিউক্লিয়াসে যে কয়টি প্রোটন রয়েছে ততো সংখ্যকই রয়েছে ইলেকট্রন। এখন তুমি পেয়ে গেলে কার্বনের পরমাণু, যে বস্তুটির সঙ্গে তোমার নিয়মিত যোগাযোগ ঘটছে। উদাহরণস্বরূপ গ্রাফাইটের তৈরি পেন্সিলের শীষ। আর এই গ্রাফাইট তৈরি হয়েছে কার্বন পরমাণু দিয়ে।
আরো ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস সংযোজন সম্ভব। যেমন লোহা, যার নিউক্লিয়াসে ২৬টি প্রোটন ও ৩০টি নিউট্রন রয়েছে। সিলভারের ক্ষেত্রে প্রোটনের সংখ্যা ৪৭টি এবং নিউট্রনের সংখ্যা ৬১টি। সোনার নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৯৭টি প্রোটন ও ১১৮টি নিউট্রন। ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে এদের সংখ্যা কত?
ইউরেনিয়ামের পরমাণুকে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা যায়। যে কোন পরমাণুর মতোই এটির কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস, যার চারদিকে একটি সম্মানজনক দূরত্ব রেখে আবর্তিত হচ্ছে হালকা ইলেকট্রন। নিউক্লিয়াসে ঠাসাঠাসি করে অবস্থান করছে প্রোটন ও নিউট্রন। ইউরেনিয়ামের অধিকাংশ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৯২টি প্রোটন ও ১৪৬টি নিউট্রন (মোট ২৩৮)। কিন্তু কিছুসংখ্যক নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা ৯২টি হলেও নিউট্রনের সংখ্যা তিনটি কম, মাত্র ১৪৩টি (মোট ২৩৫)।
অন্য পরমাণুর মতোই ইউরেনিয়ামের কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস, যার চারদিকে একটি সম্মানজনক দূরত্ব রেখে আবর্তিত হচ্ছে হালকা ইলেকট্রন। নিউক্লিয়াসে ঠাসাঠাসি করে অবস্থান করছে প্রোটন ও নিউট্রন।
তোমার নিশ্চই মনে আছে, যে সকল পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা সমান থাকলেও নিউট্রনের সংখ্যা বিভিন্ন হয়; সেগুলোকে বলা হয় আইসোটোপ। পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সংখ্যা 'ভর সংখ্যা' হিসেবে পরিচিত এবং আইসোটোপের নামের সঙ্গে এই সংখ্যাটি যুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও ইউরেনিয়াম-২৩৫। প্রকৃতিতে ইউরেনিয়াম-২৩৮ এর তুলনায় ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর উপস্থিতি অনেক কম।
প্রিয় বন্ধু, আমরা এখন মূল বিষয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। এখন আমরা বুঝতে পারব কিভাবে পারমাণবিক শক্তি পাওয়া যায়। তুমি কি জানো, পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে কেন শুধুমাত্র ইউরেনিয়াম-২৩৫ ব্যবহার করা সম্ভব? কারণ হলো, এই পরমাণুর একটি বিস্ময়কর গুণ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরমাণুটি আপনা আপনি ভেঙ্গে দুটি টুকরো হয়ে যায়। এর ফলে নিউক্লিয়াস থেকে দুটি বা তিনটি নিউট্রন মুক্ত হয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে থাকে- প্রতি সেকেন্ডে লাখ কিলোমিটারেরও বেশি।
যখনই এই দ্রুত গতিসম্পন্ন নিউট্রন অন্য একটি ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াসে এসে আঘাত করে তখনই নিউক্লিয়াসটি ভেঙ্গে দুই টুকরো হয়ে যায়। মুক্ত হয় আরো নিউট্রন। নতুন এই নিউট্রনগুলো অন্য নিউক্লিয়াসে আঘাত করে এবং দুই টুকরো করে দেয়। এভাবে মুক্ত নিউট্রনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভেঙ্গে যাওয়া নিউক্লিয়াসের সংখ্যাও। এটাই হচ্ছে চেইন রিঅ্যাকশন। এই চেইন রিঅ্যাকশনের ফলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং প্রক্রিয়াটি ক্রমান্বয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। যার ফলে এক সময় বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।