‘খায়ের বাশারকে চেনেন?’
মিনহাজ ভাই প্রশ্নটা করেছেন ভরা মিটিংয়ে। আমি তাকে চিনি না, এটা সরাসরি বলা যাচ্ছে না। আবার চিনি বললে মিনহাজ ভাই কোন দিক দিয়ে জাপটে ধরেন, কে জানে। এ রকম পরিস্থিতিতে আমি সাধারণত একটা হাসি দিয়ে থাকি, যার উত্তর যেকোনো কিছু হতে পারে। আমি হাসলাম। মিনহাজ ভাই বললেন, ‘বুঝেছি। তার মানে চেনো না!’
মিনহাজ ভাই এবার উঠে দাঁড়ালেন। মিটিংয়ে সবার দৃষ্টি তাঁর দিকে হওয়ার কথা, কিন্তু আছে আসলে আমার দিকে। নেহা মিটিমিটি হাসছে। এই মেয়েটাকে আচ্ছামতো ঝাড়তে পারলে ভালো হতো। ঢুকেছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রডিউসার হিসেবে, কয়েকটা মাসেই লাফিয়ে উঠে গেছে ওপরে। দুইটা কী সব হাবিজাবি ডকুমেন্টারি করেছে—ব্যস, তা নিয়ে মিনহাজ ভাইয়ের হইচইয়ের শেষ নেই। যেকোনো দিন শুনব, নেহাকে প্রডিউসার বানিয়ে আমাদের সমান করে দিয়েছেন।
মিনহাজ ভাই গুগলে সার্চ দিলেন এবার। বড় স্ক্রিনে দেখা গেল খায়ের বাশারের নাম। কিন্তু তেমন কোনো ছবি পাওয়া গেল না। যেগুলো পাওয়া গেল বুঝতে পারলাম, আমাদের আরাধ্য খায়ের বাশার তাঁরা নন। ড্রামাটিক পজ নিয়ে শ্বাস ফেললেন মিনহাজ ভাই—বিস্ময়কর না! এত বড় বিজ্ঞানী, তাঁর কোনো ছবি গুগলের কাছে নেই!
ও আচ্ছা! বুঝলাম। খায়ের বাশার তাহলে একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু কী বিজ্ঞানী?
প্রশ্ন করব কী! নেহার চটপটানি এরই মধ্যে শুরু—শিক্ষাজীবন পশ্চিমে হলেও খায়ের বাশার দেশে চলে এসেছিলেন সেই আশির দশকেই এবং এসেই তিনি নিরলসভাবে করে যাচ্ছেন বিজ্ঞানসাধনায়। সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র বিজ্ঞানী তিনি, যিনি মাল্টিভার্স ইউনিভার্স নিয়ে এত দিন ধরে কাজ করছেন!
‘গুড জব নেহা।’ মিনহাজ ভাইয়ের মুখ থেকে একেবারে ঠিকরে বেরোচ্ছে প্রশংসা। উফ্, আর নেওয়া যায় না! আমার ভেতর উসখুসানি দেখেই বোধ হয় তাকালেন মিনহাজ ভাই—ইম্প্রেসিভ, কী বলো?
বলতেই হয় কিছু, তাই বলা—হ্যাঁ। তা তো বটেই!
মিনহাজ ভাই বললেন, খায়ের বাশার এত দীর্ঘ সময় ধরে কতটুকু এগিয়েছেন তাঁর বিজ্ঞানসাধনায়, এ ব্যাপারে আমরা একেবারেই অন্ধকারে আছি।
আমি না পেরে বললাম, হয়তো উনিই আমাদের অন্ধকারে রেখেছেন, তা–ই না? কারণ, হয়তো বলার মতো উনি আজও কিছু করতে পারেননি!
‘ওনাকে ছোট করে দেখার কোনো উপায় নেই রায়হান ভাই।’ নেহার পটপটানি চলমান। ‘আপনি জানেন না, পশ্চিমের কত দেশ কতবার ওনাকে তাদের দেশে একেবারের মতো চলে যেতে বলেছে। বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে চেয়ে তাদের হয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে বলেছে!’
‘কিন্তু তাতে কি এটা প্রমাণ হয়, নেহা, উনি মাল্টিভার্স ইউনিভার্স বা ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে সত্যিকারের কোনো কিছু করে ফেলেছেন? উনি কি কোনো পেপার জমা দিয়েছেন কোথাও? জানিয়েছেন কোনো নতুন থিওরি!’
নেহা চুপ করে থাকলে মনটা ভালো লাগায় ভরে গেল। ঠান্ডা কফিটাকে খেয়ে নিলাম এক চুমুকে। সিদ্ধান্ত দেওয়ার ভঙ্গিতে মিনহাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘ভাই, আমরা বোধ হয় একটু বেশিই উত্তেজিত হয়ে পড়ছি ওনাকে নিয়ে। আমাদের দরকার চমকদার কিছু। খায়ের বাশার বিস্মৃত বিষয়! আমরা চাই, এখন যাঁরা নতুন নতুন গবেষণা করছেন, আকাশে ড্রোন ওড়াচ্ছেন, কোনো কেমিক্যালের ব্যাপারে বিশেষ কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন, তাঁদের নিয়ে কাজ করা…!’
মিনহাজ ভাই বললেন, ‘সে–ও করব, রায়হান। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে আমাদের প্রথম অডিও ভিজ্যুয়াল কাজটা হতে হবে বিজ্ঞানী খায়ের বাশারকে নিয়ে। উনি কিংবদন্তি। কিন্তু ওনাকে আজ পর্যন্ত কোনো সংবাদমাধ্যম ধরতে পারেনি। যা কেউ পারেনি, আমরা তো সেটাই করতে চাই, তা–ই না?’
‘জি ভাই’ বলা ছাড়া আর কীই–বা বলার উপায় থাকল আমার। এবার মিনহাজ ভাইয়ের দেওয়া সিদ্ধান্ত, ‘তুমিই কাজটা করবে রায়হান। আর তোমার সঙ্গে এ কাজে থাকবে নেহা!’
চাকরির বাজার নেহাত খারাপ যাচ্ছে, নাহলে এখনই বলে দেওয়া যেত, ‘সরি ভাই। আমি এসবের মধ্যে নেই!’
ঠান্ডা কফি ও শীতল নেহা কোনোমতে গলা থেকে নামতে শুরু করল, তাতে বমি ভাবটা হয়ে উঠল আরও প্রকট!
আরেকটা বাঁক নিল গলিটা। কিছু দূর গিয়ে সামনেটা হঠাৎই শেষ। আমি বললাম, ‘সেক্টর সি না?’
২
শোল্ডার রাস্তা। আচমকাই প্রায় বাঁক নিয়েছে। গাড়িটা ঘুরতে একটু দেরি করায় একটা ঝাঁকির মতো লাগল ভেতরে। নেহার দিকে ঝুঁকে যেতেই হলো আমাকে। আর নেহাও যেমন হাত বাড়িয়ে ধরে নিল আমাকে। ঠোঁটটা গোল করে বলল, ‘ক্যাচ করলাম ভাই।’
ক্যাচের নিকুচি করেছে। মেজাজটা এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে। এ কাজের জন্য নেহার কোনো দরকার ছিল না। ক্যামেরাম্যান আর আমি আসতাম। খায়ের বাশারের বাড়িটা শুধু খুঁজে বের করতে হতো, ঠিকানা তো জানাই। তারপর ভেতরে গিয়ে দু-চারটা গল্প। এক কাপ চা। বাসি বিস্কুট। এর চেয়ে বেশি কী আর আশা করার আছে! কিন্তু না, সবকিছুতে নেহাকে জড়িয়ে ফেলা মিনহাজ ভাইয়ের এখন নতুন ট্রেন্ড।
বনানীর এদিকটা ঠিক চিনি না। কবরস্থানটা পেরিয়ে গেছে। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গলিতে তার হাওয়া লাগেনি। রোডলাইটগুলো জ্বলেনি। একটা ঝোপালো গাছ মাঠের ভেতর থেকে শরীরটা এমন চ্যাগিয়ে রাস্তার ওপর বের করে রেখেছে যে তার ছোপ অন্ধকার সারা গলিকে গাঢ় করে রেখেছে।
নেহা বলল, ‘বাপ রে! এদিকটা কেমন যেন, না?’
বলতে ইচ্ছা করল, ‘কেমন তো নেমে যাও। আমি গিয়ে ঘুরে আসি।’
কিন্তু সব কথা কি আর বলা যায়!
আরেকটা বাঁক নিল গলিটা। কিছু দূর গিয়ে সামনেটা হঠাৎই শেষ। আমি বললাম, ‘সেক্টর সি না?’
নেহা মাথা নাড়াল দ্রুত। মোবাইলে কী যেন দেখেও নিল চট করে। বললাম, ‘ঠিক আছে তো ঠিকানা?’
গাড়িটা এক পাশে রেখে নামতে হলো আমাদের। দুটো আঁটসাঁট বিল্ডিং সামনেই। প্রায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ওপরে উঠেছে। দুটোই ১২ তলা। নেহা বলল, ‘স্যারের বাড়ি ডুপ্লেক্স।’
‘স্যার?’
নেহা এবার তাকাল আমার দিকে। বলল, ‘না হলে কী বলব?’
‘ইংরেজ চলে গেছে, কিন্তু তার দাসত্ব যে যায়নি, তার প্রমাণ তোমরা আরকি! খায়ের বাশারকে স্যার বলার কী আছে? কোন নাইটে ডুবেছে সে?’
‘স্যারটা সম্মান থেকে আসছে ভাই। আপনি বুঝবেন না।’
‘না। যা বোঝার শুধু তোমরাই বোঝো…’
‘সত্যিই আপনি বুঝতে পারছেন না, খায়ের বাশার কত বড় বিজ্ঞানী। তিনি যদি তাঁর থিওরি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তাহলে বুঝতে পারবেন কী প্রমাণিত হয়?’
‘যে পৃথিবীতে অনেক বেকুব এখনো আছে?’
‘আপনার সঙ্গে কথা বলাই তো মুশকিল দেখছি! মাল্টিভার্স তত্ত্ব নিয়ে দেখছি আপনার কোনো জ্ঞান নেই; এমনকি তথ্যও নেই আপনার কাছে!’
‘গুগলের কাছে আছে না, তাতেই হবে। এবার বাড়িটা খোঁজো।’
‘মাল্টিভার্স থাকা মানে…যে আপনি এখানে আছেন, সে আপনি কিন্তু আরও অনেক জায়গায় আছেন। একই সঙ্গে, বিভিন্নভাবে।’
‘তা যে বাড়িটা এখানে থাকার কথা, সেটা এখানে আছে তো, নাকি সেটাও এখন চাঁদে গিয়ে খুঁজতে হবে?’
‘সত্যিই! আপনি একটা ইমপসিবল!’
নেহা এগিয়ে গেল ১২ তলা যুগলকে পেছনে ফেলে। আমি গেলাম অবশ্য ১২ তলার এক পাশে। এ রকম অন্ধকারমাখা গলিতে গাছ দেখলে আমার কুকুর–স্বভাব জেগে উঠতে বেশি সময় লাগে না। কিন্তু জিপারটা খুলে যে-ই না দাঁড়াতে যাব, নেহার চিৎকার তিরের মতো ছুটে এল, রায়হান ভাই…এদিকে!
ছুটতেই হলো।
নেহা যেখানে দাঁড়ানো, তার চেয়ে ১০০ মিটারও হবে না, বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। একটা ডুপ্লেক্স। তবে বেশ পুরোনো। বাইরের দিকে কিছুটা জায়গা আছে। সেখানে বিস্তর গাছ।
নেহা ঘোর লাগা চোখে বলল, ‘এটাই স্যারের বাড়ি!’
নেহা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু এসব জায়গায় সুযোগ নিতে হয়। দ্রুত বললাম, ‘আসলে স্যারের ওপর আমরা একটা অডিও ভিজ্যুয়াল নির্মাণ করতে চাচ্ছি। একটা ডকুমেন্টারি।
৩
‘চলো, ফিরি এবার!’
প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি দরজায়। ১২ কি ১৩ বার কলিং বেলে চাপ দেওয়া হয়ে গেছে, আর কত?
কিন্তু নেহার চোখের ভেতর কাঁপুনি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দারুণ উত্তেজিত সে। বলল, ‘দাঁড়ান না আর কিছুক্ষণ। কে জানে, স্যার হয়তো গবেষণায়…তাই আসতে দেরি হচ্ছে!’
সিগারেট জ্বালাব কি না, বুঝছি না। নেহা তো খুব মুখরা। জ্বালানোমাত্র হয়তো বলে উঠবে, ‘নেভান তো ভাই এটা। আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’
উসখুসটা বাড়ছে। এমনকি আর কলিং বেলটাও চাপ দিতে ইচ্ছা করছে না। তখনই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে গেল। ঘিয়ে রঙের শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা। চোখে খয়েরি ফ্রেমের চশমা। কণ্ঠটা খসখসে, পাতা ওলটানোর শব্দের মতো। বললেন, ‘এসো!’
নিজেদের পরিচয় দিতে দিতে সোফায় বসলাম। বৃদ্ধা মাথা নাড়ালেন। তারপর বললেন, ‘কী জন্য এসেছ?’
নেহা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু এসব জায়গায় সুযোগ নিতে হয়। দ্রুত বললাম, ‘আসলে স্যারের ওপর আমরা একটা অডিও ভিজ্যুয়াল নির্মাণ করতে চাচ্ছি। একটা ডকুমেন্টারি। এত গুণী একজন মানুষ। পৃথিবীর কত দেশ স্যারকে ডেকেছিল...কিন্তু স্যার তো এখানেই থাকলেন!’
বৃদ্ধা বললেন, ‘স্যার?’
বললাম, ‘অনেকে এই ডাককে আবার ইংরেজদের উত্তরসূরি ভাবে, কিন্তু আসলে আমি ওনাকে সম্মানটা দিতে চাই।’
নেহা প্রবল বিস্ময় এবং ঘৃণা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কতক্ষণ। পারলে আমাকে তখনই দুটো কথা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু কথা তো বলল যেন পাতা ওলটানোর মতো খসখসে শব্দ, ‘তোমার চিন্তা শুনে ভালো লাগল। তবে মুখে শুধু স্যার বললেই কি আর সম্মান হয়! ওইটা ভেতরের বিষয়!’
এবার নেহা যেন দাঁড়ানোর জায়গা পেল, ‘ঠিকই বলেছেন ম্যাম। আমরা ওনাকে ভেতর থেকেই শ্রদ্ধা করি। সবাইকে সব সময় বলি, ৫ কি ৬টা বড় বড় দেশ থেকে উনি অফার পেয়েছিলেন…কিন্তু উনি কোথাও যাননি। এমনটা এখন আর কোথায় দেখা যায়, বলেন?’
বৃদ্ধা একভাবে তাকিয়ে থাকলেন। একটু হাসলেন যেন। তাতে তাচ্ছিল্যই ফুটে উঠল। তারপর বললেন, ‘শুধু এটাই যদি কারণ হয় শ্রদ্ধার, তাহলে তা দেখানো প্রয়োজন মনে করি না!’
নেহা এবার একটু দমে গেল মনে হয়। আমি বললাম, ‘আরও কত কী কারণ আছে, তা–ই না?’
‘কী কারণ আছে?’
পড়লাম বিপাকে। আমার পেটে অত বিদ্যা থাকলে তো হয়েইছিল। চট করে নেহার দিকে তাকালাম। বললাম, ‘আছে না..কারণ! বলো..বলো তুমি…’
নেহা তাড়াতাড়ি বলা শুরু করল, ‘উনি মাল্টিভার্স নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন…’
‘কিন্তু শেষ করতে এখনো পারেননি। যেকোনো উদ্ভাবন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা যে কত যন্ত্রণার, তোমরা যদি জানতে!’
‘আপনার কষ্টটা বুঝতে পারছি…’
‘কিছুই বুঝতে পারছ না তোমরা। বোঝা সম্ভবও নয়। আজ ৪০ বছর হলো, তার সঙ্গে আছি…’
‘অ্যানিভার্সারি?’
‘তা বলতে পারো। না-ও পারো। এসব কিছুই আমাদের স্পর্শ করে না।’
বললাম, ‘অনেক অভিনন্দন, ম্যাম। স্যার কোথায়? ওনাকেও যদি অভিনন্দন জানাতে পারতাম…’
বৃদ্ধা তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ আমাদের দিকে। চশমাটা খুললেন। পরলেন আরেকবার। তারপর শক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘ওনাকে কিংবদন্তি বানানোর সময় এখনো আসেনি। কোনো ডকুমেন্টারি হবে না।’
বৃদ্ধা উঠে চলে গেলেন। এমনকি এক কাপ চা–ও আসবে না যখন বুঝতে পারলাম, আমিও উঠে দাঁড়ালাম। নেহাকে বললাম, ‘মিনহাজ ভাইকে গিয়ে সব বলবে, প্লিজ। আমার কথা তো কিছুই বিশ্বাস করেন না!’
নেহা চুপ। ধাক্কা খেয়েছে, বোঝাই যাচ্ছে। যে ঘোর ছিল চোখে, সেটাও কাটতে শুরু করেছে। বলল, ‘সিগারেট আছে নাকি আপনার কাছে?’
বললাম, ‘বাইরে যাই আগে…’
নেহা মাথা নাড়াল। আমরা বের হওয়ার জন্য দরজাটা খুলেছি, তখনই বৃদ্ধার কণ্ঠ, ‘চলে যাচ্ছ নাকি?’
আমরা যে কী বলি, মনে করার অবস্থা নেই আমাদের। খায়ের বাশার একদমই যেন নুয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন, বৃদ্ধা কোনোমতে আবার ধরে ওঠালেন তাঁকে।
ফিরে তাকাতেই হলো। বৃদ্ধা একটা মানুষকে ধরে আছেন। শরীরে যেন চামড়া নেই তার। দগদগে হয়ে আছে পুরো অবয়বটা। চোখ ঠিকরে বেরোতে চাচ্ছে বাইরে।
বৃদ্ধা বললেন, ‘তোমাদের স্যার। খায়ের বাশার। চাইলে অভিনন্দন জানাতে পারো!’
আমাদের মুখের কথা সরল না। বৃদ্ধা বললেন, ‘৯৭ সালের শেষের দিকে তিনি বড় সাতটা দেশের অফার পান...সেসব দেশে থেকে বিজ্ঞানচর্চা করার। তোমরা জেনে অবাক হবে, তিনি সব কটি দেশেরই অফার গ্রহণ করেছেন। তিনি এখন একসঙ্গে আটটা দেশে অবস্থান করেন! এটাকে কী বলো তোমরা, মাল্টিভার্স?’
আমরা যে কী বলি, মনে করার অবস্থা নেই আমাদের। খায়ের বাশার একদমই যেন নুয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন, বৃদ্ধা কোনোমতে আবার ধরে ওঠালেন তাঁকে। তাঁকে ধরে রাখতে বৃদ্ধারও কষ্ট হচ্ছে, বোঝা যায়! হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘কিন্তু এই আট জায়গায় থাকতে গিয়ে তিনি আসলে কোথাও নেই...শুধুই বিভক্ত হয়ে গেছেন আটভাবে। আমি জানি, যদি উনি একক হয়ে থাকতে পারতেন, তাহলে ঠিকই সেই তত্ত্ব দিতে পারতেন, যে তত্ত্বে আট জায়গাতেও একক হয়ে থাকা সম্ভব…’
বৃদ্ধা খায়ের বাশারকে এগিয়ে নিয়ে এলেন আমাদের সামনে। তাঁর শরীরের রক্তস্রোতও যেন চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বৃদ্ধা বললেন, ‘এখন আমরা কী করছি, জানো?’
কোনোমতে দুজনে প্রশ্ন করলাম, ‘কী?’
‘অপেক্ষা। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন মাল্টিভার্সকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর তাতে ও মুক্তি পাবে। আমরা আবার গভীর রাতে উত্তরার রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ব, চা খাব কোনো এক টংদোকানে, নদীতে পা ডুবিয়ে আকাশের দিকে চোখ মেলে দেব…’
খায়ের বাশারের প্রায় খুলে বেরিয়ে আসা চোখ থেকে টপ করে এক ফোঁটা পানি পড়ল। খুব কষ্টে মাথাটা ওপরের দিকে উঠিয়ে বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘অপেক্ষা! অপেক্ষা!’