স্ট্রিং থিওরি ও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ

বছর দুয়েক আগে এডওয়ার্ড উইটেনের ‘ইউনিভার্স অন আ স্ট্রিং’ প্রবন্ধটি প্রথম আমার নজরে আসে। ড্রোন বিশেষজ্ঞ ও শখের জ্যোতির্বিদ নাইমুল ইসলাম অপু সঙ্গে এক কথোপকথনে উইটেনের প্রতি তাঁর গভীর মুগ্ধতার কথা জানতে পারি। অপু যমুনা রেলসেতু নির্মাণে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর আমন্ত্রণে আমিও একদিন সেই নির্মাণাধীন সেতুটি দেখতে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে, ওই দিন (২০২৫ সালে) শেষ বিকেলে সেই রেলসেতুর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা উইটেনের লেখা স্ট্রিং থিওরি ও তারকোভস্কির সোলারিস মুভিটি নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। যমুনার ম্লান আলো ও দূরের জেলেনৌকার আবছায়া যেন আমাদের সেই মহাজাগতিক আলোচনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

এরপর অনেক দিন অপুর সঙ্গে দেখা হয় না, তবে সময়ের রথে চড়ে মাঝেমধ্যেই সেই বিকেলের আলোচনাগুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। কোয়ান্টাম রিলেটিভিটি, স্ট্রিং থিওরি বা এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো শব্দগুলো মনে পড়লেই চারপাশের সন্ধ্যাটা কেমন যেন এক মায়াবী ঘোরে কেটে যায়। ঠিক যেমনটি উইটেন তাঁর প্রবন্ধের শুরুতে লিখেছিলেন—মহাবিশ্বের একীভূত সুরের মূর্ছনা দিয়ে।

বিগ ব্যাংয়ের পরপরই অতি ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব এক বিন্দু থেকে অবিশ্বাস্য গতিতে প্রসারিত হয়—যাকে বলা হয় কসমিক ইনফ্লেশন
ছবি: নিউ সায়েন্টিস্ট

আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দুটি—এক, এই মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তা জানা; দুই, এটি ঠিক কী কী নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে, তা খুঁজে বের করা। আজ থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে আমাদের এই মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পরমুহূর্তেই, চোখের পলক ফেলার চেয়েও কোটি কোটি গুণ কম সময়ে মহাবিশ্ব এক অতিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে অবিশ্বাস্য গতিতে প্রসারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন মহাজাগতিক স্ফীতি বা কসমিক ইনফ্লেশন।

আরও পড়ুন
আজ থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে আমাদের এই মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হতে থাকে, জমাট বাঁধে কোটি কোটি গ্যালাক্সি, জন্ম নেয় নক্ষত্র ও গ্রহরাজি। বর্তমান সময়ে ডার্ক এনার্জি নামে এক রহস্যময় শক্তির প্রভাবে এই মহাবিশ্ব দিন দিন আরও দ্রুতগতিতে চারদিকে প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই হলো আমাদের চেনা মহাবিশ্বের ইতিহাস। তবে চেনা এই ইতিহাসের গভীরে এখনো লুকিয়ে আছে কিছু মৌলিক এবং অমীমাংসিত প্রশ্ন। যেমন, বিগ ব্যাংয়ের ঠিক আগের মুহূর্তে আসলে কী ছিল? সময় কীভাবে শুরু হলো? সৃষ্টির একদম আদি বিন্দুতে প্রকৃতির নিয়মগুলো কেমন ছিল? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি স্তম্ভ—আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম মেকানিকস—এই আদি বিন্দুতে এসে একসঙ্গে কাজ করে না, একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানের জগতে এক বিরাট বিপ্লব ঘটে যায় আলবার্ট আইনস্টাইনের হাত ধরে। তিনি আমাদের শেখালেন, স্থান ও সময় আসলে আলাদা কিছু নয়; এরা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি এর নাম দিলেন স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল। তাঁর বিখ্যাত জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্বটি মহাবিশ্বকে অনেকটা টানটান চাদরের মতো কল্পনা করে, যেখানে বিশাল সব গ্রহ বা নক্ষত্র চাদরের ওপর রাখা ভারী বলের মতো স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। এই বাঁকটাই হলো মহাকর্ষ। নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা ব্ল্যাকহোলের মতো মহাজাগতিক বিশাল বস্তুর গতিবিধি বুঝতে এই তত্ত্বটি আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্বটি মহাবিশ্বকে অনেকটা টানটান চাদরের মতো কল্পনা করে
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ঠিক একই সময়ে বিজ্ঞানের অন্য এক প্রান্তে গড়ে ওঠে আরেক বিস্ময়কর জগৎ—কোয়ান্টাম মেকানিকস। এটি কাজ করে ইলেকট্রন, প্রোটন বা ফোটনের মতো অতিপারমাণবিক কণা নিয়ে। এই ক্ষুদ্র জগতে মহাকর্ষের কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে; এখানে সবকিছু চলে অনিশ্চয়তা ও অদ্ভুত সব কোয়ান্টাম নিয়মে।

আরও পড়ুন
আলবার্ট আইনস্টাইন আমাদের শেখালেন, স্থান ও সময় আসলে আলাদা কিছু নয়; এরা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি এর নাম দিলেন স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল।

বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এই দুই ভিন্ন সফল নিয়মকে এক করা। কারণ, যুক্তি বলে—যেহেতু এই বিশাল মহাবিশ্ব শেষ পর্যন্ত ওই অতিক্ষুদ্র কণাগুলো দিয়েই তৈরি, তাই তাদের সবার জন্য নিশ্চয়ই প্রকৃতির একটি সাধারণ বা একীভূত নিয়ম থাকা উচিত।

কিন্তু মুশকিল হলো, যখনই মহাকর্ষের নিয়মগুলোকে কোয়ান্টাম স্তরে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়, তখনই পুরো গণিত ভেঙে পড়ে। হিসাব মেলাতে গেলে এমন সব উদ্ভট অসীম মান বেরিয়ে আসে, যা বাস্তবে অসম্ভব। সোজা কথায়, মহাকাশের বিশালতার ব্যাকরণ আর পরমাণুর ভেতরের ব্যাকরণ এক সুতোয় মিলছে না।

মহাবিশ্বের জন্মের সেই আদি মুহূর্ত বা বিগ ব্যাংয়ের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে হলে আমাদের এমন একটি তত্ত্ব প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে বিশাল মহাকর্ষ এবং অতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম জগৎকে ব্যাখ্যা করতে পারে। বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেনের আলোচিত স্ট্রিং থিওরি মূলত এই দুই মেরুকে এক করার সেতু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

স্ট্রিং থিওরি অনুসারে, মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদানগুলো বিন্দুসদৃশ কোনো কণা নয়, বরং সেগুলো অতিক্ষুদ্র কম্পনরত সুতোর লুপ বা স্ট্রিং
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

১৯৭০-এর দশকে অনেকটা আকস্মিকভাবেই স্ট্রিং থিওরি নামে এক নতুন ভাবনার জন্ম হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদানগুলো বিন্দুসদৃশ কোনো কণা নয়, বরং সেগুলো অতিক্ষুদ্র কম্পনরত সুতোর লুপ বা স্ট্রিং। একটি বেহালা বা ভায়োলিনের তারের বিভিন্ন কম্পন থেকে যেমন ভিন্ন ভিন্ন সুর তৈরি হয়, ঠিক তেমনই এই মৌলিক স্ট্রিংগুলোর কম্পন বা হারমোনিকসের পার্থক্যের কারণেই আমরা ইলেকট্রন, ফোটন বা নিউট্রিনোর মতো বিভিন্ন কণা দেখতে পাই। এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি গাণিতিকভাবে মহাকর্ষকে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সঙ্গে মেলাতে সক্ষম হয়েছে, যা আগে অসম্ভব বলে মনে করা হতো।

আরও পড়ুন
স্ট্রিং থিওরি অনুসারে, মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদানগুলো বিন্দুসদৃশ কোনো কণা নয়, বরং সেগুলো অতিক্ষুদ্র কম্পনরত সুতোর লুপ বা স্ট্রিং।

আমরা আমাদের চারপাশে যে জগৎ দেখি, তা মূলত ত্রিমাত্রিক। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিন দিকেই আমরা চলাচল করতে পারি। কিন্তু স্ট্রিং থিওরির জটিল গণিতকে যদি সত্যি হতে হয়, তাহলে আমাদের এই চেনা তিন মাত্রার বাইরেও আরও সাতটি অতিরিক্ত অদৃশ্য মাত্রা থাকতে হবে! এই মাত্রাগুলো এতই সূক্ষ্ম আর মহাজাগতিকভাবে গুটিয়ে আছে যে আমাদের সাধারণ চোখ বা কোনো যন্ত্রে তা ধরা পড়ে না। এর পাশাপাশি এই তত্ত্বে যোগ হয় সুপারসিমেট্রির এক অভিনব ধারণা। এটি বলে, আমাদের চেনা জগতের প্রতিটি কণারই মহাশূন্যে একেকটি অদৃশ্য যমজ কণা রয়েছে।

মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ পদার্থই আমাদের কাছে আজও অজানা, যাকে আমরা বলি ডার্ক ম্যাটার
ছবি: নাসা

বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের এক বিশাল রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই অদৃশ্য যমজ কণাগুলোর মধ্যেই। আমরা জানি, মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ পদার্থই আমাদের কাছে আজও অজানা, যাকে আমরা বলি ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীদের প্রবল বিশ্বাস, এই রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার আসলে তৈরি হয়েছে ওই সুপারসিমেট্রিক কণাগুলো দিয়েই। আজকের দিনে সুইজারল্যান্ডের মাটির নিচে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী কণা ত্বরক যন্ত্র—লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত অতিপারমাণবিক কণাগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড গতিতে সংঘর্ষ ঘটিয়ে চলেছেন। আশা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতের কোনো এক পরীক্ষায় এই শক্তিশালী যন্ত্রের মাধ্যমেই হয়তো এই অদৃশ্য যমজ কণা কিংবা অতিরিক্ত মাত্রার অকাট্য কোনো প্রমাণ মিলে যাবে, যা বদলে দেবে আমাদের চেনা বিজ্ঞানকে।

আরও পড়ুন
স্ট্রিং থিওরির জটিল গণিতকে যদি সত্যি হতে হয়, তবে আমাদের এই চেনা তিন মাত্রার বাইরেও আরও সাতটি অতিরিক্ত অদৃশ্য মাত্রা থাকতে হবে!

স্ট্রিং থিওরি কেবল কণাই নয়, বরং স্থান ও সময় সম্পর্কে আমাদের চিরচেনা ধারণাকেও পুরোপুরি বদলে দেয়। কোয়ান্টাম মেকানিকসে হাইজেনবার্গের একটি বিখ্যাত নীতি আছে, যাকে বলা হয় অনিশ্চয়তা নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, অতিক্ষুদ্র কোনো কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একইসঙ্গে নিখুঁতভাবে জানা অসম্ভব, সেখানে একধরনের অস্পষ্টতা থাকে। স্ট্রিং থিওরি বলছে, ঠিক একইভাবে আমাদের এই স্থান-কালের ভেতরেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরে একধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে। আমরা স্থান ও সময়কে যতটা মসৃণ বা নিখুঁত ভাবি, একদম ক্ষুদ্রতম স্কেলে তা আসলে তেমন নয়। স্থান-কালের এই ঝাপসা বা মায়াবী রূপটিই বিগ ব্যাংয়ের সেই আদি রহস্য উন্মোচনে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের একদম শুরুর সেকেন্ডের কোটি কোটি ভাগের এক ভাগে যখন পুরো মহাবিশ্ব একটি বিন্দুর চেয়েও ক্ষুদ্র ছিল, তখন আমাদের চেনা সময়ের ধারণাটিই হয়তো পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। সেখানে হয়তো ঘড়ির কাঁটা মেপে সময়কে আলাদা করা যেত না। প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞান যেখানে এই আদি বিন্দুতে এসে থমকে যায়, স্ট্রিং থিওরি তার ওই ঝাপসা ভাবের ধারণা দিয়ে সেই চরম মুহূর্তটিকেও সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এটি আমাদের দেখায়, মহাবিশ্বের জন্ম কোনো শূন্য বা গাণিতিক অসংগতি থেকে হয়নি, বরং তা ছিল স্থান, সময় ও শক্তির এক অপূর্ব মহাজাগতিক সুরের মূর্ছনা।

আরও পড়ুন
হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি নীতি অনুযায়ী, অতিক্ষুদ্র কোনো কণার অবস্থান নিখুঁতভাবে জানা অসম্ভব, সেখানে একধরনের অস্পষ্টতা থাকে।

বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড উইটেনের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—‘স্ট্রিং থিওরি হলো একবিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞান, যা ভুল করে একটু আগেই, অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীদের হাতে এসে পড়েছে।’ তাঁর এই কথার অর্থ, এই তত্ত্বটি এতই আধুনিক এবং এর ভেতরের বিজ্ঞান এতটা উন্নত যে একে পুরোপুরি বোঝার মতো প্রযুক্তি বা গণিত আমাদের যুগে এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আসলে স্ট্রিং থিওরি এখনো খাতাকলমের তাত্ত্বিক পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের ল্যাবরেটরিগুলোতে সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা পুরোপুরি প্রমাণ করা আজও বাকি। তা সত্ত্বেও, এই তত্ত্বের অসাধারণ গাণিতিক সৌন্দর্য এবং মহাবিশ্বের সবগুলো মৌলিক বলকে মাত্র একটি সূত্রে বেঁধে ফেলার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের মনে এক নতুন আশার আলো জ্বেলেছে।

স্ট্রিং থিওরি এখনো খাতাকলমের তাত্ত্বিক পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

মহাবিশ্বের একদম গভীরে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো উন্মোচনে এবং আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের আদি উৎস খুঁজে পেতে, মহাজাগতিক শক্তির এই স্পন্দিত সুতো বা স্ট্রিং থিওরিই হয়তো একদিন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে।

যমুনার বুকে ম্লান আলোয় সেই বিকেলে, অপুর সঙ্গে তারকোভস্কির সোলারিস মুভিটি নিয়ে কথা বলতে বলতেই মনে পড়ে যায় আমার নিজেরই লেখা ‘ওই হলো পৃথিবী নীলাভ-সাদা’ শিরোনামের সেই রচনাটির কথা। সেখানে একটি প্রশ্ন আমি করেছিলাম—‘অংশ কি কখনো সমগ্রের সন্ধান পায়!’

আরও পড়ুন
স্ট্রিং থিওরি এখনো খাতাকলমের তাত্ত্বিক পর্যায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের ল্যাবরেটরিগুলোতে সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা পুরোপুরি প্রমাণ করা আজও বাকি।

সোলারিস মুভির সেই রহস্যময়, জীবন্ত সমুদ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষের যে অসহায়তা, তার সঙ্গে এই প্রশ্নটির আত্মিক মিল রয়েছে। আমরা এই বিশাল, অসীম মহাবিশ্বের একেকটি অতিক্ষুদ্র অংশমাত্র। স্ট্রিং থিওরির কম্পিত সুতো দিয়ে কিংবা মহাশূন্যের অতলান্তিক খোঁজে আমরা আসলে সেই সমগ্র মহাবিশ্বেরই একটা অখণ্ড রূপকে ছুঁতে চাইছি। কিন্তু এই ক্ষুদ্র অংশ হয়ে আমরা কি আসলেই কখনো সেই বিশাল সমগ্রের দেখা পাব?

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

সূত্র: এডওয়ার্ড উইটেনের ‘ইউনিভার্স অন আ স্ট্রিং’ প্রবন্ধ অবলম্বনে

আরও পড়ুন