মঙ্গলের উপগ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে ছুটছে জাপানের এমএমএক্স

মঙ্গলের বুকে নয়, এবার বিজ্ঞানীদের তীক্ষ্ণ নজর মঙ্গলের এবড়োখেবড়ো চাঁদ ফোবোসের দিকে! মহাকাশের অথৈ অন্ধকার পেরিয়ে জাপানের পাঠানো মহাকাশযান সেখানে কী এমন জৈব পদার্থের সন্ধান খুঁজছে, যা এক নিমিষে বদলে দিতে পারে সৌরজগতের ইতিহাস?

শিল্পীর কল্পনায় জাপানের মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন মহাকাশযানছবি: জাক্স

মঙ্গল গ্রহ নিয়ে আমাদের উন্মাদনার শেষ নেই। কখনো সেখানে মানুষের বসতি গড়ার স্বপ্ন, কখনো বরফের সন্ধান, আবার কখনো ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজা। সব মিলিয়ে মঙ্গল যেন আমাদের কল্পনার এক বিশাল ক্যানভাস। কিন্তু মঙ্গলের নিজের যে দুটো ছোট্ট চাঁদ রয়েছে, তাদের খবর আমরা কজন রাখি? এই দুটো চাঁদের নাম হলো ফোবোস এবং ডিমোস। আর এই ফোবোসের বুক থেকে পাথর কুড়িয়ে পৃথিবীতে আনার জন্যই সম্প্রতি এক রোমাঞ্চকর অভিযান শুরু করেছে জাপান।

জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্স এই মিশনে সাহায্য নিয়েছে নাসা, ফরাসি মহাকাশ সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির। তাদের অত্যাধুনিক মিশনের নাম মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন বা সংক্ষেপে এমএমএক্স। জাপানের তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি শক্তিশালী এইচ-থ্রি রকেটে চড়ে মহাকাশের বুক চিরে উড়ে গেছে এই মহাকাশযান। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এই এমএমএক্স হতে যাচ্ছে মানুষের ইতিহাসে প্রথম কোনো স্পেসক্রাফট, যা মঙ্গলের চাঁদ ফোবোসের কক্ষপথে প্রবেশ করবে। কিন্তু হঠাৎ করে মঙ্গলের এই ছোট্ট চাঁদের ওপর বিজ্ঞানীদের এত নজর পড়ল কেন?

আরও পড়ুন
জাপানের তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি শক্তিশালী এইচ-থ্রি রকেটে চড়ে মহাকাশের বুক চিরে উড়ে গেছে এই মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন বা এমএমএক্স মহাকাশযান।

আপনাকে যদি ফোবোসের একটা ছবি দেখানো হয়, আপনি হয়তো হাসতে হাসতে বলবেন, ‘এ তো মহাকাশে ভাসমান এবড়োখেবড়ো একটা আলু!’ হ্যাঁ, ফোবোস দেখতে সত্যিই আমাদের পূর্ণিমার গোলগাল চাঁদের মতো নয়। এটি এতই ছোট এবং মঙ্গলের এত কাছাকাছি ঘোরে যে, মঙ্গলের আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে এটি দিনে দুবার উঠছে আর অস্ত যাচ্ছে! কিন্তু এই কুৎসিত দর্শন চাঁদের বুকেই লুকিয়ে আছে আমাদের সৌরজগতের সৃষ্টির এক বিশাল রহস্য। বিজ্ঞানীরা আজও নিশ্চিতভাবে জানেন না এই ফোবোস এবং ডিমোসের জন্ম ঠিক কীভাবে হয়েছিল।

এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মূলত দুটি ধারণা প্রচলিত আছে। একদল মনে করেন, এরা হয়তো সৌরজগতের অন্য কোথাও ঘুরে বেড়ানো সাধারণ কোনো গ্রহাণু ছিল।

ফোবোস এতই ছোট এবং মঙ্গলের এত কাছাকাছি ঘোরে যে, মঙ্গলের আকাশ থেকে দেখলে মনে হবে এটি দিনে দুবার উঠছে আর অস্ত যাচ্ছে!
ছবি: ফিজিক্স ডটঅর্গ

মঙ্গলের কাছাকাছি আসার পর মঙ্গলের প্রবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এদেরকে অনেকটা ‘ছিনতাই’ করে নিজের কক্ষপথে আটকে ফেলেছে। ব্যাপারটা অনেকটা পথ হারিয়ে ফেলা কোনো আগন্তুককে জোর করে নিজের বাড়িতে রেখে দেওয়ার মতো!

অন্যদিকে আরেক দলের ধারণা, কোটি কোটি বছর আগে মঙ্গলের বুকে বিশাল কোনো গ্রহাণুর ভয়ংকর এক সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই প্রলয়ংকরী সংঘর্ষের ফলে মঙ্গলের বুক থেকে ছিটকে পড়া ধুলাবালি আর পাথরের টুকরোগুলো মহাকাশে ভাসতে ভাসতে একসময় জোড়া লেগে এই দুটো চাঁদের জন্ম দিয়েছে।

আরও পড়ুন
রোভারের প্রাথমিক কাজ শেষ হলে ২০৩০ সালের কোনো এক সময়ে মূল মহাকাশযানটি স্বয়ং ফোবোসের বুকে আলতো করে অবতরণ করবে।

এই রহস্যের জট খুলতেই এমএমএক্স মহাকাশযানটি পুরো এক বছর ধরে মহাকাশের ঘুটঘুটে অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে গিয়ে পৌঁছাবে ফোবোসের ঠিকানায়। সেখানে পৌঁছেই এটি তাড়াহুড়ো করে নামবে না, বরং ওপর থেকেই চাঁদটিকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। নিখুঁতভাবে চাঁদের দুই পাশে দুটি নিরাপদ অবতরণ কেন্দ্র খুঁজে বের করার পর মূল মহাকাশযান থেকে ফোবোসের বুকে ছেড়ে দেবে একটি ছোট্ট রোভার। ফরাসি কমিকস চরিত্র অ্যাস্টেরিক্সের আদরের কুকুরের নামানুসারে এই রোভারটির নাম রাখা হয়েছে ইডেফিক্স। এই কুকুরটি (পড়ুন রোভার) ফোবোসের বুকে ঘুরে ঘুরে এর ভেতরের মাটির গঠন পরীক্ষা করবে। বিজ্ঞানীদের আশা, এই আদিম ধুলোবালির মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে জৈব পদার্থ বা প্রাণ সৃষ্টির অজানা কোনো উপাদান!

রোভারের প্রাথমিক কাজ শেষ হলে ২০৩০ সালের কোনো এক সময়ে মূল মহাকাশযানটি স্বয়ং ফোবোসের বুকে আলতো করে অবতরণ করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো ফোবোসের বুক থেকে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি ও পাথর সংগ্রহ করা। শুনতে খুব কম মনে হচ্ছে? মাত্র কয়েক চামচ চিনির সমান ওজনের এই মহাজাগতিক ধুলোকণার দাম শত শত কোটি টাকার চেয়েও বেশি! এই সামান্য কয়েক গ্রাম অমূল্য সম্পদ নিয়েই রিটার্ন মডিউলটি মঙ্গল গ্রহের মায়া কাটিয়ে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসবে ২০৩১ সালের দিকে।

আরও পড়ুন
ফরাসি কমিকস চরিত্র অ্যাস্টেরিক্সের আদরের কুকুরের নামানুসারে এই রোভারটির নাম রাখা হয়েছে ইডেফিক্স। এই কুকুরটি ফোবোসের বুকে ঘুরে ঘুরে এর ভেতরের মাটির গঠন পরীক্ষা করবে।

এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, মহাকাশেই তো রোভার দিয়ে পরীক্ষা করা যেত, খামোখা এত কষ্ট করে পৃথিবীতে পাথর আনার কী দরকার? এর খুব সুন্দর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির এমএমএক্স প্রজেক্ট বিজ্ঞানী এলিয়ট সেফটন-ন্যাশ। তিনি বলছেন, ‘মহাকাশে পাঠানো যন্ত্রগুলো যতই অত্যাধুনিক হোক না কেন, সেগুলোর একটা সীমাবদ্ধতা আছে। পৃথিবীর ল্যাবরেটরিতে আমাদের কাছে এমন সব দানবীয় আকারের এবং মারাত্মক সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি আছে (যেমন বিশাল সব ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ বা পার্টিকেল অ্যানালাইজার), যা কোনো রকেটে করে মহাকাশে পাঠানো আক্ষরিক অর্থেই অস্মভব।’

তাই মহাকাশের নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসা মানে হলো বিজ্ঞানীদের জন্য এক অফুরন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার খুলে যাওয়া। সেফটন-ন্যাশ এটিকে বলেছেন ‘এমন এক উপহার, যা অনন্তকাল ধরে ফল দিতে থাকে।’ কারণ, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর যখন আমাদের হাতে আরও উন্নত প্রযুক্তি আসবে, তখন ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীরাও এই ফোবোসের পাথরগুলো নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা করতে পারবেন। হয়তো এই ছোট্ট আলুকৃতির চাঁদের বুকেই লেখা আছে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের প্রথম কোনো চাঞ্চল্যকর ইশারা!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান

আরও পড়ুন