দড়ি ছিঁড়লে ঢিল যায় কোথায়
ছোটবেলায় কি কখনো সুতোয় ঢিল বেঁধে মাথার ওপর বনবন করে ঘুরিয়েছেন? কিংবা মেলায় গিয়ে নাগরদোলায় চড়ার সময় মনে হয়েছে, কেউ আপনাকে বাইরের দিকে ঠেলে ফেলে দিতে চাইছে? বিজ্ঞানের ভাষায় অতি চেনা এই অনুভূতিগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে কেন্দ্রমুখী বল ও কেন্দ্রবিমুখী বল।
সহজ করে বললে, কোনো বস্তুকে যখন সোজা পথে চলতে না দিয়ে জোর করে বাঁকা পথে বা বৃত্তাকারে ঘোরানো হয়, তখন যে বল তাকে সব সময় কেন্দ্রের দিকে টেনে ধরে রাখে, সেটিই হলো কেন্দ্রমুখী বল।
ভেবে দেখুন তো, মহাকাশে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে কেন ঘুরছে? নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, সূর্যের মহাকর্ষ বল এখানে ঠিক ওই অদৃশ্য সুতোর মতোই কাজ করে। এটি গ্রহগুলোকে অবিরাম কেন্দ্রের দিকে, অর্থাৎ সূর্যের দিকে টেনে রাখছে। যদি এই কেন্দ্রমুখী বল হঠাৎ উধাও হয়ে যেত, তবে গ্রহগুলো আর বৃত্তাকারে ঘুরত না; বরং রকেটের মতো সোজা পথে মহাকাশের অজানায় হারিয়ে যেত!
সুতোয় ঘোরানো ঢিলের দড়ি ছিঁড়ে গেলেও ঠিক এই ঘটনাই ঘটে। ঢিলটি বৃত্তাকার পথ ছেড়ে সোজা ছিটকে বেরিয়ে যায়।
টেনিস বলকে সুতোয় বেঁধে ঘোরালে আপনার হাত সুতোর মাধ্যমে যে টান বলের ওপর প্রয়োগ করে, সেটিই হলো এই কেন্দ্রমুখী বল। গাণিতিক ভাষায় একে আমরা লিখি: F = mv2/r। এখানে m মানে বস্তুর ভর, v মানে বেগ এবং r হলো বৃত্তাকার পথের ব্যাসার্ধ।
নিউটনের সূত্র অনুযায়ী, সূর্যের মহাকর্ষ বল এখানে ঠিক ওই অদৃশ্য সুতোর মতোই কাজ করে। এটি গ্রহগুলোকে অবিরাম কেন্দ্রের দিকে, অর্থাৎ সূর্যের দিকে টেনে রাখছে।
কেন মনে হয় বাইরের দিকে ছিটকে যাচ্ছি
অনেকেই কেন্দ্রমুখী বলের সঙ্গে কেন্দ্রবিমুখী বল গুলিয়ে ফেলেন। আপনি যখন রোলার কোস্টারে চড়ে উল্টো হয়ে লুপ পার করেন, তখন মনে হয় এক অদৃশ্য হাত আপনাকে সিটের সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছে কিংবা বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেউ আপনাকে ধাক্কা না দেওয়া সত্ত্বেও এই যে আপনি এক অদৃশ্য বল অনুভব করছেন, বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ছদ্ম বা মেকি বল!
আসলে আমাদের শরীরের জড়তা সব সময় চায় সোজা পথে চলতে। কিন্তু রোলার কোস্টার বা নাগরদোলা যখন হুট করে বাঁক নেয়, তখন আমাদের শরীর সেই আগের সোজা পথেই গতিশীল থাকতে চায়। শরীরের এই সোজা চলতে চাওয়ার প্রবণতা এবং বৃত্তাকার পথের রশি টানাটানির কারণেই আমরা বাইরের দিকে একটি কাল্পনিক ধাক্কা বা কেন্দ্রবিমুখী বল অনুভব করি।
আসলে আমাদের শরীরের জড়তা সব সময় চায় সোজা পথে চলতে। কিন্তু রোলার কোস্টার যখন হুট করে বাঁক নেয়, তখন আমাদের শরীর সেই আগের সোজা পথেই গতিশীল থাকতে চায়।
নিউটনের তৃতীয় সূত্র ও টেনিস বলের গল্প
নিউটনের সেই বিখ্যাত তৃতীয় সূত্রটি মনে আছে? প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। সুতোয় বাঁধা টেনিস বলটির ক্ষেত্রেও এই সূত্র নিখুঁতভাবে কাজ করে। আপনি যখন বলটিকে কেন্দ্রের দিকে টানছেন, তখন টেনিস বলটিও আপনাকে সমান বলে বাইরের দিকে টানছে।
ঘূর্ণায়মান বলটি হাতের ওপর বাইরের দিকে যে টান বা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে, একেও কিন্তু অনেকে কেন্দ্রবিমুখী বল বলে বলেন। অর্থাৎ কেন্দ্রবিমুখী বল একদিকে যেমন আমাদের ঘূর্ণায়মান কাঠামোতে অনুভূত হওয়া একধরনের ভ্রম বা ছদ্ম বল হতে পারে, অন্যদিকে এটি হতে পারে কেন্দ্রমুখী বলের একটি নিখুঁত প্রতিক্রিয়া।
তাহলে বলা যায়, কেন্দ্রমুখী বল হলো সেই অদৃশ্য সুতা, যা আমাদের জগৎকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে আটকে রাখে। আর কেন্দ্রবিমুখী বল হলো সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি, যা আমাদের নাগরদোলা কিংবা গাড়ির শার্প টার্নিংয়ে বাইরের দিকে হেলিয়ে দেয়। একটি আমাদের কেন্দ্রে টানে, অন্যটি কেন্দ্র থেকে দূরে ঠেলতে চায়। এই দুইয়ের ভারসাম্যেই মহাবিশ্বের সব ঘূর্ণন সচল রয়েছে।