সৌরজগতে একটি সম্ভাব্য নতুন বামন গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা
ছোটবেলার বিজ্ঞানের বইয়ে প্রথম সৌরজগতের ছবি দেখেছি। ছবিটা বেশ ছিমছাম আর নিখুঁত। সৌরজগতের মাঝখানে জ্বলজ্বলে এক বিশাল সূর্য, আর তাকে ঘিরে সুবোধ বালকের মতো নির্দিষ্ট পথে ঘুরছে আটটি গ্রহ। ব্যস, আমাদের সৌরজগতের গল্প যেন ওখানেই শেষ!
কিন্তু মহাকাশ কি আর মানুষের তৈরি ওই ছোট্ট বইয়ের পাতায় আটকে থাকার জিনিস? এই অসীম অন্ধকারে যে কত অজানা রোমাঞ্চ আর রহস্য ঘাপটি মেরে বসে আছে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ঠিক এমনই এক বিশাল চমকের মুখে পড়েছেন। তারা আমাদের চেনা সৌরজগতের একেবারে শেষ প্রান্তে, জমাট বাঁধা অন্ধকারের মাঝে খুঁজে পেয়েছেন নতুন এক অতিথিকে। চিলির ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরির শক্তিশালী ক্যামেরায় ধরা পড়া এই সম্ভাব্য নতুন বামন গ্রহটির আপাতত নাম দেওয়া হয়েছে ‘২০২৬ ইডি১৩৮’।
গ্রহটির আকার এতই বড় যে, এর ব্যাস ৬০০ থেকে ১৫০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। আর অবস্থান? সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরে! হিসাবটা আপনার জন্য একটু সহজ করে দিই।
হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের গবেষক ম্যাথিউ হোলম্যান রুবিন অবজারভেটরির বিশাল ডেটাবেস ঘাঁটতে গিয়ে গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ইডি১৩৮ গ্রহটিকে প্রথম শনাক্ত করেন।
সূর্য থেকে আমাদের এই পৃথিবীর দূরত্বকে এক অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট বা সৌরজাগতিক একক হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের ঠিক ৪৬ গুণ দূরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে বসে আছে এই নতুন প্রতিবেশী! একটু তুলনা করলে বুঝবেন, আমাদের সবার পরিচিত প্লুটোর গড় দূরত্বই হলো ৪০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট। তার মানে, এই নতুন বস্তুটি প্লুটোকেও ছাড়িয়ে আরও অনেক গভীরে, ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অঞ্চলে অবস্থান করছে। ট্রান্স-নেপচুনিয়ান মানে নেপচুন গ্রহের বাইরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, ওই অঞ্চলের জানা বস্তুগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু।
এখন স্বাভাবিকভাবেই মনে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে—এত বিশাল একটা জিনিস আমাদের নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমাদের অত্যাধুনিক সব টেলিস্কোপ এতদিন কী করছিল? আসলে রাতের আকাশে আমরা যে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি দেখি, তা কোটি কোটি নক্ষত্রের এক উজ্জ্বল ও ঘন আলোর চাদর। এই নতুন গ্রহটির অবস্থান ঠিক ওই মিল্কিওয়ের উজ্জ্বল আলোর পটভূমিতে পড়ে গিয়েছিল। লাখো নক্ষত্রের তীব্র আলোর বন্যায় এই তুলনামূলক অনুজ্জ্বল গ্রহটি একেবারে মিশে ছিল। প্রাণীরা যেমন ক্যামোফ্লেজ করে অনেকটা সেরকম।
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের গবেষক ম্যাথিউ হোলম্যান রুবিন অবজারভেটরির বিশাল ডেটাবেস ঘাঁটতে গিয়ে গত ১৩ অক্টোবর এটিকে প্রথম শনাক্ত করেন। এরপরই শুরু হয় মহাজাগতিক গোয়েন্দাগিরি আর পেছনের ইতিহাস খোঁড়া। খুঁজতে খুঁজতে বিজ্ঞানীরা ২০১৬ সালের পুরোনো আর্কাইভ ঘেঁটেও এর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়ে যান! অর্থাৎ, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এটি মহাকাশে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
আমাদের সবার পরিচিত প্লুটোর গড় দূরত্বই হলো ৪০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট। তার মানে, এই ২০২৬ ইডি১৩৮ গ্রহটি প্লুটোকেও ছাড়িয়ে আরও অনেক গভীরে, ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অঞ্চলে অবস্থান করছে।
তবে একে পুরোপুরি বামন গ্রহ বলার আগে একটা বড়সড় পরীক্ষা দিতে হবে। ২০০৬ সালে প্লুটোকে কেন গ্রহের তালিকা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, মনে আছে? আসলে সাধারণ গ্রহ আর বামন গ্রহের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো তাদের রাজত্ব করার ক্ষমতা। একটি গ্রহ তার কক্ষপথের পুরো রাস্তাটা একেবারে পরিষ্কার করে রাখে। অর্থাৎ সেখানে তার সমকক্ষ অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তু থাকতে পারবে না। কিন্তু বামন গ্রহগুলো একটু বেশিই সামাজিক; তারা তাদের কক্ষপথে অন্যান্য ছোটখাটো পাথর বা বরফখণ্ডের সঙ্গে মিলেমিশে সহাবস্থান করে।
ইডি১৩৮-কে বামন গ্রহের পূর্ণ মর্যাদা পেতে হলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির এক চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করতে হবে। এর নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটা শক্তিশালী হতে হবে, যাতে এটি নিজেকে একটি নিখুঁত গোলকের আকার দিতে পারে। যদি শেষ পর্যন্ত এটি সব শর্ত পূরণ করে, তবে এটি সৌরজগতের স্বীকৃতি পাওয়া পাঁচ কিংবদন্তি বামন গ্রহের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করবে। এখন সৌরজগতে পরিচিত বামনগ্রহের মধ্যে রয়েছে সেরেস, প্লুটো, হাউমেয়া, মেকমেক এবং এরিস।
কিন্তু এই স্বীকৃতি দেওয়ার কাজটা মোটেও সহজ নয়। পৃথিবী থেকে এরা এতই দূরে যে, টেলিস্কোপ দিয়ে এদের নিখুঁত আকার বা ভর মাপা রীতিমতো অন্ধকারে সুঁই খোঁজার চেয়েও কঠিন। আপনাকে একটা বাস্তব উদাহরণ দিলে বুঝবেন। প্লুটোর মাত্র কয়েকটা পরিষ্কার ছবি তোলার জন্য নাসাকে নিউ হরাইজনস নামে একটি প্রোব পাঠাতে হয়েছিল। ২০০৬ সালে রওনা দিয়ে সেই মহাকাশযানের প্লুটোর কাছাকাছি পৌঁছাতেই সময় লেগেছিল দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর!
একটি গ্রহ তার কক্ষপথের পুরো রাস্তাটা একেবারে পরিষ্কার করে রাখে। অর্থাৎ সেখানে তার সমকক্ষ অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তু থাকতে পারবে না। কিন্তু বামন গ্রহগুলো একটু বেশিই সামাজিক।
আমরা সৌরজগত বলতে কেবল সূর্য আর আটটি গ্রহের যে পরিপাটি ছবিটা ভাবি, বাস্তবতা আসলে তার চেয়ে বহুগুণ বিশাল। নেপচুনের পর থেকে কুইপার বেল্ট শুরু হয়ে তা প্রায় ৫০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপর স্ক্যাটার্ড ডিস্ক নামে অঞ্চলটি চলে গেছে প্রায় ১০০০ ইউনিট পর্যন্ত। আর তারও অনেক পরে রয়েছে রহস্যময় উর্ট ক্লাউড, যা সূর্য থেকে প্রায় এক লাখ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকতে পারে! এই বিশাল জমাট বাঁধা অন্ধকারে গংগং, কুয়াওার, সেডনা বা অরকাসের মতো আরও অসংখ্য অদ্ভুত নামের বস্তুরা বামন গ্রহ হওয়ার লাইনে অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সঙ্গে নতুন যুক্ত হলো ইডি১৩৮।