ধারাবাহিক
অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৬
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?
এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের ষষ্ঠ পর্ব।
সিস্টেমে বাগ!
হরর মুভিগুলোতে ভিনগ্রহের ব্যাকটেরিয়া আরেকটি জনপ্রিয় বিষয়। ভাইরাসের চেয়ে এদের আক্রমণ করার ক্ষমতা হয়তো কিছুটা বেশি। তবে পৃথিবীর প্রাণীদের জন্য এদেরও খুব একটা বিপদের কারণ হওয়ার কথা নয়।
ভাইরাস যেমন নির্দিষ্ট কোনো কোষ বা প্রোটিনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তৈরি হয়, ব্যাকটেরিয়ারা অত বাছবিচার করে না। ভাইরাস আমাদের কোষের নিজস্ব কারখানাকে আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে। আর ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরকে একটা সস্তা হোটেলের মতো মনে করে! ঠিক কোনো অবাঞ্ছিত অতিথির মতো; তারা আপনার খাবার খাবে, বাড়ি-ঘর নোংরা করবে এবং অবশ্যই, আপনাকে বিরক্ত করে দীর্ঘদিন রয়ে যাবে।
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো এদের গঠনগত জটিলতা। ব্যাকটেরিয়া নিজেই একেকটি সম্পূর্ণ কোষ। এদের জীবিত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এরা নিজেরা খাবার খেতে পারে, বর্জ্য ত্যাগ করতে পারে এবং বংশবৃদ্ধিও করতে পারে। এদের শুধু দরকার একটু উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি। এই তিনটি জিনিস পেলে এরা মনের আনন্দে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাবে।
ব্যাকটেরিয়ার যা যা দরকার, তার সবকিছুর জন্য আমাদের শরীর এক চমৎকার জায়গা। ভাইরাসের মতো আমাদের শরীরেও ব্যাকটেরিয়া গিজগিজ করছে। আপনার পেটের ভেতরে, ত্বকের ওপরে, এমনকি চোখের পাপড়িতেও ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এরা আছে সবখানে। একটা হিসাব করে দেখা গেছে, আপনার শরীরের প্রতিটি মানব কোষের বিপরীতে অন্তত দশটি করে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে!
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো এদের গঠনগত জটিলতা। ব্যাকটেরিয়া নিজেই এককেকটি সম্পূর্ণ কোষ। এদের জীবিত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তার মানে, সংখ্যায় আপনি তাদের কাছে হার মেনে গেছেন।
আপনার শরীরের ভেতরের বেশিরভাগ ব্যাকটেরিয়াই কিন্তু নিরীহ। এরা হয় আপনার কোনো ক্ষতি করে না, নয়তো এত কম সংখ্যায় থাকে যে ক্ষতি করার সুযোগ পায় না। এর মধ্যে অনেকেই আবার আমাদের জন্য বেশ উপকারী। এগুলো ছাড়া আমরা বাঁচতেই পারতাম না। যেমন, এরা আমাদের খাবার হজম করতে সাহায্য করে, ভিটামিন তৈরি করে এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। দুধ হজম করতেও এরা আমাদের সাহায্য করে।
এমন উপকারী ব্যাকটেরিয়ার একটি দারুণ উদাহরণ হলো এসচেরিচিয়া কোলাই বা সংক্ষেপে ই. কোলাই। ডিম্বাকৃতির এই ছোট পোকাগুলো আপনার অন্ত্রে বা পেটের ভেতর বিপুল সংখ্যায় বাস করে। আমাদের শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রক্রিয়া করতে এরা দারুণ সাহায্য করে। যদিও এদের এই কাজের খুব একটা প্রশংসা আমরা করি না।১ সাধারণত, এরা আপনার পেটের ভেতর বেশ আনন্দেই বাস করে এবং নিজেদের কাজ ঠিকঠাকমতো করে যায়। তবে সব সময় যে এমনটা হয় তা নয়।
ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াও খাবার খায় এবং বর্জ্য ত্যাগ করে। এদের কিছু কিছু প্রজাতি বর্জ্য হিসেবে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। এর পরিমাণ কম হলে আপনার শরীর সেটা সামলে নিতে পারে। কিন্তু শরীরে এর মাত্রা খুব বেশি হয়ে গেলে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। যেমন, ই. কোলাই আক্রান্ত দূষিত খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। সংক্রমণ যদি খুব বেশি হয়, তবে তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এছাড়া ই. কোলাই যদি কোনো কারণে আপনার পেট থেকে বেরিয়ে তলপেটে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা পেরিটোনাইটিস নামে মারাত্মক প্রদাহ তৈরি করতে পারে।
ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াও খাবার খায় এবং বর্জ্য ত্যাগ করে। এদের কিছু কিছু প্রজাতি বর্জ্য হিসেবে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। এর পরিমাণ কম হলে আপনার শরীর সেটা সামলে নিতে পারে।
ব্যাকটেরিয়ার কারণে হতে পারে এমন সমস্যার তালিকা বেশ লম্বা। ডায়রিয়া, বমি, স্নায়ুর ক্ষতি, পেটব্যথা, জ্বর...নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কী কী ঝামেলা হতে পারে। কিন্তু তারপরও আমরা সাধারণত আমাদের ভেতরের এই পোকাগুলোর সঙ্গে একধরনের অস্বস্তিকর সন্ধি করেই বেঁচে থাকি।
অবশ্য আমাদের ভেতরের এই ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের সঙ্গেই বিবর্তিত হয়েছে, যাতে তারা এই মিথোজীবী সম্পর্কটা বজায় রাখতে পারে। মঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রহে বিবর্তিত হওয়া কোনো কাল্পনিক ব্যাকটেরিয়া এই সুবিধা পাবে না। তবুও, ভিনগ্রহের কোনো ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব আমাদের ওপর কেমন হবে, তা নির্ভর করে তার আসলে কী প্রয়োজন এবং সে বর্জ্য হিসেবে কী ত্যাগ করে তার ওপর।
তার যদি শুধু একটু উষ্ণ জায়গা, পানি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়, তবে কথায় আছে না—বিপদে পড়লে যেকোনো আশ্রয়ই ভালো! আপনার পেট তাদের কাছে অন্য যেকোনো জায়গার মতোই চমৎকার মনে হবে। আর সেই ব্যাকটেরিয়া যদি বংশবৃদ্ধি করে এবং তাদের পুরো দল মিলে বিষাক্ত কোনো বর্জ্য ছাড়তে শুরু করে, তবে সেটা বেশ বিপদের কারণ হতে পারে।
কিন্তু এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কতটা?
বাস্তবতা হলো, এমনটা ঘটার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ব্যাকটেরিয়ার যে জটিল গঠন, তাতে এদের ভাইরাসের চেয়ে বেশি মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। সেই জটিলতাই আবার এদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। ব্যাকটেরিয়ার ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলো এতই ঠুনকো যে, মহাকাশের দীর্ঘ যাত্রা এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ঢোকার ধকল সামলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
ভিনগ্রহের কোনো ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব আমাদের ওপর কেমন হবে, তা নির্ভর করে তার আসলে কী প্রয়োজন এবং সে বর্জ্য হিসেবে কী ত্যাগ করে তার ওপর।
তা ছাড়া, ভিনগ্রহের ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার জন্য যে ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন, তার তুলনায় পৃথিবী তাদের কাছে বেশ বৈরী বা অবন্ধুসুলভ মনে হবে। যেমন, মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠের রাসায়নিক গঠন পৃথিবীর চেয়ে অনেক আলাদা। এর পাতলা বায়ুমণ্ডলের কারণে এটি সূর্য থেকে প্রচুর অতিবেগুনি রশ্মি গ্রহণ করে। মঙ্গলের ভূপৃষ্ঠের বেশিরভাগ অংশে পানির ছিটেফোঁটাও নেই। কিছু পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থটি পৃথিবীর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে বেশ ওস্তাদ। এ জন্যই ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার করা হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর কিছু প্রাণীও নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য এই পদার্থ তৈরি করে। যেমন বোম্বারডিয়ার বিটল নামে একধরনের গুবরে পোকা। মঙ্গলে টিকে থাকার জন্য বিবর্তিত হওয়া যেকোনো ব্যাকটেরিয়ার কাছে পৃথিবীর পরিবেশ খুব কঠিন মনে হবে। পৃথিবী তাদের কাছে খুব বেশি ভেজা, খুব বেশি গরম এবং একেবারে অচেনা একটি জায়গা।
অবশ্য পৃথিবীর সব প্রাণী যে আমাদের মতো একই পরিবেশ পছন্দ করবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু ব্যাকটেরিয়া প্রচণ্ড ঠান্ডা পছন্দ করে, কিছু গরম পছন্দ করে, আবার কিছু কিছু সালফার খায়। কেউ সাগরের বা মাটির অনেক গভীরে থাকা চরম চাপ পছন্দ করে। এই চরম ভাবাপন্ন পরিবেশে থাকা অণুজীবগুলো পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে আছে। মঙ্গলেও হয়তো এদের অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তারা যদি মঙ্গলের মাটির অনেক গভীরে থেকেও থাকে, তবুও কোনো গ্রহাণুর আঘাতে ছিটকে মহাকাশে ভেসে আসার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।
মঙ্গলে টিকে থাকার জন্য বিবর্তিত হওয়া যেকোনো ব্যাকটেরিয়ার কাছে পৃথিবীর পরিবেশ খুব কঠিন মনে হবে। পৃথিবী তাদের কাছে খুব বেশি ভেজা, খুব বেশি গরম এবং একেবারে অচেনা একটি জায়গা।
ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধির সম্ভাব্য জায়গা খোঁজার জন্য সৌরজগতের অন্য জায়গাগুলোর দিকে তাকানো আরও বেশি নিরর্থক। বৃহস্পতির বরফে ঢাকা চাঁদ ইউরোপার পৃষ্ঠের নিচে হয়তো পানির এক বিশাল মহাসাগর লুকিয়ে আছে। পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান করার জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা। কিন্তু আমাদের পরিবেশকে আরামদায়ক মনে করবে, এমন কোনো প্রাণীর সেখানে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। ইউরোপার বরফের স্তরটি হয়তো দশ মাইল বা তার চেয়েও বেশি পুরু। কোনো গ্রহাণুর আঘাত যদি ওই বরফ ভেদ করে ভেতরের মহাসাগরে থাকা কোনো অণুজীবকে মহাকাশে ছিটকে ফেলেও দেয়, তবে সেই প্রচণ্ড আঘাতেই অণুজীবটি বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে।
প্রাণের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য বাড়ি হতে পারে শনির চাঁদ টাইটান। নামের মতোই এর বিশালত্ব। এর ব্যাস প্রায় ৩ হাজার মাইল। অর্থাৎ প্রায় বুধ গ্রহের সমান। এখানে নাইট্রোজেন, আর্গন এবং মিথেন গ্যাসে তৈরি ঘন বায়ুমণ্ডল রয়েছে। সেখানে বৃষ্টিও হয়, তবে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আসলে তরল মিথেন! টাইটান প্রচণ্ড ঠান্ডা। এর তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ৩০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সেখানকার ভূপৃষ্ঠে থাকা যেকোনো পানি জমে পৃথিবীর পাথরের চেয়েও শক্ত বরফে পরিণত হয়েছে। প্রাণরসায়নবিদরা হয়তো অনুমান করবেন, এমন অদ্ভুত পরিবেশেও প্রাণের বিকাশ হতে পারে। কিন্তু সেই প্রাণ আমাদের কাছে একেবারেই অচেনা মনে হবে। সেখানে বেঁচে থাকতে সক্ষম যেকোনো পোকার কাছে পৃথিবীর পরিবেশ মনে হবে জ্বলন্ত এক চুল্লির মতো!
প্রাণের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য বাড়ি হতে পারে শনির চাঁদ টাইটান। নামের মতোই এর বিশালত্ব। এর ব্যাস প্রায় ৩ হাজার মাইল। অর্থাৎ প্রায় বুধ গ্রহের সমান।
মনে হচ্ছে, ইনকিউবেটর হিসেবে সৌরজগতের অন্য কোনো জায়গায় আমরা ভিনগ্রহের কোনো পোকার সন্ধান পাচ্ছি না। পৃথিবীর মতো পরিবেশে বিবর্তিত হতে পারত এমন কোনো ভিনগ্রহের অণুজীব মহাকাশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
অবশ্য এতক্ষণ যা আলোচনা করা হলো, তাতে ধরে নেওয়া হয়েছে; ‘ওখানে’ থাকা যেকোনো রূপের প্রাণ শুধু চুপচাপ বসে আছে। হয়তো কোনো বাহনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু কে জানে, হয়তো তাদের মধ্যে যারা আরেকটু বেশি উন্নত বা চালাক, তারা নিজেরাই ড্রাইভ করে পৃথিবীতে আসতে পছন্দ করবে!
