পপকর্ন কেন পপ করে ফেটে যায়

পপকর্নের ছোট্ট শক্ত দানাটা ঠিক কীভাবে এক মুহূর্তে ফুলেফেঁপে ওঠা খাবারে পরিণত হয়?ছবি: জর্জ রেটসেক

পপকর্ন খেতে খেতে কখনো কি মনে হয়েছে, এই ছোট্ট শক্ত দানাটা ঠিক কীভাবে এক মুহূর্তে ফুলেফেঁপে ওঠা খাবারে পরিণত হয়? দেখতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরের ঘটনাটা আসলে পদার্থবিজ্ঞানের ছোট্ট একটা পরীক্ষা।

চুলায় তাপ দিলে শুরুতে কিছুই চোখে পড়ে না। কিন্তু দানার ভেতরে তখন ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়। প্রতিটি পপকর্ন দানার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ১৩-১৪ শতাংশ পানি থাকে। এই পানি খোলসের ভেতরে আটকে থাকে, কারণ বাইরের পেরিকার্প নামে আবরণটা খুব শক্ত এবং প্রায় বায়ুনিরোধক হয়।

তাপ দিলে এই পানি ধীরে ধীরে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে বাষ্পে পরিণত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বাষ্প বের হতে পারে না। ফলে ভেতরে চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে ভেতরের স্টার্চ বা শ্বেতসারও পরিবর্তন হয়। তাপের কারণে এটি তার স্ফটিকাকার গঠন হারিয়ে জেলাটিনাইজেশন অবস্থায় পৌঁছে যায়। মানে স্টার্চ নরম, আঠালো এবং ভিসকাস জেলির মতো হয়ে যায়। এটা গলে যাওয়া নয়; বরং আণবিক গঠনের পরিবর্তন, যেখানে স্টার্চ দ্রুত প্রসারিত করার উপযোগী অবস্থায় থাকে।

প্রতিটি পপকর্ন দানার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ১৩-১৪ শতাংশ পানি থাকে
ছবি: আলামো সিটি পপকর্ন কোম্পানি

এখন দুটি জিনিস একসঙ্গে ঘটছে, ভেতরে চাপ বাড়ছে ও স্টার্চ এমন অবস্থায় আছে যে তা অনায়াসেই প্রসারিত হতে পারে। তাপমাত্রা যখন ১৭৫-১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তখন ভেতরের চাপ প্রায় ৯ থেকে ১০ অ্যাটমোস্ফিয়ার পর্যন্ত উঠতে পারে। এই চাপ তখন খোলসের যান্ত্রিক শক্তির সীমা অতিক্রম করে। ফলে খোলসটি হঠাৎ ফেটে যায়।

আরও পড়ুন
প্রতিটি পপকর্ন দানার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ১৩-১৪ শতাংশ পানি থাকে। এই পানি খোলসের ভেতরে আটকে থাকে, কারণ বাইরের পেরিকার্প নামে আবরণটা খুব শক্ত এবং প্রায় বায়ুনিরোধক হয়।

‘পপ!’—এই শব্দটি মূলত আসে পেরিকার্পের দ্রুতগতির ভাঙন এবং হঠাৎ চাপ কমে যাওয়া থেকে। এটি বড় কোনো বিস্ফোরণ বা এক্সপ্লোশন নয়, বরং খুব দ্রুত ঘটে যাওয়া কাঠামোগত ভাঙনের শব্দ। খোলস ফেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, ভেতরের অত্যধিক উত্তপ্ত পানি বা সুপারহিটেড ওয়াটার ফ্ল্যাশ ভ্যাপোরাইজেশনের মাধ্যমে দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। এই দ্রুত প্রসারণ ভেতরের জেলাটিনাইজড স্টার্চকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

এই স্টার্চ তখন বাষ্পের সঙ্গে মিশে দ্রুত প্রসারিত একটি ফোম তৈরি করে। কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এই ফোম ফুলে ওঠে, তারপর ঠান্ডা হয়ে স্থির হয়ে যায়। ফলে আমরা পাই সাদা, হালকা ও ফুলেফেঁপে ওঠা পপকর্ন।

পপকর্নের সব দানা কিন্তু ফাটে না। কিছু দানা শক্ত অবস্থায় থেকে যায়
ছবি: দ্য স্প্রুস/ডায়ানা চিসত্রুগা

পপকর্নের পুরো প্রক্রিয়াটা দাঁড়ায় এভাবে: ভেতরের পানি→তাপ→বাষ্প→চাপ বৃদ্ধি→স্টার্চ জেলাটিনাইজেশন→চরম চাপ→পেরিকার্পের ভাঙন→ফ্ল্যাশ ভ্যাপোরাইজেশন→দ্রুত প্রসারণ→ফোম গঠন→জমাট বাঁধা পপকর্ন।

সব দানা কিন্তু ফাটে না। কিছু দানা শক্ত অবস্থায় থেকে যায়। এগুলোকে সাধারণভাবে ওল্ড মেইডস বলা হয়। এর প্রধান কারণ দুটি, ভেতরে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকা, অথবা পেরিকার্পে সূক্ষ্ম ফাটল থাকা। এতে চাপ সঠিকভাবে তৈরি  হতে পারে না।

আরও পড়ুন
স্টার্চ তখন বাষ্পের সঙ্গে মিশে দ্রুত প্রসারিত একটি ফোম তৈরি করে। কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে এই ফোম ফুলে ওঠে, তারপর ঠান্ডা হয়ে স্থির হয়ে যায়। ফলে পপকর্ন সাদা, হালকা ও ফুলেফেঁপে ওঠে।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকে প্লেইন এয়ার-পপড পপকর্ন উচ্চ আঁশযুক্ত এবং তুলনামূলকভাবে কম ক্যালরিসম্পন্ন স্ন্যাক। তবে মাখন, ক্যারামেল বা চিজ যুক্ত হলে এর ক্যালরিক ডেনসিটি বা ক্যালরির ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা খুব সহজ মনে হলেও ভেতরে বেশ জটিল। একটা ছোট দানার ভেতরে লুকানো থাকে চাপ, তাপ ও পরিবর্তনের পুরো একটা গল্প। আর সেই গল্পটা এক মুহূর্তে ‘পপ’ শব্দে শেষ হয়ে যায়।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স ডটঅর্গ

আরও পড়ুন