কৃষ্ণগহ্বর কত বড় হতে পারে

কৃষ্ণগহ্বর মানেই এক মহাজাগতিক রাক্ষস, সামনে যা পায় গিলে খায়! কিন্তু এই রাক্ষসের পেট ঠিক কত বড় হতে পারে? বাস্তবে কি ব্ল্যাকহোল পুরো মহাবিশ্বকেই গিলে খেতে পারবে?

তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের আকারের কোনো নিম্নসীমা নেইছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

ব্ল্যাকহোল হাতের কাছে যা পায়, তা–ই টেনে নেয়। কেমন হতো যদি পুরো মহাবিশ্বটাই ব্ল্যাকহোলকে খেতে দেওয়া হয়! ব্ল্যাকহোল কি তা–ও খেয়ে ফেলবে? নাকি আছে কোনো অদৃশ্য বাধা?

তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের আকারের কোনো নিম্নসীমা নেই। যেকোনো বস্তুকেই গুটিয়ে কৃষ্ণগহ্বর বানিয়ে ফেলা যাবে। শুধু চাপ দিয়ে এর ঘনত্বকে এত বেশি ও আয়তনকে এত ছোট করে ফেলতে হবে, যেন বস্তুটার মুক্তিবেগ আলোর চেয়ে বেশি হয়। আলোও যাতে বের হতে না পারে। পৃথিবীকে চাপ দিয়ে ব্যাসার্ধ ০.৩৫ ইঞ্চি করে ফেলতে পারলে তা–ও হয়ে যাবে এক কৃষ্ণগহ্বর। আবার বড় হওয়ারও কোনো তাত্ত্বিক সীমা নেই। নাকি আছে?

১৯৬০ সালের কথা। জ্যোতির্বিদেরা আবিষ্কার করলেন এক অতিদানবীয় বস্তু। তাঁরা দেখলেন, আকাশের ভার্গো বা কন্যামণ্ডলের দিক থেকে আসছে বেতারতরঙ্গ। কিন্তু আলোর দৃশ্যমান অংশে সেদিকটায় কোনো কিছুরই অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। আরেকটু পরিশ্রমে সংকেতের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে একটি ক্ষীণ নীল নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেল। কিন্তু পরে দেখা গেল, জিনিসটা আসলে নক্ষত্র নয়। থ্রিসি ২৭৩ নামের বস্তুটি তার চেয়ে অনেক অদ্ভুত ও উত্তেজক এক বস্তু।

এটি আসলে ছিল একটি কোয়াসার। কোয়াসার নামটা কোয়াসি-স্টেলার কথার সংক্ষিপ্ত রূপ। বাংলা অর্থ নক্ষত্রসদৃশ বস্তু। নক্ষত্রসদৃশ বলা হলেও কোয়াসার আসলে নক্ষত্রের চেয়ে অনেক বেশি বড়, প্রভাবশালী ও সক্রিয় বস্তু। ১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে প্রথম টেলিস্কোপে এদের পাওয়া যায়। শুরুতে দেখতে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে মনে হতো বলেই নামটা দেওয়া।

আরও পড়ুন
১৯৬০ সালের কথা। জ্যোতির্বিদেরা আবিষ্কার করলেন এক অতিদানবীয় বস্তু। তাঁরা দেখলেন, আকাশের ভার্গো বা কন্যামণ্ডলের দিক থেকে আসছে বেতারতরঙ্গ।

বাস্তবে কোয়াসার হলো নতুন গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ। যে ছায়াপথ কোটি কোটি নক্ষত্রের আবাসস্থল। বহু দূরের এসব বস্তু নক্ষত্রের তুলনায় অনেক উজ্জ্বল বলেই টেলিস্কোপে চোখে ভেসে ওঠে। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের এক হাজার গুণ পর্যন্ত উজ্জ্বল হতে পারে এরা।

বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে আলো ছড়িয়ে দেয় কোয়াসার। স্বভাবতই এরা অত্যধিক উজ্জ্বল বস্তু। পরে জানা গেল থ্রিসি ২৭৩ কোয়াসারের এই শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো এক অতিদানবীয় কৃষ্ণগহ্বর। ভর সূর্যের ৯০ কোটি গুণ। কিন্তু এ তো সবে শুরু। বর্তমানে এমন অতিদানবীয় কৃষ্ণগহ্বর আছে ভূরি ভূরি। সূর্যের এক হাজার কোটি গুণের বেশি ভরের কৃষ্ণগহ্বর আছে অন্তত ৩৮টি (এ লেখার সময় পর্যন্ত)। এখন আমরা জানি, সব কোয়াসারেরই শক্তির উৎস বড় বড় এই কৃষ্ণগহ্বর।

১৯৮০-এর দশকেই বিজ্ঞানীরা মনে করতে শুরু করেন, সব ছায়াপথের কেন্দ্রেই একটি অতিভারী বা সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বর আছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ বিভিন্ন যন্ত্র সে ধারণাকেই সত্যি করেছে। এর মানে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে এমন অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর আছে অন্তত এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি), যা পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের অনুমিত ছায়াপথেরই সংখ্যা।

সুপারম্যাসিভ কৃষ্ণগহ্বরের ভর সাধারণত সূর্যের কয়েক শ কোটি হয়। তবে তার চেয়ে অনেক বড় কৃষ্ণগহ্বরও পাওয়া যাচ্ছে। তাই তো প্রশ্ন জাগে—ঠিক কত বড় হতে পারে এরা? কৃষ্ণগহ্বরের ভরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা আছে কি?

আরও পড়ুন
বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে আলো ছড়িয়ে দেয় কোয়াসার। স্বভাবতই এরা অত্যধিক উজ্জ্বল বস্তু। পরে জানা গেল থ্রিসি ২৭৩ কোয়াসারের এই শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হলো এক অতিদানবীয় কৃষ্ণগহ্বর।

এর উত্তরটা আসলে জটিল। অনেকগুলো কৃষ্ণগহ্বরের ভর মেপে ভরের উচ্চসীমার একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে একদিকে এসব পর্যবেক্ষণ অনেক কঠিন কাজ। উপরন্তু কাজটি করতে হয় পরোক্ষ উপায়ে। যথাসম্ভব ভালোভাবে হিসাব করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ভর হতে পারে ১০ হাজার কোটি সূর্যের সমান, যা প্রায় একটি ছায়াপথের ভরের সমান!

কিন্তু আরও বড় কি হতে পারবে না? তাত্ত্বিকভাবে কৃষ্ণগহ্বরের ধারেকাছে যেই যাবে, হারিয়ে যাবে এর ভেতরে। এমনকি ধীরে ধীরে মহাবিশ্বের সবকিছুই কৃষ্ণগহ্বর খেয়ে ফেলতে পারবে। যদিও এ চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। মহাবিশ্বের সবকিছু কৃষ্ণগহ্বরের সীমানায় চলে যাবে না।

কৃষ্ণগহ্বরের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে ২০১৫ সালে অ্যান্ড্রু কিং একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। এটি প্রকাশ করে মান্থলি নোটিসেস অব রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি: লেটার্স জার্নাল। তিনি দেখান, বাস্তব পরিস্থিতিতে কৃষ্ণগহ্বরের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে ২৭ হাজার সূর্যের সমান। তবে পাশাপাশি বলেন, আমরা সম্ভবত কখনো সূর্যের ৫০ বিলিয়নের (৫ হাজার কোটি) চেয়ে বেশি ভরের কৃষ্ণগহ্বর পাব না।

দুটি মানের তারতম্যের কারণও আছে। কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে চলে যেতে হলে কোনো বস্তুকে ঠিক কতটা কাছে যেতে হবে, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বরের ভৌত আয়তন শূন্য। তবে এর মহাকর্ষ বিস্তৃত। তবু এর ঘটনা দিগন্তের বাইরের যেকোনো জিনিস পতন থেকে রক্ষা পেতে পারে। ফিরে আসতে পারে বাইরের জগতে।

আরও পড়ুন
কৃষ্ণগহ্বরের ঊর্ধ্বসীমা নিয়ে ২০১৫ সালে অ্যান্ড্রু কিং একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তিনি দেখান, বাস্তব পরিস্থিতিতে কৃষ্ণগহ্বরের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে ২৭ হাজার সূর্যের সমান।

সবচেয়ে বড় ব্ল্যাকহোলদের ঘটনা দিগন্ত সর্বোচ্চ ১০ হাজার কোটি কিলোমিটার চওড়া। এটা প্রায় আমাদের সৌরজগতের সীমানার সমান। মহাজাগতিক মাপকাঠিতে এটা অত্যন্ত সামান্য পরিসর। এ দূরত্বের বাইরের যেকোনো কিছু কৃষ্ণগহ্বর থেকে নিরাপদ। সূর্যের সমান ভারী কোনো কৃষ্ণগহ্বর সূর্যের জায়গায় চলে এলে আমরা মারা যাব। তবে কৃষ্ণগহ্বরটি আমাদের টেনে নেবে বলে নয়। বরং মারা যাব তাপের অভাবে, ঠান্ডায় জমে গিয়ে। পৃথিবীসহ সব গ্রহ আগের মতোই কক্ষপথে চলতে থাকবে। যেন কিছুই ঘটেনি!

আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রেও আছে এক কৃষ্ণগহ্বর। নাম স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার। আমাদের কাছ থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরের এই বস্তুর ভর সূর্যের ৪০ কোটি গুণ। কিন্তু এতে আমাদের জীবনে কোনো প্রভাব পড়ছে না।

ফলে কোনো কিছু কৃষ্ণগহ্বরে পড়ে যাওয়াটাই এক দুর্লভ ঘটনা। আর পতনের প্রক্রিয়াও সরল নয়। আক্ষরিক অর্থেই বললে, গাণিতিকভাবে সরলরেখা ধরে পড়ে না। বেশির ভাগ বস্তুই সোজা গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে যাবে না। বরং ঘুরে ঘুরে কক্ষপথ ক্রমেই ছোট হতে থাকবে। এ ঘূর্ণনশীল বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের চারদিকে চাকতির মতো একটি কাঠামো তৈরি করে। এর নাম অ্যাক্রেশন ডিস্ক বা সংযোজন চাকতি।

এ চাকতির ভেতরের দিকের পদার্থ বেশি জোরে পাক খাবে। এ ঘূর্ণন মারাত্মক ঘর্ষণ উৎপন্ন করে। তাপমাত্রা হয়ে যায় কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি। এমন উত্তপ্ত জিনিস স্বাভাবিকভাবেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আসলে কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পাওয়ার এটাও একটি উপায়। সংযোজন চাকতির কর্মকাণ্ডই জানান দেয় অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বরের অস্তিত্বের কথা।

আরও পড়ুন
আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রেও আছে এক কৃষ্ণগহ্বর। নাম স্যাজিটেরিয়াস এ স্টার। আমাদের কাছ থেকে ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরের এই বস্তুর ভর সূর্যের ৪০ কোটি গুণ।

এ চাকতির উত্তাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল আছে। এখানে সৃষ্ট বিকিরণ উপস্থিত বস্তুকে ছিটকে দিতে পারে বাইরের দিকে। এ ছাড়া চাকতিতে থাকতে পারে শক্তিশালী চুম্বকত্ব। এটিও বস্তুকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। এ দুইয়ের সমন্বয় কৃষ্ণগহ্বরের বড় হওয়ার সীমা বেঁধে দেয়। ফলে একটা সময় আর নতুন পদার্থ আসার সুযোগ থাকে না। এ অবস্থার নাম এডিংটন সীমা।

ফলে কৃষ্ণগহ্বরের বড় হতে সময় লাগে। আর সময় তো সীমিত। মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে সসীম সময় আগে। কৃষ্ণগহ্বরের বয়স মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি হতে পারে না। ফলে সর্বোচ্চ টেনেটুনে ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর! অবশ্য এ পর্যন্ত জানামতে, সবচেয়ে প্রাচীন কৃষ্ণগহ্বরের জন্ম হয়েছিল মহাবিশ্বের জন্মের কয়েক শ মিলিয়ন বছর পরে।

সময়ের এ বাঁধন হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমানে কোনো কৃষ্ণগহ্বরের সর্বোচ্চ ভর হতে পারে সূর্যের ২৭ হাজার কোটি গুণ। তা–ও কথা আছে। ধরে নিতে হবে, পতনশীল সব বস্তু কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে একই দিকে ঘুরবে। কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণনের কারণে এতে বস্তুর পতনের বেগ বাড়ে। ব্ল্যাকহোল না ঘুরলে আপতিত বস্তু আরও ধীরে ভেতরে যাবে। আর বস্তুর ঘূর্ণন উল্টো দিকে হলে তো পতন আরও সীমিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভর হতে পারে পাঁচ হাজার কোটি সূর্যের সমান।

আরও পড়ুন
সময় তো সীমিত। মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে সসীম সময় আগে। কৃষ্ণগহ্বরের বয়স মহাবিশ্বের বয়সের চেয়ে বেশি হতে পারে না। ফলে সর্বোচ্চ টেনেটুনে ১ হাজার ৩৮০ কোটি বছর!

তবে কৃষ্ণগহ্বর আরেকভাবেও বড় হতে পারে। অনেক সময় ছায়াপথরা মিলিত হতে পারে। মহাবিশ্ব প্রসারিত হলেও ছায়াপথদের নিজস্ব মহাকর্ষ একে অপরকে কাছে টানতে পারে। এই যেমন আমাদের মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গাই তো একসময় মিশে যাবে প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমিডার সঙ্গে। আজ থেকে ৪০০ বা ৫০০ কোটি বছর পরে ঘটবে এ ঘটনা। এ মিশ্রণের সময় ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বরও মিলিত হবে। তবু এ কৌশলেও আগে উল্লেখ করা তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

শেষ করছি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় কৃষ্ণগহ্বরের গল্প দিয়ে। নাম ফিনিক্স এ। ভর সূর্যের ১০ হাজার কোটি গুণ। আরেকটি ভিন্ন পরিমাপে পাওয়া গেছে ১ হাজার ২৬০ কোটি গুণ। এটি আছে ফিনিক্স ক্লাস্টার নামের বিশালাকার ছায়াপথগুচ্ছের কেন্দ্রে। পৃথিবী থেকে দূরত্ব ৮৬১ আলোকবর্ষ।

লেখক: প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন