বোতলের শেষ তেলের ফোটাটি কখন পড়বে, তা বের করলেন পদার্থবিজ্ঞানীরা
শ্যাম্পুর বোতলটি উল্টো করে রেখে অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছেন, কখন শেষ ফোঁটাটি পড়বে। গোসল করতে গিয়ে অনেক সময় এমনটা হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের এই বিরক্তিকর অপেক্ষার পেছনে কিন্তু কোনো জাদু নেই, আছে পদার্থবিজ্ঞানের ফ্লুইড ডায়নামিকস বা প্রবাহী গতিবিদ্যা!
এত দিন আমরা কেবল আন্দাজ করতাম কখন শেষ ফোঁটা পড়বে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানীরা নিখুঁত অঙ্ক কষে বের করেছেন, ঠিক কতক্ষণ অপেক্ষা করলে বোতলের ওই শেষ বিন্দুটি নিচে গড়িয়ে পড়বে!
গবেষক জে ট্যাং এবং থমাস দত্ত সম্প্রতি ফিজিকস অব ফ্লুইডস নামে একটি জার্নালে তাঁদের এই দারুণ গবেষণার কথা জানিয়েছেন। এই পুরো ব্যাপারটি বুঝতে হলে আপনাকে নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র এবং ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ নামে একটি গাণিতিক সূত্রের সাহায্য নিতে হবে।
নামটা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বিষয়টা সহজে বুঝিয়ে বলছি। ধরুন, আপনি মেঝেতে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিলেন। পানিটা মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু আপনি যদি পানির বদলে এক চামচ মধু ঢালেন, তবে সেটা খুব ধীরে ধীরে গড়াবে। কারণ, ঘন তরলের ভেতরের কণাগুলোর মধ্যে নিজেদেরই একধরনের ঘর্ষণ বা বাধা কাজ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় তরলের এই আঠালো স্বভাবটিকে বলা হয় সান্দ্রতা। ন্যাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণটি মূলত এই সান্দ্রতার ওপর ভিত্তি করেই হিসাব করে, কোনো তরল কত দ্রুত বা কত ধীরে গড়াবে।
ঘন তরলের ভেতরের কণাগুলোর মধ্যে নিজেদেরই একধরনের ঘর্ষণ বা বাধা কাজ করে। বিজ্ঞানের ভাষায় তরলের এই আঠালো স্বভাবটিকে বলা হয় সান্দ্রতা।
এই অদ্ভুত গবেষণার পেছনেও আছে দারুণ মজার এক গল্প! থমাস দত্ত জানান, তিনি প্রায়ই দেখতেন তাঁর দাদি বোতল থেকে শেষ ফোঁটাটি বের করার জন্য অনেকক্ষণ ধরে কসরত করতেন। অন্যদিকে, জে ট্যাংয়ের সমস্যা ছিল তাঁর রান্নাঘরের লোহার কড়াই নিয়ে। ট্যাং কড়াই ধোয়ার পর কখনোই কাপড় দিয়ে মুছতেন না, কারণ এতে কড়াইয়ের গায়ে লেগে থাকা তেলের প্রলেপ নষ্ট হয়ে যায়। আবার পানি জমে থাকলে মরিচা ধরারও ভয় থাকে। তাই তিনি কড়াইটি একটু কাত করে রেখে দিতেন, যাতে সব পানি গড়িয়ে পড়ে যায়। এই ছোট ছোট দৈনন্দিন সমস্যাগুলো থেকেই তাঁরা তরলের প্রবাহ নিয়ে এই গবেষণা করার সিদ্ধান্ত নেন।
হিসাব-নিকাশ শেষে তাঁরা একটি মজার পরীক্ষা চালালেন। একটি প্লেটকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে কাত করে রাখলেন। তারপর সেই প্লেটের ওপর পানি, দুধ, ঘি এবং অলিভ অয়েলের মতো বিভিন্ন ঘনত্বের তরল ঢেলে দিলেন। তাঁরা মাপতে চাইলেন, তরলের ঠিক ৯০ শতাংশ প্লেট থেকে গড়িয়ে পড়ে যেতে কতটুকু সময় লাগে।
ফলাফলে দেখা গেল, তাঁদের গাণিতিক হিসাব একদম নিখুঁত! প্লেট থেকে পানির ৯০ শতাংশ গড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু ঘন ম্যাপল সিরাপের ক্ষেত্রে এই একই পরিমাণ নিচে পড়তে সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা!
ট্যাং কড়াই ধোয়ার পর কখনোই কাপড় দিয়ে মুছতেন না, কারণ এতে কড়াইয়ের গায়ে লেগে থাকা তেলের প্রলেপ নষ্ট হয়ে যায়। আবার পানি জমে থাকলে মরিচা ধরারও ভয় থাকে।
এই ফলাফল দেখে গবেষক জে ট্যাং নিজেই একটু হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত কড়াই ধোয়ার পর এক বা দুই মিনিট অপেক্ষা করেই সেটা তুলে রাখতাম। কিন্তু এখন অঙ্কের হিসাব বলছে, আমার কড়াইয়ের পানি পুরোপুরি গড়িয়ে পড়ার জন্য আমাকে অন্তত ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে! আমাকে আসলে আরও অনেক বেশি ধৈর্যশীল হতে হবে।’
শুনতে রান্নাঘরের সাধারণ ঘটনা মনে হলেও ট্যাং এবং দত্তের এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু থালাবাসন পরিষ্কার করা নয়! জে ট্যাং মূলত জীবপদার্থবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন। ভেজা পৃষ্ঠে বা তরলের ওপর ব্যাকটেরিয়া কীভাবে কাজ করে এবং বেড়ে ওঠে, তা বোঝার জন্যই তাঁরা এই সমীকরণগুলো ব্যবহার করবেন।