অতিরিক্ত নিউট্রন কিভাবে আটকানো যায়

আমরা শীঘ্রই একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছব এবং মনোযোগের সঙ্গে তার কার্যক্রম দেখার ও বুঝার চেষ্টা করব। আমরা যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিদর্শন করব তা সমুদ্রের তীরে অবস্থিত। কিন্তু এই মুহূর্তে দেখব আমাদের চুল্লির কি অবস্থা, কি ঘটছে সেই কম্পনশীল ইউরেনিয়াম পরমাণুর সঙ্গে।

তোমার কি মনে আছে, আমি বলেছিলাম যখন একটি নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে আঘাত করে ভেঙ্গে দেয় তখন দুই/তিনটি নিউট্রন ছুটে বেরিয়ে আসে। এই তিনটি নিউট্রন আরও তিনটি পারমাণুকে ভেঙ্গে দেয়।

ধরা যাক, প্রতিটি ভেঙ্গে যাওয়া নিউক্লিয়াস থেকে আবারো তিনটি করে নিউট্রন বেরিয়ে আসছে। ফলে আমরা পাচ্ছি ৯টি নতুন নিউট্রন... এ ভাবেই প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। ভেঙ্গে যাওয়া নিউক্লিয়াস থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসা নিউট্রনের সংখ্যা এবং উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে। এমনভাবে চলতে থাকলে চুল্লিটি নিজেই অত্যন্ত গরম হয়ে এক সময় গলে যেতে পারে! ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর সঙ্গে মজা করার কোন সুযোগ নেই। একে সব সময় চোখে চোখে রাখতে হয়।

এ জাতীয় বিপদ থেকে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে? খুব সোজা, এ জন্য পারমাণবিক বিক্রিয়াটিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে।

আরও পড়ুন
পারমাণুবিক চুল্লিতে বোরন-১০ এবং ক্যাডমিয়ামের পরমাণু যুক্ত করলে তারা প্রায় সকল মুক্ত নিউট্রনকে শুষে নেয়। এর ফলে চুল্লির কার্যক্রম মন্থর হয়ে যায়- যেমনটি ঘটে জ্বলন্ত চুলায় পানি ঢালার ফলে।

পরমাণুর বিস্ময়কর জগতে এমন বিশেষজ্ঞ আছেন- যারা পারমাণবিক চুল্লিতে শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। তারা নিউট্রনকে ইচ্ছামতো ছোটাছুটি করতে দেন না এবং তৎসংখ্যক নিউট্রনকেই মুক্ত অবস্থায় থাকতে দেন যতগুলো প্রয়োজন- কম বা বেশি নয়! বোরন নামক একটি পদার্থ আছে, যার পরমাণু চেইন রিঅ্যাকশন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। কিন্তু বোরনের সব পরমাণুই এটি করতে সক্ষম নয়। দুটি আইসোটোপ বোরন-১০ এবং বোরন-১১কে এ কাজে ব্যবহারের চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

বোরন-১০ তার পাশ দিয়ে যখনই কোন নিউট্রন অতিক্রম করে তখনই সেটিকে আটকে ফেলে এবং নিউট্রনটিকে নিজের নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। কিন্তু বোরন-১১ নিউট্রনকে না আটকিয়ে বরং দূরে ঠেলে দেয়। ফলে কি দেখা যাচ্ছে? অতিরিক্ত নিউট্রন থেকে মুক্তি পেতে বোরন-১০ই শুধুমাত্র আমাদের সহায়তা করতে পারে।

বোরন-১০ ছাড়াও আরো কয়েকটি পদার্থ রয়েছে- যাদের পরমাণু নিউট্রনকে আটকে দিতে সক্ষম, যেমন ক্যাডমিয়াম ধাতু। পারমাণুবিক চুল্লিতে বোরন-১০ এবং ক্যাডমিয়ামের পরমাণু যুক্ত করলে তারা প্রায় সকল মুক্ত নিউট্রনকে শুষে নেয়। এর ফলে চুল্লির কার্যক্রম মন্থর হয়ে যায়- যেমনটি ঘটে জ্বলন্ত চুলায় পানি ঢালার ফলে।

আরও পড়ুন
বোরন-১০ তার পাশ দিয়ে যখনই কোন নিউট্রন অতিক্রম করে তখনই সেটিকে আটকে ফেলে এবং নিউট্রনটিকে নিজের নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়।

যে পদার্থগুলোর কথা উল্লেখ করলাম এগুলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী রড তৈরি করার পর চুল্লিতে স্থাপন করা হয়। নিয়ন্ত্রণকারী রডগুলো যখন সম্পূর্ণভাবে চুল্লির ভেতর অবস্থান করে তখন কোন চেইন রিঅ্যাকশন ঘটতে পারে না। কি ঘটবে, যদি এই নিয়ন্ত্রণকারী রডগুলোকে কিছুটা বের করে আনা হয়?

নিউট্রন শোষণের পরিমাণ কমে যাবে, কিছুসংখ্যক নিউট্রন মুক্ত হয়ে চেইন রিঅ্যাকশনের সূচনা করবে এবং ইউরেনিয়াম উত্তপ্ত হতে থাকবে। যদি রডগুলোকে আরও বেশি বের করে আনা হয় তখন মুক্ত নিউট্রনের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর বিভাজন প্রক্রিয়া আরও গতি লাভ করবে। এর ফলে ইউরেনিয়াম-২৩৫ আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। রডগুলোকে যদি আবার ঢুকিয়ে দেয়া হয় তবে মুক্ত নিউট্রনের সংখ্যা কমে আসবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর বিভাজন প্রক্রিয়াও মন্থর হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন
ইস্পাতে বোরন-১১ পরমাণু যুক্ত করে আমরা চুল্লির জন্য প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করতে পারি। এর ফলে একটি নিউট্রনও দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসতে পারবে না।

ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণুর বিভাজনকারী মুক্ত নিউট্রন অনেক বিপজ্জনক; কারণ এগুলো আমাদের শরীর যে সকল পরমাণু দিয়ে গঠিত সেগুলোকেও ভেঙ্গে দিতে পারে। এই মুক্ত নিউট্রন থেকে আমরা কিভাবে রক্ষা পেতে পারি? এ জন্য বিশেষ পরমাণু যুক্ত ঢাল ব্যবহার করতে হবে। এই পরমাণুগুলো নিউট্রনকে বিকর্ষণ করে দূরে ঠেলে দেবে।

বোরন-১১ পরমাণুর কথা মনে আছে তো? ইস্পাতে বোরন-১১ পরমাণু যুক্ত করে আমরা চুল্লির জন্য প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করতে পারি। এর ফলে একটি নিউট্রনও দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসতে পারবে না। কারণ দেয়ালের কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে বোরন-১১ পরমাণু নিউট্রনগুলোকে বিকর্ষণ করে দূরে ঠেলে দেবে।

কৃতজ্ঞতা: রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন- রোসাটম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন

এনআইএইপি- এএসই, রাশিয়া এবং

পরমাণু শক্তি তথ্য কেন্দ্র, ঢাকা

আরও পড়ুন