মুভির মতো সংঘর্ষের পর গাড়ি কি সত্যিই বিস্ফোরিত হতে পারে
রাতের অন্ধকার চিরে তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছে একটি কালো স্পোর্টস কার। পেছনের পুলিশের সাইরেন ও টায়ারের ঘর্ষণের শব্দে কান পাতা দায়। হঠাৎ সামনের বাঁক ঘুরতেই একটা বিশাল ট্রাক। ব্রেক কষার আগেই সজোরে ধাক্কা, চোখের পলকে গাড়িটা শূন্যে কয়েক পাল্টি খেয়ে আছড়ে পড়ল রাস্তার ওপর। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ, এরপরই কানফাটানো শব্দে বিশাল এক বিস্ফোরণ! দাউদাউ করে জ্বলে উঠল বিশাল আগুনের কুণ্ডলী। সেই লেলিহান শিখা পেছনে রেখে স্লো-মোশনে হেঁটে বেরিয়ে এল নায়ক।
পরিচিত লাগছে দৃশ্যটা? হ্যাঁ, হলিউডের ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস অ্যাকশন মুভিতে এমন একটি দৃশ্য আছে। জেমস বন্ডের মুভিতেও এমন দৃশ্য অহরহ দেখা যায়। বাংলা কিংবা হিন্দি মুভিতেও এমন দৃশ্যের অভাব নেই। পর্দার এই দৃশ্যগুলো যতটা রোমাঞ্চকর, ততটাই ভয়ংকর। কিন্তু পর্দা থেকে চোখ সরানোর পর কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, বাস্তবেও কি দুই গাড়ির সংঘর্ষের পর সত্যিই এমন বিকট বিস্ফোরণ ঘটতে পারে? নাকি পুরো ব্যাপারটাই পরিচালকের ক্যামেরার কারসাজি? গাড়ি দুর্ঘটনায় সত্যিই কি এভাবে বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে?
কোনো গাড়ি বাতাসে উড়ে যাবে কি না, তা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে বিস্ফোরণ আসলে কী। আমাদের চারপাশের সব শক্তি ও তাপের খেলা চলে পদার্থবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা তাপগতিবিদ্যা বা থার্মোডাইনামিকসের নিয়মে। সহজ কথায়, তাপগতিবিদ্যার চোখে বিস্ফোরণ হলো একটি নির্দিষ্ট আবদ্ধ স্থানে অত্যন্ত দ্রুত আয়তনের প্রসারণ এবং তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শক্তির মুক্তি।
একটি সাধারণ গাড়ির ইঞ্জিন তাপগতিবিদ্যার সূত্র অনুসারেই কাজ করে। এটিকে ৪টি ধাপের একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যে কারণে একে ৪-স্ট্রোক ইঞ্জিন বলা হয়।
একটি সফল বিস্ফোরণ ঘটতে হলে মূলত তিনটি জিনিসের মেলবন্ধন প্রয়োজন—পুড়তে পারে এমন দাহ্য গ্যাস বা বাষ্প, আগুন জ্বলার প্রধান উপাদান অক্সিজেন এবং আগুন ধরানোর জন্য একটি স্ফুলিঙ্গ বা ইগনিশন সোর্স। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটতে হবে একটি আবদ্ধ বা উচ্চ চাপযুক্ত স্থানে।
শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, আপনার গাড়িটি কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য ছোট ছোট বিস্ফোরণের ওপর ভর করেই রাস্তা দিয়ে ছুটে চলে! একটি সাধারণ গাড়ির ইঞ্জিন তাপগতিবিদ্যার সূত্র অনুসারেই কাজ করে। এটিকে ৪টি ধাপের একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবা যেতে পারে, যে কারণে একে ৪-স্ট্রোক ইঞ্জিন বলা হয়। এর প্রথম ধাপে সিলিন্ডারের ভেতরে বাতাস ও জ্বালানির (গ্যাসোলিন) মিশ্রণ টেনে নেওয়া হয়, যাকে বলে ইনটেক বা গ্রহণ। দ্বিতীয় ধাপে পিস্টনটি ওপরে উঠে সেই মিশ্রণকে একদম চেপে ছোট করে ফেলে, যাকে বলা হয় কম্প্রেশন বা সংকোচন।
ঠিক এই সময়ে স্পার্ক প্লাগ থেকে একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ ছিটকে বের হয় এবং সংকুচিত গ্যাস ও অক্সিজেনের মিলনে ঘটে একটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ। এই পাওয়ার স্ট্রোকের ধাক্কায় পিস্টন নিচে নেমে যায় এবং গাড়ি চলার কার্যকর শক্তি পায়। সবশেষে এক্সস্ট বা নিষ্কাশন ধাপে পুড়ে যাওয়া গ্যাস বাইরে বের হয়ে যায়। হাইওয়েতে চলার সময় এই চারটি ধাপ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ বার ঘটে, যা ক্র্যাঙ্কশ্যাফটে টর্ক বা ঘোরানোর বল সৃষ্টি করে গাড়িকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়।
আধুনিক গাড়ির ফুয়েল ট্যাংকগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে গ্যাসোলিনের এই বাষ্প ট্যাংকের ভেতরেই সুরক্ষিত থাকে এবং বাইরের কোনো আগুনের সংস্পর্শে আসতে না পারে।
গাড়ির ভেতরে যখন এত এত ছোট বিস্ফোরণ হচ্ছেই, তাহলে কোনো বড় ধাক্কা লাগলে পুরো গাড়ি কেন বোমার মতো ফেটে পড়ে না? এর পেছনে রয়েছে চমৎকার কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ। প্রথমত, তরল গ্যাসোলিন নিজে সরাসরি বিস্ফোরিত হতে পারে না। বিস্ফোরণ ঘটাতে হলে একে বাষ্পে পরিণত হতে হবে এবং বাতাসে এর পরিমাণ হতে হবে মাত্র ১.৪ থেকে ৭.৬ শতাংশের মতো একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে। আধুনিক গাড়ির ফুয়েল ট্যাংকগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে এই বাষ্প ট্যাংকের ভেতরেই সুরক্ষিত থাকে এবং বাইরের কোনো আগুনের সংস্পর্শে আসতে না পারে।
দ্বিতীয়ত, বিস্ফোরণের জন্য উচ্চ চাপ প্রয়োজন; কিন্তু গাড়ির ফুয়েল ট্যাংক শুধু জ্বালানি ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়, উচ্চ চাপ তৈরি করার জন্য নয়। কোনো কারণে ট্যাংক লিক হলে বাষ্প বাইরে খোলা বাতাসে উড়ে যায়। ফলে আবদ্ধ পরিবেশ না থাকায় সেখানে কোনো চাপ তৈরি হতে পারে না। তাই হলিউডের মুভিতে গাড়ি যেভাবে ধাক্কা খেয়েই বিশাল আগুনের গোলা তৈরি করে, বাস্তবে তেমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তরল গ্যাসোলিন সরাসরি বিস্ফোরিত হতে পারে না। বিস্ফোরণ ঘটাতে হলে একে বাষ্পে পরিণত হতে হবে এবং বাতাসে এর পরিমাণ হতে হবে মাত্র ১.৪ থেকে ৭.৬ শতাংশের মতো একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, সংঘর্ষ না হলেও গাড়িতে যদি কোনোভাবে আগুন লেগে যায়, তখন কি সেটি ফাটবে? এর উত্তর হলো—না, গাড়িটি শুধু জ্বলবে, কিন্তু ফাটবে না। বাস্তবে গাড়িতে আগুন লাগলে তা বোমার মতো বিস্ফোরিত না হয়ে বরং ধীরে ধীরে কমলা রঙের শিখা ও কালো ধোঁয়া তৈরি করে পুড়তে থাকে। কারণ, লিক হওয়া বা উত্তপ্ত হয়ে বেরিয়ে আসা জ্বালানি খোলা বাতাসের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুড়ে শেষ হয়ে যায়, কোনো চাপ তৈরি করার সুযোগ পায় না। এমনকি পরিসংখ্যান বলছে, গাড়ির বেশির ভাগ আগুন ফুয়েল ট্যাংক থেকে শুরুই হয় না!
প্রায় ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ির আগুন লাগে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এবং ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে। ইঞ্জিন বা চাকার কাছাকাছি এমন আগুন লাগলে তা ধীরে ধীরে প্লাস্টিক, তার ও ফায়ারওয়াল পুড়িয়ে পুরো গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গাড়িটি পুড়ে ছাই বা কালো খোলস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু আকাশে উড়ে যাবে না।
ডিসকভারি চ্যানেলের বিখ্যাত টিভি শো মিথবাস্টার্স তাদের পরীক্ষায় প্রমাণ করেছে, কোনো রকম কৃত্রিম বিস্ফোরক বা পাইরোটেকনিকস ব্যবহার না করলে সাধারণ পেট্রলচালিত গাড়িকে মুভির মতো বিস্ফোরিত করা এককথায় অসম্ভব।
পরিসংখ্যান বলছে, গাড়ির বেশির ভাগ আগুন ফুয়েল ট্যাংক থেকে শুরুই হয় না! প্রায় ৪৫ শতাংশ ক্ষেত্রে গাড়ির আগুন লাগে সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এবং ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে।
তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সমীকরণও এখন কিছুটা বদলে যাচ্ছে। আজকের দিনের ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভির ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন হতে পারে। ইভিতে ব্যবহৃত হয় শক্তিশালী লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনায় যদি এই ব্যাটারি প্যাকের ভেতরের সেলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা শর্টসার্কিট হয়, তবে সেখানে থার্মাল রানঅ্যাওয়ে নামে একটি বিপজ্জনক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হতে পারে।
ফলে ব্যাটারির ভেতরে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয় এবং অত্যন্ত দাহ্য গ্যাস নির্গত হতে থাকে। এই গ্যাস বদ্ধ ব্যাটারি প্যাকের ভেতরে উচ্চ চাপ সৃষ্টি করে রকেটের মতো তীব্র আগুনের শিখা তৈরি করতে পারে, যা দেখতে অনেকটা বিস্ফোরণের মতোই মনে হয়। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, ইভির এই আগুন একবার নিভিয়ে ফেলার কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার জ্বলে উঠতে পারে! তখন হাজার হাজার গ্যালন পানি দিয়েও দমকলকর্মীদের পক্ষে তা নেভানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।